বায়ুদূষণ রোধে এখনই পদক্ষেপ নিন

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৯, ১১:২০ পিএম

সভ্যতার পরিক্রমায় আমরা আজ এমন এক অবস্থায় পৌঁছে গেছি, যখন প্রাণ ধারণের জন্য অত্যাবশ্যক আলো-বাতাস-পানির মতো প্রকৃতির অফুরান দানগুলোও আর নিরাপদ থাকছে না। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশে দেশে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান, আরেকদিকে মানবসৃষ্ট দূষণের কবলে পড়ে জনজীবন ক্রমাগত হুমকির মুখে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এসব বিপর্যয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বেশি দায়ী প্রবলভাবে শিল্পায়িত এই সভ্যতায় নির্বিচারে পরিবেশ-প্রকৃতি বিনষ্ট করা এবং বেপরোয়া ও লাগামহীন দূষণ। হিমালয়ের পাদদেশে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার বদ্বীপে আলো-বাতাস-জলে ভরা আমাদের এই ‘সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা’ বাংলাদেশ যখন সারা বিশ্বে বায়ুদূষণের দিক থেকে বেশি ঝুঁকিতে থেকে প্রথম স্থানে চলে আসে, তখন এক মহাবিপর্যয়ের উদ্বেগ আমাদের গ্রাস করে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়াল-এর মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘বিশ্ব বাতাসের মান প্রতিবেদন-২০১৮’-তে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার দেশ/অঞ্চলগুলোর তালিকায় সবার শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। বায়ুদূষণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র নির্দেশনা এবং ‘ইউএস এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ বা ‘যুক্তরাষ্ট্রের বায়ুমান সূচক’ ধরে এই জরিপ পরিচালিত হয়েছে। জরিপে একইসঙ্গে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার রাজধানীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নাম, প্রথম স্থানে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। তবে, দূষিত বায়ুর নগরের তালিকায় ঢাকা রয়েছে ১৭তম অবস্থানে। এই প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দূষিত বায়ুর শহরের শীর্ষ দশটির মধ্যে সাতটিই ভারতে, দুটি পাকিস্তানে এবং একটি চীনে অবস্থিত। বায়ুদূষণে বাংলাদেশের পরই রয়েছে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান। বায়ুদূষণে শীর্ষ দশে থাকা বাকি দেশগুলো হলো আফগানিস্তান, বাহরাইন, মঙ্গোলিয়া, কুয়েত, নেপাল, আরব আমিরাত ও নাইজেরিয়া। অন্যদিকে, সবচয়ে কম দূষিত বায়ুর দেশের তালিকায় রয়েছে আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, এস্টোনিয়া, সুইডেন, নরওয়ে, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র।

বায়ুদূষণ নিয়ে পরিচালিত এই জরিপে মূলত ‘পিএম ২.৫’ নামে পরিচিত বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতির হিসাব করা হয়েছে। ২ দশমিক ৫ মাইক্রন বা মাইক্রোমিটার আকারের ‘পার্টিকুলেট ম্যাটার’ বা ‘ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণাকে’ সংক্ষেপে ‘পিএম ২.৫’ বলা হয়ে থাকে। একটি চুলকে ২৪ ভাগ করলে যে ব্যাস পাওয়া যাবে ‘পিএম ২.৫’ ঠিক ততটাই ছোট। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই বস্তুকণা মানুষের শ্বাস প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সহজেই ফুসফুসে ঢুকে পড়ে এবং নানারকম রোগ-ব্যাধির সৃষ্টি করে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় বাতাসে ‘পিএম ২.৫’-এর পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম অতিক্রম করলে তাকে মানব স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। ২০০৮ সালে রাজধানী ঢাকায় প্রতি ঘনমিটারে এর পরিমাণ ছিল ৯৭ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া পরিমাণের প্রায় দশ গুণ বেশি। বিশ্বের ৭৩টি দেশে পরিচালিত এই জরিপকে একটি জরুরি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন পিস বলেছে, বায়ুদূষণের কারণে আগামী বছরে দুনিয়াজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রাণহানির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

দেশের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত বনভূমি কমে যাওয়া, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে পরিবেশ দূষণ, নদ-নদী-খালবিল-জলাশয় বেদখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া, কলকারখানা-যানবাহনের ক্ষতিকর কালোধোঁয়া সবকিছুই আমাদের এই বায়ুদূষণের পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করেছে। রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে যে চলমান ব্যাপক উন্নয়নমূলক নির্মাণযজ্ঞ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে তা খোলা চোখেই দেখা যায়। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের পরিবেশবান্ধব নীতিমালা অনুসরণ না করা এবং ‘সবুজ সূচক’ মেনে নির্মাণকাজ পরিচালিত হলে হয়তো ঢাকা নগরের পরিস্থিতি এতটা বিপর্যয়কর হতো না। প্রায় পৌনে দুই কোটি জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম মেগাসিটি ঢাকায় সবুজ উদ্যান, খোলা মাঠ ও লেক-জলাশয়ের মারাত্মক অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা হলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বায়ুদূষণের এই জরিপের ফলাফলকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে অবিলম্বে রাজধানী ঢাকাকে পরিবেশবান্ধব সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত