৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হয়। বহু আগেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘নারী’ কবিতায় লিখে গিয়েছিলেন ‘সাম্যের গান গাই/আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই’। তাই মানুষ হিসেবে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়েই একসময় শুরু হয়েছিল বিশ্ব নারী দিবস। বিশ্ব সমাজব্যবস্থায় সেই সাম্য অনেকটাই প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নারী দিবসকে সামনে রেখে আমাদের বিশেষ আয়োজনে মুখোমুখি হন সারা যাকের।
প্রতিটি নারী একেকটি যুদ্ধের নাম। কারণ একজন নারীকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়। কখনো নিজের সঙ্গে, কখনো সমাজের সঙ্গে আবার কখনো পরিবারের সঙ্গে। আমার মসৃণ ছিল না। প্রতিনিয়ত বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে আমাকে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে নিজের পরিচয় তৈরি করতে হয়েছে। সমাজের প্রতিটি নারীকে এসব প্রতিবন্ধকতার সামনে পড়তে হয়। অথচ একটি সুন্দর কথা আমাদের দেশে প্রচলিত রয়েছে ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ কিন্তু কেন যেন এই সহজ বিষয়কে আমরা প্রায়ই জটিল করে তুলি। আর এর দায়ভার কি আমরা পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থার ওপর ফেলতে পারি না? কেন আমাদের সমাজ, আমাদের সংসারের পুরুষরা একজন নারীকে একজন মানুষ হিসেবে মনে করতে পারে না। কেন তারা ভাবতে পারে না, একজন নারীর ভেতরে যে ক্ষমতা বা প্রতিভা আছে, সেটাকে কাজে লাগিয়ে নিজের, সংসার, সমাজ এবং দেশের উন্নয়ন করতে পারে? কেন তারা মেয়েশিশু ও ছেলেশিশুর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে? কেন তারা একজন নারীর সফলতাকে মেনে নিতে পারে না? কেন পারে না তাকে অভিনন্দন জানাতে। অথচ আমরা দেশের উন্নতি চাই, সমাজের উন্নতি চাই, সংসারের সচ্ছলতা চাই। কিন্তু অনেকেই চান না আমাদের বোন, স্ত্রী বা কন্যারা ঘরের বাইরে কাজ করুক, কাজে যাক। যদি দেশের উন্নয়ন আমরা চাই করতে হবে। নারী একজন মানুষ আর মানুষের সম্মান তার প্রাপ্য। নারী যখন তার প্রাপ্য সম্মান পাবে তখনই তার কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং এর প্রকাশ ঘটবে, আর তার ফলেই উন্নয়ন ঘটবে দেশের। তার মানে সারমর্ম হলো নারী এবং পুরুষ এর কর্মক্ষমতা, কর্মদক্ষতা এক। এই কর্মক্ষমতা যখন একীভূত হয়ে কাজ করবে, তখন আমাদের উন্নতি কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা এগিয়ে যাব উন্নতির উচ্চ শিখরে। আমাদের মনে রাখতে হবে এই পৃথিবীকে সুন্দর করতে নারী এবং পুরুষের সমান কর্মদক্ষতা প্রয়োজন। এ সমতাকে যখন আমরা আমাদের মন থেকে মেনে নিতে পারব, তখনই আমরা তাদের শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি, যাতায়াত ইত্যাদি সব জায়গায় সমঅধিকার প্রদান করতে পারব। কর্মক্ষেত্রে আমার পাশে যিনি বসে আছেন তিনি একজন মানুষ, তার পরিচয় তিনি আমার সহকর্মী। তিনি শুধু একজন নারী নন। আজকের উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখতে পাই, পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরাও সমানতালে কাজ করছেন। নারী-পুরুষের সমতায় আমরাই শুধু পিছিয়ে আছি।
তবে অনেক ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। কিন্তু সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি সেক্টরে মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ খুবই কম। ঠিক তেমনি গার্মেন্টে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৮০ শতাংশ হলেও উচ্চ পর্যায়ে শ্রমিক হিসেবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। এখানে সমতা না আনতে পারলে নারীর সমতায়নের অগ্রগতি ব্যাহত হবে। আন্তর্জাতিকভাবে যেমন, ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে দাবি উঠছে। ওই অধিকার না হলে নারীর বাল্যবিয়ে বন্ধ এবং নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ সার্বিকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নারীর Unfeed labour Reproductive কাজ, সেবামূলক কাজ, উৎপাদনমুখী কাজ তারা করেন যার স্বীকৃতি নেই। তার জন্য তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন না। এ কারণে নারী বিনা পারিশ্রমিকে যে শ্রম দেন তার স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি এবং বাড়ির ভেতরের যে কাজ সেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, সংসারের পরিশ্রম লাঘব করার জন্য পানি, জ্বালানি ইত্যাদি, বৃদ্ধদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুলভ ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া প্রয়োজন। এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে এই দাবিগুলোকে সারা পৃথিবীব্যাপী সামনে নিয়ে আসা হোক।
নারী দিবসে আমরা বলতে চাই, নারীর অগ্রগতি মানে রাষ্ট্রের অগ্রগতি। আজ আমরা বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলতে চাই, নারীর এই অগ্রযাত্রাকে বাধামুক্ত রাখার জন্য এগিয়ে আসুন সবাই। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করুন। নারীকে পূর্ণ নাগরিক ভাবতে শিখুন। নারী-পুরুষ উভয়ে মিলেই রাষ্ট্র-সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।লেখক
অভিনেত্রী ও নাট্যকর্মী
