কালের সাক্ষী ভূজপুরের ‘জমিদার বাড়ি’

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৯, ০৯:৫৮ এএম

বাড়ির দেয়ালগুলোতে ছোট ছোট বটবৃক্ষের চারা। নানা ধরনের লতাপাতায় ছেয়ে গেছে দেয়ালগুলো। ধসে পড়েছে উপরের ছাদ। ষাট কক্ষের বিশাল প্রাসাদ এখন অনেকটা বিলীন হয়ে গেছে। একসময় এখানে ছিল জমিদারের সোনা-রুপা খচিত বিশাল চেয়ার। প্রতিরাতে বসতো নাচ গানের আসর। বছর বছর হতো রাজপুন্যাহ উৎসব। কিন্তু কালের গর্ভে এসব হারিয়ে গেছে। চারপাশের দেয়ালগুলোই শুধু ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে প্রবেশ করতে এখন ভয় লাগে। তবে এ ভয় মিঞা সাহেবের নয়, এ ভয় সাপ বিচ্ছুর।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত চট্টগ্রামের বিখ্যাত জমিদার কাজী শাহাব উদ্দিন চৌধুরীর জমিদার বাড়ির গল্প এটি। জমিদার শাহাব উদ্দিন বা হাসমত আলী কেউ এখন আর বেঁচে নেই। নেই জমিদার বাড়ির আগের সেই জৌলুশ। তাই হয়তো সকলের কাছে এটি একটি গল্পের মতো মনে হতে পারে। বিখ্যাত এবং বহুল আলোচিত এই জমিদার বাড়ির অবস্থান চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর এলাকায়।

ভূজপুর থানাধীন ভূজপুর ইউনিয়নের কাজিরহাট বাজারের দক্ষিণ পশ্চিম পাশে একটি টিলার উপর অবস্থিত বাড়িটি কাজী বাড়ি বা মিঞা বাড়ি নামেও পরিচিত।

প্রায় তিনশ’ বছর আগে কাজী সিহাব উদ্দিন নামক এক জমিদার শাসন করতো বর্তমানের ফটিকছড়ি উপজেলা এলাকাটি। এরই ধারাবাহিকতায় ভূজপুরে কাজী বাড়িতে গড়ে উঠেছিল প্রাসাদ, বিচারকাজের জন্য আদালত, ফাঁসির মঞ্চসহ সবকিছু। জমিদারের প্রতি সম্মানস্বরূপ ব্রিটিশরা এ স্থানে বছরে ৭ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রেওয়াজ প্রচলন করে। ফটিকছড়ির বর্তমান আদালতের কার্যক্রম আগে এখানেই চলতো।

জানা যায়, কাজী শাহাব উদ্দিন চৌধুরীর আদি পুরুষ ছিলেন মহব্বত সাধু। তিনি গৌড় নগরে বসবাস করতেন। সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম এসে তিনি সস্ত্রীক বসতি স্থাপন করেন ফেনীর দাঁদরায়। তার একমাত্র ছেলের নাম সাদুল্লাহ। সাদুল্লাহ’র তিন ছেলের একজন কাজী শাহাব উদ্দিন চৌধুরী। অন্য দু’জন হলেন আনিস মোহাম্মদ ও মোহাম্মদ হোসেন। কাজী শাহাব উদ্দিনের তিন ছেলের একজন কাজী হাসমত আলি চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি। আলিফ লায়লা ও চিনফুকস শাহ নামের তার দু’টি পুঁথি রয়েছে।

image

বংশ পরম্পরায় কাজী শাহাব উদ্দিন চৌধুরী ও তার বংশধরেরা প্রায় দু’শ বছর জমিদারি করেছেন ভূজপুরে। ভূজুপর বাজারটি তখন থেকেই কাজিরহাট নামে পরিচিত। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ছিল তাদের জমিদারি। ফটিকছড়ির  প্রায় অর্ধশত বর্গকিলোমিটার এলাকা জমিদারির আওতায় ছিল। বছরে একবার রাজপুন্যাহ হতো। তখন হাজার হাজার লোক খাজনা দিতে আসতেন কাজী বাড়িতে।

তিনশ’ বছর আগের প্রাচীন নিদর্শন জমিদার বাড়ি ও ফাঁসির ঘরটি বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় আছে। সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন বিলুপ্তির পথে ভূজপুরের এই ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম স্থাপনাটি। তবে কাজী বাড়ি যাওয়ার একশ গজ আগে উত্তর পাশে চোখে পড়বে নয়নাভিরাম কাজী বাড়ি মসজিদ। ৩টি গম্বুজ আর ১২টি ছোট মিনারযুক্ত মসজিদটি তিনশত বছর আগে তুর্কী কৌশলীরা চুন সুরকির মিশ্রণ দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তী প্রজন্ম সেটিকে সংস্করে করে।

ভূজপুরের বাসিন্দা প্রদীপ চৌধুরী বলেন, ‘তিনশ বছর আগের এই জমিদার বাড়ি ও ফাঁসির ঘরটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এখানে খনন করলে অনেক মূল্যবান পুরাকীর্তি পাওয়া যেতে পারে।

এলাকা ঘুরতে আসা পর্যটক মো. নিজাম বলেন, ‘এখানে এত সুন্দর একটা প্রাচীন একটা স্থাপনা আছে, সেটা আমরা জানতাম না।’

ভূজপুর জমিদার বা কাজী বাড়ি গেলে দেখা যায়, ফাঁসির ঘরটি গাছগাছালিতে ভরা।

কাজী বাড়ির বংশধর কাজী হামিদ বলেন, আমাদের বাপ-দাদারা এখানে বসে জমিদারি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে সংস্কার করলে এখানে পর্যটন স্থাপনা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে বেঁচে থাকা জমিদার পরিবারের বংশধর স্কুলশিক্ষক কাজী ইকবাল হোসেন জানান, তখন জমিদার হায়দার আলীর আমলে জমিদারির আওতায় মোগল স্থাপত্যের আদলে ২৪টি মহাল ১২টি তরফ ছিল।

এ ছাড়া ছিল ২২টি দীঘি, ২২টি মসজিদসহ বহু সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অনেক রাস্তাসহ ২২টি (হাতিরপুল) ব্রিজ কালভার্টও নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৭৬৫ থেকে ১৮৪৫ সাল সময়ে এগুলো নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর তাদের বংশধর।

কাজী বাড়িতে একটি ফাঁসির মঞ্চ ছিল। এলাকার সকল শ্রেণির মানুষের মাঝে এমন ধারণা থাকলেও এটি নিয়ে জমিদার বাড়ির লোকজনের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন কথা।

শিক্ষক ইকবাল হোসেন জানান, এটি ছিল একটি প্রতীকী মঞ্চ। এখানে কোনো লোককে ফাঁসি দেওয়া হতো না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত