ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোট হবে আগামী সোমবার। এ নির্বাচনের চার দিন আগে গতকাল বৃহস্পতিবার ইশতেহার ঘোষণা করেছে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ)। এরই মধ্যে প্রার্থীদের লিফলেটে ছেয়ে গেছে পুরো ক্যাম্পাস; জোরেশোরে চলছে প্রচার।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ : ২৮ দফা ইশতেহারে গেস্টরুম, গণরুম ও জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ পুরোপুরি বিলোপ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে এ ইশতেহার ঘোষণা করেন পরিষদের প্যানেলে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী নুরুল হক নুর। উপস্থিত ছিলেন জিএস প্রার্থী রাশেদ খান ও এজিএস প্রার্থী ফারুক হাসানসহ প্যানেলের অন্য প্রার্থীরা।
প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছেÑমুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে লিবারেশন ওয়ার স্টাডিজ সেন্টার প্রতিষ্ঠা; হলগুলো থেকে বহিরাগত-অছাত্রদের বিতাড়িত করে প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের বৈধ সিট প্রাপ্তির উদ্যোগ নেওয়া; ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিনে ন্যায্যমূল্যে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ এবং ক্যান্টিন, ক্যাফেটেরিয়া, ডাইনিং এবং দোকানে খাবারের মান যাচাইয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ; নিজস্ব পরিবহন ও রুটের সংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবহন-সংক্রান্ত খাতে বার্ষিক বাজেটের ন্যূনতম ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা, লাইব্রেরির সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাসের সময় নির্ধারণ, বাসগুলোতে ওয়াইফাই সেবা নিশ্চিত; গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বার্ষিক বৃত্তির ব্যবস্থা; শিক্ষার্থীদের যেকোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানে ডাকসুর ‘সেবা ডেস্ক’ চালু; বৈশ্বিক জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ বিনির্মাণে আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনার ও বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন; রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের বাইরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর স্বাধীন কার্যক্রম আরও গতিশীল করা; শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আইটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং প্রথম বর্ষ থেকেই ডিজিটাল বাংলাদেশের আওতায় নিয়ে আসার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিতেরও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ছাত্র ফেডারেশন : ৪১ দফা ইশতেহারে সংগঠনটি ডাকসুর গঠনতন্ত্রের গণতান্ত্রিক সংশোধন চেয়ে উপাচার্য পরিবর্তে নির্বাচিত শিক্ষার্থীকেই সভাপতি করার দাবি জানিয়েছে। গতকাল দুপুরে মধুর ক্যান্টিনে এ ইশতেহার ঘোষণা করেন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হক ইশতিয়াক। এ সময় সংগঠনটির প্যানেলে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী উম্মে হাবিবা বেনজির, সমাজসেবা সম্পাদক প্রার্থী মুহাম্মাদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সদস্য প্রার্থী সালমান ফরাজী ও আরমানুল হকসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ইশতেহারে আরও রয়েছেÑ অনলাইনে ও অফলাইনে নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে যেকোনো ধরনের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও বিচারে টাস্কফোর্স গঠন, ভূমিকম্পসহ যেকোনো দুর্যোগে দ্রুত সাড়া দেওয়ার স্বার্থে মেয়েদের হলের কলাপসিবল গেটে তালা লাগানো স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, রাত ৯টা পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য বাস চালু ও জরুরি রুটে ট্রিপ বাড়ানো, মেয়েদের হলে ওষুধ ও স্যানিটারি উপকরণসমৃদ্ধ ফার্মেসি স্থাপন এবং রাতে ‘ইমার্জেন্সি মেডিকেল ট্রিটমেন্ট’-এর জন্য দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত, মেয়েদের হলে প্রবেশের সময়সীমা নির্ধারণে গণভোট গ্রহণ, হলে প্রবেশের সময়সীমা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় লাইব্রেরি থেকে মেয়েদের হলে স্পেশাল বাস ট্রিপ চালু এবং মেয়েদের হলে ২৪ ঘণ্টা রিডিং রুম খোলা রাখা, রিকশা ভাড়ার চার্ট তৈরি, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই কঠোরভাবে নির্মূল করা, মাদক বিক্রি ও সেবনের আখড়া উচ্ছেদ এবং বহিরাগতদের অবাধ আগমন যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতিও।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ) : গতকাল দুপুরে মধুর ক্যান্টিনে ইশতেহার ঘোষণা করেন সংগঠনের ভিপি প্রার্থী নাইম হাসান। এতে ক্যাম্পাসকে দলবাজ, দখলবাজ এবং জুলুমবাজদের হাত থেকে মুক্ত করা; শিক্ষা-গবেষণা-অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের মানোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি; গণরুম পরিহার করে প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সিট বণ্টন; ডাইনিং, ক্যান্টিন ও ক্যাফেটেরিয়ায় সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত খাবার নিশ্চিত; মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন ও হলভিত্তিক আবাসিক চিকিৎসক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও গবেষণাকেন্দ্র নির্মাণ; প্রয়োজনীয়সংখ্যক বাস ও রুট বৃদ্ধি এবং রাত ৯টা পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালু রাখা; আন্তঃহল ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা; প্রত্যেক হলে আধুনিক জিমনেশিয়াম ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং সংস্কৃতি ও চিত্তবিনোদনের জন্য আধুনিক চর্চা কেন্দ্র নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত করতে বেশি বেশি প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং মানসম্মত পুরস্কার দেওয়া; প্রত্যেক হলে উচ্চগতির ওয়াইফাই জোন চালু এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপনেরও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে। এ ছাড়া পরিবেশ-পরিষদের অন্তর্ভুক্ত সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি এবং সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক বিবেচনা পরিহার করে নিয়মানুযায়ী মেধাবীদের শিক্ষক নিয়োগ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, অনুষদ ও বিভাগীয় পাঠাগারের পরিধি সম্প্রসারণ ও সব লাইব্রেরিকে ই-লাইব্রেরির আওতায় আনা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শতবার্ষিকী উদযাপন এবং মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীর প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়কে শতভাগ আবাসিক সুবিধার আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ভবন ও নতুন হল নির্মাণ করার কথাও বলা হয়েছে।
লিফলেট, ব্যানারে ছেয়ে গেছে ক্যাম্পাস : পুরো ক্যাম্পাস ছেয়ে গেছে বিভিন্ন প্রার্থীর লিফলেট ও ব্যানারে। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এতে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন তারা। গতকাল ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, প্রত্যেকটি হল ও একাডেমিক ভবনের সামনে ব্যানার শোভা পাচ্ছে। ক্যাম্পাস ও হলসহ সর্বত্র ভোটও চাইছেন প্রার্থীরা; বিতরণ করছেন পোস্টার, লিফলেটসহ নানান প্রচারপত্র। এসব প্রচারপত্রে যত্রতত্র ফেলায় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গা নোংরা হচ্ছে। কলাভবন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, কার্জন হলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো নোংরা বেশি হচ্ছে।
