রাত পোহালেই বহুল প্রতীক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ ২৮ বছর পর হতে যাওয়া এই নির্বাচন নিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি সংশয়ও আছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি ১২টি প্যানেলের সবার অভিন্ন অভিযোগ এ নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় অনেক গলদ রয়েছে। নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ছাত্রলীগ হস্তক্ষেপ করবে বলে আশঙ্কা তাদের। আর ছাত্রলীগের একমাত্র শঙ্কা, ছাত্রী হলগুলোর ১৬ হাজার ২০০ ভোটার।
গত কয়েক দিন ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য প্যানেলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সবচেয়ে বড় অভিযোগ এসেছে ভোটের সময় নির্ধারণ নিয়ে। তারা বলেছেন, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টা সময়ে ৪৩ হাজার ভোটগ্রহণ সম্ভব নয়। এই নির্বাচনে ঢাবির একজন শিক্ষার্থী ডাকসু ও হল সংসদের দুই ব্যালট পেপার (২৫+১৩) মিলিয়ে ৩৮ পদে একটি করে ভোট দিতে পারবেন। আর ১৩ প্যানেলে প্রার্থীর সংখ্যা ৭৩৩। ডাকসুতে ২৫ পদের বিপরীতে প্রার্থী হলো ২২৯ জন। কাজেই একেক ভোটারকে অন্তত হল সংসদের ৫০ প্রার্থীসহ ২৭০ জনের মধ্য থেকে বাছাই করে ৩৮ জনকে ভোট দিতে হবে। প্রার্থীসহ এ জন্য তিনি সময় পাবেন তিন মিনিট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পছন্দের প্রার্থী বাছাই করে ৩৮টি পদে ভোট দিতে একজন শিক্ষার্থীর ৭-৮ মিনিট সময় লাগবে। গড়ে ৭ মিনিট করে ধরলে মোট ভোটারের জন্য সময় প্রয়োজন ৫ হাজার ৪৭ ঘণ্টা। ১৮টি হলে এই ভোটগ্রহণ হবে। ঢাবির ১৮টি হল মিলিয়ে ডাকসু নির্বাচনে মোট ভোটার ৪২ হাজার ৯২৩ জন। ভিপি-জিএসসহ ডাকসুতে ২৫টি এবং হল সংসদে পদ রয়েছে ১৩টি করে। এই ৩৮ পদে ভোট দিতে একজন ভোটারের জন্য বরাদ্দ তিন মিনিট হিসাবে একটি বুথে ঘণ্টায় ২০ শিক্ষার্থী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
আগামীকাল ১১ মার্চ সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলবে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ। পর্যাপ্ত সংখ্যক বুথের ব্যবস্থা না হলে এই ছয় ঘণ্টায় অর্ধ লাখের কাছাকাছি ভোটার ভোট দিতে পারবেন কি না এই নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ছাত্রলীগের বিরোধী পক্ষ বলছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে গত কয়েক বছর ধরে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের ভূমিকা আর আধিপত্য নিয়ে সংগঠনটি অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি প্যানেল গঠনের সময়কার বিশৃঙ্খলাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে তাদেরকে অজনপ্রিয় করেছে। তাই ভোটের সময় কমিয়ে পরিচিতদের এনে কেন্দ্রে ভিড় করিয়ে ফল পক্ষে নিতে চাইছে ছাত্রলীগ।
ছাত্রলীগের প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণের পদ্ধতি ও সময় প্রায় সব স্তরেই রয়েছে নানা ত্রুটি। প্রতিদিনই আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ। হলগুলো এখনো ছাত্রলীগের দখলে। প্রচারে বাধা পাচ্ছে ছাত্রলীগের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। কোথাও কোথাও পোস্টার টানাতেই দেওয়া হয়নি। ছাত্রত্ব না থাকলেও দুজনকে প্রার্থী করেছে ছাত্রলীগ। এসব অভিযোগ বারবার করা হলেও শুরু থেকেই দায়সারা বক্তব্য দিয়ে আসছেন চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক এস এম মাহফুজুর রহমান। তিনি কখনই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেননি, সমাধানের জন্য হল প্রভোস্টকে দেখিয়ে দিয়েছেন। আবার প্রভোস্ট দেখিয়ে দিয়েছেন চিফ রিটার্নিং অফিসারকে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল শুক্রবার চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক মাহফুজুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়ম মেনেই মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রচারে বাধা দেখবেন হল প্রভোস্ট। সেখানে জিজ্ঞাসা করুন। আমরা নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি, নির্বাচন ভালো হবে।’
ছাত্রত্ব না থাকলেও প্রার্থী ছাত্রলীগের ২ নেতা : ছাত্রত্ব না থাকলেও শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের ভিপি ও এজিএস প্রার্থী হয়েছেন সাইফুল্লা আব্বাছি ও সুরাপ মিয়া। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকায় তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।
প্রশাসনিক ভবনের তথ্যানুযায়ী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের এই দুই শিক্ষার্থীর স্নাতকোত্তরের ফল প্রকাশ হয় ২৮ জানুয়ারি। নিয়ম অনুযায়ী, ফল প্রকাশের পর কারও ছাত্রত্ব থাকে না, যেখানে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ১১ ফেব্রুয়ারি।
আচরণবিধি লঙ্ঘন : নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের বেশি অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ থেকে মুক্ত নয় ছাত্রদল এবং বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর দুই মোর্চাও। অভিযোগ উঠেছে, আচরণবিধি ভঙ্গ করে গতকাল শুক্রবার ভোট চেয়েছেন ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানী। জুমার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দাঁড়িয়ে ছাত্রলীগ প্যানেলকে জয়ী করতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। নির্বাচনের আচরণবিধিতে ধর্মীয় উপাসনালয়ে কোনো ধরনের প্রচার চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এর আগে গত ৭ মার্চ সুফিয়া কামাল হলে রাত ১১টার পর মাইক ব্যবহার করে ছাত্রলীগ। এ প্রসঙ্গে আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, শুধু ক্যাম্পাস এলাকায় সভা, সমাবেশ ও অডিটোরিয়ামে মাইক ব্যবহার করা যাবে। তবে কোনোক্রমেই রাত ১১টার পর মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
এছাড়া ৬ মার্চ নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করে মঞ্চ স্থাপন করে ছাত্রলীগ। দলীয় প্যানেলের পরিচিতি সভা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে করা হয়। এছাড়াও প্রচারের শুরুতে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন রঙিন পোস্টার লাগিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন। দেয়ালে পোস্টার বা হ্যান্ডবিল লাগানোর বিধিনিষেধ থাকলেও তা মানছে না ছাত্রলীগ। হলের বিভিন্ন দেয়ালে তাদের হ্যান্ডবিল লাগাতে দেখা গেছে। যদিও আচরণবিধিতে আছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হল এলাকায় অবস্থিত কোনো প্রকার স্থাপনা, দেয়াল, যানবাহন, বেড়া, গাছপালা, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি বা অন্য কোনো দন্ডায়মান বস্তুতে লিফলেট বা হ্যান্ডবিল লাগানো যাবে না।
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গ করে ডাকসুর ভোটার বা প্রার্থী নন, এমন নেতাকর্মীদের নিয়ে ৭ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে ছাত্রদল। এর আগে ৫ মার্চ অছাত্রদের নিয়ে দলীয় প্যানেলের পক্ষে প্রচার চালায় তারা।
একই দিন ‘ব্যান্ড পার্টি’সহ শোভাযাত্রা করে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর দুই মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্রঐক্য সমর্থিত যৌথ প্যানেল প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যের প্রার্থীরা। শোভাযাত্রায় জোটের কেন্দ্রীয় নেতারাও ছিলেন, যারা ডাকসুর ভোটার বা প্রার্থী কোনোটাই নন। যেখানে আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারে কোনো ধরনের যানবাহন যেমন মোটরকার, মোটরসাইকেল, রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি, হাতি, ব্যান্ড পার্টি ইত্যাদি নিয়ে কোনোরূপ শোভাযাত্রা বা মিছিল করা যাবে না। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটার বা প্রার্থী ছাড়া অন্য কেউ কোনোভাবেই কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচার চালাতে পারবেন না। এসব নিয়ে অভিযোগ করা হলেও ‘নিশ্চুপ রয়েছে’ নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচনে অঢেল টাকা ঢালার অভিযোগ : ডাকসু নির্বাচন সামনে রেখে ক্যাম্পাস ছেয়ে গেছে ব্যানার-ফেস্টুনে। রয়েছে হাজার হাজার লিফলেট। চলছে বিভিন্ন ধরনের খাওয়ার আয়োজন। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখানে ডোনেশন দেওয়ার কারণে এমন হয়েছে। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী তার প্রচারে এত টাকা খরচ করতে পারবে না। এটা অবশ্যই ডাকসু নির্বাচনে হওয়া উচিত নয়। শুধু শিক্ষার্থীরা এখানে নির্বাচন করবে।
বিরোধী দলকে প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ : অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিজয় একাত্তর হলে ছাত্রদলের জিএস প্রার্থীর প্রচারসামগ্রী কেড়ে নেয়। কুয়েত মৈত্রী হলে স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী আসিফুর রহমানের প্রচারের জন্য বরাদ্দ কক্ষ দখল করে ছাত্রলীগ। এছাড়া বিভিন্ন হল থেকে ব্যানার সরিয়ে ফেলেছে তারা।
সহাবস্থান হলে নেই, ক্যাম্পাসে আছে : ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠন উপস্থিত থাকলেও হলে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কারও অবস্থান নেই। স্বতন্ত্রদের ‘জোর করে’ বসিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
