বিকাশ গ্রাহকদের নিঃস্ব করছে প্রতারকচক্র

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৯, ০৩:১২ এএম

বিকাশ কর্মকর্তা পরিচয়ে গ্রাহকদের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকচক্র। কিন্তু প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় কেউ পুলিশের কাছেও যেতে চান না। বিকাশ হটলাইন ১৬২৪৭ বা কাস্টমার কেয়ারে ফোন করেও কোনো সদুত্তর মেলে না। কোনো জবাব দেয় না মোবাইল ফোন অপারেটর বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষও। উল্টো হটলাইনে ফোন করে আরও টাকা গচ্চা যায় গ্রাহকের।

বিকাশ কর্র্তৃপক্ষ বলছে, সতর্ক থাকলেই প্রতারণা থেকে বাঁচা যাবে এবং প্রতিনিয়তই তারা গ্রাহকদের সচেতন করছে। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মো. জহিরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে গ্রাহকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রচার চালাচ্ছি। কেউ প্রতারিত হলে আমাদের কমপ্লেইন সেলে অভিযোগ দিতে পারে অথবা হেল্পলাইন ১০০-এ জানাতে পারে। আমরা অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের অর্থ ফিরে পেতে সহায়তা করি এবং প্রতারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই।’ কিন্তু প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা এটিকে নতুন হয়রানি বলে মনে করেন।

সহজ ও ঝামেলামুক্ত হওয়ায় দেশে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে মোবাইল ফোনে আর্থিক সেবা (এমএফএস)। বিটিআরসির হিসাবে, দেশে এমএফএস বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক কমপক্ষে ৬ কোটি ৬৮ লাখ। প্রতিদিন প্রায় ৬৫ লাখ গ্রাহক এ মাধ্যমে লেনদেন করছেন হাজার কোটি টাকারও বেশি। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বিকাশ ও রকেটের গ্রাহকই বেশি। কিন্তু প্রতারণার শিকার গ্রাহকের কোনো দায় নিতেই রাজি হয় না বিকাশ সেবাদাতা ব্র্যাক ব্যাংক ও রকেট সেবাদাতা ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষও। গত বুধবার ধানমণ্ডির ২ নম্বর সড়ক থেকে খোকন বণিক (২৩), মো. সাইদুল ইসলাম ওরফে জসিম (২৪) এবং

মো. সাইদুল ইসলাম ওরফে সাইদুলকে (২৬) গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বিকাশের দোকানে রক্ষিত লেনদেনের রেজিস্ট্রারের ছবি কৌশলে তুলে নেয় তারা। এরপর ফোনে গ্রাহককে বলা হয়, ‘আমি বিকাশ অফিস থেকে বলছি, আপনার অ্যাকাউন্টে কিছু সমস্যা হয়েছে, তা ঠিক করে দিতে চাইছি।’ কখনো বলা হয়, ‘বিকাশ আপগ্রেডেশনের কাজ চলছে। আমি কিছু নির্দেশনা বলব, আপনি সেভাবে কাজ করুন। তাহলে আপনার অ্যাকাউন্টটি ঠিক থাকবে, নাহলে এটি বন্ধ হয়ে যাবে।’ এরপর গ্রাহককে বলা হয়, ‘প্রথমে আপনি *২৪৭# চাপুন।’ তারপর পর্যায়ক্রমে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, টাকার পরিমাণ, পাসওয়ার্ড দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। কাজ শেষ হওয়ার পরপরই ওই নম্বরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে গ্রাহক টের পান তার অ্যাকাউন্ট ফাঁকা।

গত সোমবার ‘বিকাশ লেখা’ একটি এসএমএস পান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সোহরাব। এরপর তাকে ০১৮২২৬৮৫৯৬০ নম্বর থেকে ফোন করে বলা হয়, ‘আমি বিকাশের প্রধান কার্যালয় থেকে বলছি। আপনি আমাদের পাঠানো কোডটি ডায়াল করুন।’ এরপর তার পাসওয়ার্ড চেয়ে বলা হয়, ‘আপনি নতুন পাসওয়ার্ডটি পেয়ে যাবেন।’ পরে অ্যাকাউন্টে থাকা তিন হাজার টাকা খোয়া যাওয়ার বিষয়টি টের পান তিনি। সম্প্রতি প্রতারকচক্রের খপ্পরে পড়ে তার এক নারী সহকর্মী খুইয়েছেন ৫ হাজার ২৩৫ টাকা। ওই নারীর এক বান্ধবীর ৫১ হাজার ২০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা। পরে দুজনই হটলাইনে ও বাংলামোটরে বিকাশ কাস্টমার কেয়ারে অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাননি। তারা নিজ নিজ মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বলা হয়, বিকাশ ও রকেট সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সার্ভিস। তাদের সঙ্গে অপারেটরের কোনো সম্পর্ক নেই।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় ০১৩০৪১৪২৬৭৩ নম্বর থেকে ০১৭১১১৪০২৯০ নম্বরে ফোন করে বলা হয়, ‘আপনার অ্যাকাউন্টে আজ টাকা ঢুকছে। আমি বিকাশ অফিস থেকে বলছি।’ কিন্তু ওই নম্বরে কোনো টাকা আসেনিÑ এ তথ্যটি ধমকের সুরে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে অন্যপ্রান্ত থেকে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরে কয়েক দফায় কল দিলেও প্রতিবারই রিসিভ করে কোনো কথা না বলেই তা কেটে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনপ্রধান শামসুদ্দীন হায়দার ডালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। মানিব্যাগ খুলে রেখে দিলে যেভাবে টাকা চোর নিয়ে নেয় তেমনি পিন নম্বর জেনে গেলে মোবাইলে থাকা টাকাও খোয়া যাবে। প্রতারকচক্র মিষ্টি কথায় লোকজনকে ভুলিয়ে তাদের পিন নম্বর জেনে নিচ্ছে। বিকাশ যেহেতু সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয় তাই সেখানে কেউ প্রতারণা করলে তাৎক্ষণিক ধরা সম্ভব হয় না। তাই গ্রাহকদের উচিত কোনো অবস্থাতেই তার পিন নম্বর কাউকে না দেওয়া বা না বলা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে এ বিষয়ে গ্রাহকদের সতর্ক করছি। তারা যাতে কোনো অবস্থাতেই তার পাসওয়ার্ড কাউকে না বলেন।’

প্রতিষ্ঠানটির আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, অ্যাকাউন্ট হালনাগাদ বা অন্য কোনো কারণে বিকাশের পক্ষ থেকে কাউকে ফোন করা হয় না। কোনো সন্দেহজনক লেনদেন হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। অনেকের অ্যাকাউন্ট স্থগিত বা লেনদেন আটকে দেওয়া হচ্ছে। এসবের পাশাপাশি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা গেলে এ ধরনের প্রতারণা রোধ করা সম্ভব। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি ও সোশ্যাল ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা বেশকিছু অভিযোগ তদন্ত করে দেখেছেন, বিকাশ বা অন্য কোনো মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের অসাধু কিছু কর্মী প্রতারকদের হাতে গ্রাহকের গোপন তথ্য তুলে দেয়। বিভিন্ন সময়ে চাকরি হারানো কর্মীরাও এসব তথ্য ফাঁস করে। পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টরাও প্রতারকদের তথ্য দিচ্ছে।

একই বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হওয়ার প্রচুর অভিযোগ পাই। এর থেকে বাঁচার উপায় হলো নিজে সতর্ক থাকা। আমি নিজেও ফেইসবুকে এ বিষয়ে সতর্ক করে অনেক লেখা দিয়েছি।’

মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘প্রতারকচক্রের সদস্যরা অলিগলিতে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের দোকানের সামনেই থাকে। কোনো ব্যক্তি বিকাশে টাকা পাঠালে সঙ্গে সঙ্গে টাকার পরিমাণ, প্রেরক ও প্রাপকের মোবাইল নম্বর টুকে নিয়ে দ্রুত চক্রের অন্য সদস্যের কাছে পাঠিয়ে দেয় তারা। কিছুক্ষণ পরই প্রতারক প্রাপককে ফোন করে টাকার অঙ্ক, সময় এবং প্রেরিত ফোন নম্বরটি উল্লেখ করে জানায়, টাকাটা মূলত তার কাছে ভুলে চলে গেছে, তা দ্রুত ফেরত দিতে অনুরোধ করা হয়। এভাবে গ্রাহকরা প্রতারিত হয়। মূলত নিম্ন আয়ের ও অশিক্ষিত লোকজনকেই তারা টার্গেট করে বেশি।’ তিনিও এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত