সরকারের কোন দপ্তরের কোন সেবা, কতদিনে মিলবে, তাতে কী কী নথি ও কত টাকা ফি বা চার্জ লাগবে এসব চূড়ান্ত করে বিগত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় সিটিজেন চার্টার করে দপ্তরগুলো। তখন সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর প্রবেশপথের পাশাপাশি ওয়েবসাইটে বড় করে দেওয়া থাকত ওই চার্টার। তবে সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি রোধের উদ্দেশ্যে করা ওই চার্টার ও তার কার্যকারিতা গত এক যুগের ব্যবধানে হারিয়ে গেছে, বেড়েছে সেবা প্রার্থীদের ভোগান্তি।
হারানো সেই সিটিজেন চার্টার ফিরিয়ে এনে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানিমুক্ত সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সে জন্য ‘সিটিজেন হেল্প ডেস্ক’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। গুগল প্লে স্টোর থেকে এনড্রয়েড মোবাইল ফোনে ওই অ্যাপ ডাউনলোড দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আপাতত ওই অ্যাপের মধ্যে সব জেলা, বিভাগীয় কমিশনার, সিটি করপোরেশন ও মন্ত্রণালয়গুলোর সিটিজেন চার্টার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন দেশের সব উপজেলা ও পৌরসভার সিটিজেন চার্টারও এতে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে।
মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশনের দক্ষতা উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় এ অ্যাপটি তৈরি করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মোহাম্মদ আবদুল হাই দেশ রূপান্তরকে জানান, এই অ্যাপে সরকারের মন্ত্রণালয় থেকে উপজেলা ও পৌরসভা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের ৪ হাজার ৫০০টি দপ্তর ও সংস্থার সিটিজেন চার্টার অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে। পরের ধাপে এসব দপ্তরের সব সেবায় অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থা করা হবে। এতে সেবা পেতে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি দূর হবে। ঘুষ-দুর্নীতিও বন্ধ হবে। এই অ্যাপের মাধ্যমে জনগণ সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল পাবে।
সিটিজেন হেল্প ডেস্ক অ্যাপটি ডাউনলোড করে দেখা যায়, সেখানে ৬৪টি জেলার নাম বাংলায় রয়েছে। যেকোনো জেলার নামে ক্লিক করলে ওই জেলার সব সরকারি দপ্তরের নাম চলে আসে। যেকোনো দপ্তরের নামে ক্লিক করলে ওই দপ্তর থেকে কোন কোন সেবা দেওয়া হয়, সেবাগুলো পেতে আবেদনের সঙ্গে কোন কোন কাগজপত্র জমা দিতে হবে, তার তথ্যসহ নির্ধারিত ফি এবং আবেদন করার কত দিনের মধ্যে সেবাটি পাওয়া যাবে, তার বিস্তারিত তথ্য বাংলায় পাওয়া যায়। অ্যাপটিতে ঢাকা জেলায় ঢুকে বিআরটিএ, ঢাকায় ক্লিক করলে দেখা যায় সংস্থাটির বিভিন্ন ধরনের সেবার বিস্তারিত তথ্য। যেমন রেট্রো রিফ্লেকটিভ নাম্বারপ্লেট পেতে সময় লাগবে ৯০ দিন, আবেদনের সঙ্গে জমা দিতে হবে রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র, সংশ্লিষ্ট গাড়ির উপস্থিতি দরকার হবে। মোটরসাইকেল ও থ্রি হুইলারের জন্য ফি ২ হাজার ২৬০ টাকা, অন্যান্য যানবাহনের জন্য ৪ হাজার ৬২৮ টাকা।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঢুকে দেখা যায়, প্রবাসীদের অবিবাহের সনদ দেওয়া হয় ১৫ দিনে। এ জন্য প্রয়োজন নির্ধারিত আবেদনপত্র, পাসপোর্টের ফটোকপি, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নাগরিকত্ব ও অবিবাহিত সনদ, ২০০ টাকা মূল্যের স্ট্যাম্পে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা, ৭০০ টাকার চালান (চালানের কোড নং-১-২২০১-০০০১-২৬৮১), জন্মসনদের সত্যায়িত কপি ও আবেদনকারীর পাসপোর্ট সাইজের দুই কপি ছবি। তাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী কমিশনারের ফোন নম্বর, রুম নম্বর এবং তার ই-মেইল আইডি দেওয়া আছে।
গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপটি দেওয়া হলেও এখনো গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সিটিজেন চার্টার এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বেশ কিছু মন্ত্রণালয়ের সিটিজেন চার্টার এখনো অ্যাপটিতে যুক্ত করা হয়নি। অ্যাপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৩টি বিভাগের বিভিন্ন সেবার তথ্য থাকলেও উত্তর সিটি করপোরেশনে শুধু হোল্ডিং কর এবং ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আবদুল হাই বলেন, ‘অনেক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেই সিটিজেন চার্টার নেই। সে জন্য এখনো সব মন্ত্রণালয়ের সিটিজেন চার্টার পাওয়া যায়নি। তবে সিটিজেন চার্টার চেয়ে মন্ত্রণালয়গুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করছি শিগগির পাওয়ার পর অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। তার আগেই সব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাপটি চালু করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন যারা অ্যাপটি ব্যবহার করছেন, তারা অ্যাপটি আপডেট না দিয়ে ডিলেট করার পর নতুন করে ডাউনলোড দিলে নতুন সংযোজিত দপ্তরগুলোর সিটিজেন চার্টার পাবেন। আর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর ডাউনলোড দিলে সব তথ্যই পাবেন ব্যবহারকারী।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ওই জেলার ৬৯টি দপ্তরের ৮০৪টি সেবা নিয়ে চাঁদপুর সিটিজেন হেল্প ডেস্ক নামে একটি মোবাইল অ্যাপ প্রস্তুত করে। ওই অ্যাপটি দেখার পর তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ সারা দেশের সরকারি দপ্তরগুলোর সব ধরনের সেবা নিয়ে নতুন এই অ্যাপ প্রস্তুতের কাজ হাতে নেয়।
