উপজেলার চেয়ে ডাকসুতে মনোযোগ বেশি আ.লীগের

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৯, ০৩:১৫ এএম

২৮ বছর পর আগামীকাল ১১ মার্চ সোমবার অনুষ্ঠেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় এই নেতৃত্ব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলটি তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের নিরঙ্কুশ বিজয় চায়। এ জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী-এমপি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতানেত্রী সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন নির্দেশ যায়নি আজই শুরু হতে যাওয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে।

আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে জানান, দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডাকসু নির্বাচন নিয়ে এই নির্দেশ দিয়েছেন। ডাকসু নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমানসহ অন্য নেতারা এই নির্দেশ অন্যদের অবহিত করছেন। তারা আরও জানান, সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই’ ডাকসুর নেতৃত্ব নিজেদের ছাত্রসংগঠনের মধ্যেই থাকুক তা চায় আওয়ামী লীগ। এ জন্য নির্বাচনে বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই। তাই ক্ষমতাসীন দলের সবার ধ্যান-জ্ঞানেই এখন এই নির্বাচন।

ডাকসু নির্বাচনের আগের দিন আজ রবিবার উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপে দেশের ৭৮ উপজেলায় ভোট হবে। এরপর আরও চার ধাপে দেশের প্রায় সব উপজেলায় ভোট হবে। স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে প্রায় ১০০ উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতও হচ্ছে। যা নিয়ে সাংগঠনিকভাবে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এর কারণ জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, বিষয়গুলো ‘ওভারলুক’ করা হচ্ছে।

ডাকসুতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে ভিপি, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে জিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনকে এজিএস করে ২৫ সদস্যের প্যানেল দিয়েছে ছাত্রলীগ।

আওয়ামী লীগের ওই কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানান, পুরো প্যানেলকে বিজয়ী করতে প্রতিদিনই কৌশল নির্ধারণী বৈঠক হচ্ছে। প্রতিদিনই নির্বাচনের ‘ভালো-মন্দ খবর’ রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খবর নিচ্ছেন সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও।

ডাকসু নির্বাচনে দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, দফায় দফায় বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। শাহবাগের ফুল মার্কেটের পাশের বিল্ডিংয়ে নিয়মিত কৌশল নির্ধারণী বৈঠক হচ্ছে। ‘জটিলতা’ নিরসনে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের ডেকে কথা বলা হচ্ছে। নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার কিছু সুপারিশ আমাদের কাছে এসেছে। পাশাপাশি মাঠের বাস্তব চিত্র দেখে কিছু পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করছি।’

তারপরও ছাত্রলীগের পুরো প্যানেলের জয়ের নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। কারণ হিসেবে দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, ডাকসু নির্বাচনে সরকারবিরোধী ‘সেন্টিমেন্ট’ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের বিরোধী সব সংগঠন। কোটাবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা সরকারের ‘মাথা ব্যথার’ কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকেও কিছু অসহযোগিতার চেষ্টা চলছে। সেগুলো চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি যা-ই দাঁড়াক কেন ছাত্রলীগ প্যানেলের বিজয়ের বিকল্প দেখছেন না আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতারা। কারণ ডাকসুতে ছাত্রলীগের প্যানেল বিজয়ী না হলে সারা দেশের ছাত্র নেতৃত্ব ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ওই নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঐতিহাসিকভাবে ডাকসু বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। দীর্ঘ ২৮ বছর এখান থেকে কোনো নেতা উঠে আসার সুযোগ হয়নি। তাই ডাকসুর নতুন নেতৃত্বে কারা আসছেন- এটা নিয়ে সাধারণ মানুষেরও কৌতূহলের কমতি নেই। আবার ‘বর্তমানে রাজনৈতিক বাস্তবতার’ আলোকেও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব বেড়েছে ডাকসুর। সব মিলে আওয়ামী লীগের কাছে উপজেলা নির্বাচনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডাকসুতে ছাত্রলীগ হারলে বিরোধী পক্ষ সমালোচনার সুযোগ পাবে। তরুণসমাজে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। তাই তাদের সবার নজর এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তারা বলেন, দেশের ছাত্ররাজনীতির মূল কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকে নানা আন্দোলন যেমন জন্ম নেয়, তেমনি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণও হয়। গত বছর দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোটাবিরোধী আন্দোলনের সূচনাও হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। তাই এ নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও ডাকসুর সাবেক জি এস আখতারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডাকসুকে অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এ জন্য যে দীর্ঘ ২৮ বছর পর নির্বাচন হচ্ছে। এই নির্বাচন কীভাবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করতে আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা রয়েছে। তিনি বলেন, যেহেতু আমাদেরই ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ একমাত্র পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিয়েছে তাই আওয়ামী লীগের ব্যস্ততা থাকবে। জয় নিয়ে কতটা আশাবাদী- জানতে চাইলে পাল্টা প্রশ্ন রেখে আখতারুজ্জামান বলেন, ছাত্রলীগ ছাড়া কার বিজয় দেখছেন, কেন দেখছেন? আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ তথা সরকারের কাছে গুরুত্বের। আমরা চাই- সুষ্ঠু, সুন্দর পরিবেশে ডাকসু নির্বাচন হবে এবং ছাত্রলীগ প্যানেল নিরঙ্কুশ জয় পাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত