অনেক ভালোর পরও দেশ যেন একটি সামাজিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যানই আতঙ্কিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর এটিও সত্য গণমাধ্যমে সকল সংবাদ এসে পৌঁছে না। একই সঙ্গে নানা ধরনের মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে। অগ্নিকা-, সন্ত্রাস, ছিনতাই, ডাকাতিতে মানুষ জীবন হারাচ্ছে। অপহরণ বাড়ছে। অপহরণের সূত্রে খুনোখুনি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো রেকর্ড ছাপিয়ে যাবে। ক্রমাগত ঘটে যাওয়া খুন-সন্ত্রাস নিয়ে পত্রিকার সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় ও নানা নিবন্ধ-প্রতিবেদন কম লেখা হচ্ছে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের কঠোর হুঁশিয়ারি আর পুলিশ কর্মকর্তাদের সাজ সাজ রব ও নানা পরিকল্পনার আয়োজন তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাবৎ রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রকদের চোখের সামনে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে খুনি আর সন্ত্রাসীরা। বাস্তব অবস্থা এখন এমন যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে পুলিশের পেটি অফিসারও যদি সন্ত্রাস দমনের পরিকল্পনা ও কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন তো মানুষের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া পড়ে। তাই স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন ওঠে, এই খুনে দেশের আসল জিম্মাদার কে বা কারা?
বিপর্যস্ত সন্ত্রস্ত মানুষ এখন বড় বিপাকে পড়েছে। তারা ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না তাদের নিরাপত্তার প্রকৃত আশ্বাস কোন দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে আসবে। আদিম শিকারি মানুষ এক সময় সফল শিকারের নিশ্চয়তা পাওয়ার জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজন অনুভব করেছিল। তারা গড়ে তুলেছিল ক্ল্যান সংগঠন। এভাবেই গড়ে উঠেছিল ট্রাইব, পরিবার, রাষ্ট্র ইত্যাদি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনকে সুশৃঙ্খল করার জন্য এভাবে মানুষ নিজেদের নিয়ম ও পদ্ধতির ভেতর আবদ্ধ করেছে। এই যৌক্তিক চিন্তার পথ ধরে মানুষ হাজার হাজার বছর অতিক্রম করেছে। নতুন নতুন রাষ্ট্রচিন্তা ও পদ্ধতি নিয়ে মানুষ অনেক নিরীক্ষা করেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের মতো আধুনিক রাষ্ট্র দর্শনের আদর্শ নিয়ে আমরাও পথচলা অব্যাহত রেখেছি। অথচ দুর্ভাগ্য এই যে, আজ বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশ্ন তুলতে হয়Ñ এই বিপর্যস্ত সমাজ জীবন থেকে কীভাবে মুক্তি আসবে?
অপরাধের ধরনে এখন বৈচিত্র্য অনেক। রাজনৈতিক হত্যাকা- এদেশে একটি পুরান ধারা। গত দশক ধরে এরকম হত্যাকা- কম হয়নি। রাজধানীসহ নানা অঞ্চলে রাজনৈতিক নেতা হত্যা, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, যুবলীগ, যুবদলের স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর হত্যার পরিসংখ্যান অতি সম্প্রতি অনেক বেড়ে গেছে। অপহরণের পর শিশু থেকে যুবক হত্যার সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। সম্পত্তি ও জমি জমা নিয়ে ঝগড়ায় স্বজনদের মধ্যে পারস্পরিক খুনোখুনির প্রবণতা উল্লেখ করার মতো। স্বামী ও স্বামীর পরিবারের হাতে স্ত্রী খুনের সঙ্গে স্ত্রী কর্তৃক স্বামী খুন হওয়ারও ঘটনা ঘটছে ইদানীং। ইভটিজিং, ধর্ষণ, পারিবারিক অশান্তি এসবের কারণে আশঙ্কাজনকভাবে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে এখন রেকর্ড ছাড়াতে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার। হত্যাকা-ের মতো অপরাধে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা নতুন করে আতঙ্কিত করে তুলছে দেশবাসীকে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি এবং তা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ব্যর্থতা এখন একটি কঠিন সত্যে পরিণত হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে নির্বাচিত সরকারের সরব অবস্থানের পরও কেন এই ব্যর্থতা? এর কারণ খোঁজা ও অপনোদনের চেষ্টা না করলে কোনো বুলিসর্বস্ব ‘অভিযান’ই কার্যকর হবে না। মনে রাখতে হবে, যুক্তি যতই থাক, ভালো-মন্দের দায়ভার সরকারকেই নিতে হয়। এ সত্যটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রের চর্চা যত না করেন, ‘গণতন্ত্র’ শব্দটির উচ্চারণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি করেন। বিরোধী দলগুলোর অবস্থানই থাকে সরকারের বিরোধিতায় অষ্টপ্রহর ব্যস্ত থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার নানা চতুর পথ আবিষ্কারে ঘর্মাক্ত হওয়া। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিশীল হতে দেখলে তাদের চোখ আনন্দে চকচক করে। সরকারের ব্যর্থতার কথা সরবে প্রচার করার মওকাটি জিইয়ে রাখতে পারলে তাদের স্বস্তি বাড়ে। সরকারের পক্ষ মাঝে মাঝে অভিযোগ করা হয়, তাদের নাজেহাল করার জন্য বিরোধী দল সন্ত্রাস আর খুন-খারাবিকে উসকে দিচ্ছে। সময়ের বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ এসব অভিযোগ একেবারে উড়িয়েও দিতে পারে না। অন্তত মানুষের কল্যাণচিন্তায় বিরোধী শিবির যে সন্ত্রাস প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছে তেমন নজির নেই। বরঞ্চ কোনো না কোনো নামাবরণে রাজনীতির ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসীদের অভয় বিচরণ ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
এসব বাস্তবতায় সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে কাক্সিক্ষত সাফল্য দেখাতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নানা পক্ষের রাজনীতির ধ্বজাধারীরা। এখন সন্দেহ হচ্ছে, এসব পক্ষ নগরবাসী বা দেশবাসীকে সন্ত্রাস বা হত্যাকা- থেকে মুক্তি দিতে চাইছেন কি-না। যদি চাইতেন তবে অপরাধের সংখ্যা এত বেড়ে যেত না। আমরা বহুবার বলার চেষ্টা করেছি, এবং দেশবাসীরও অজানা নয় যে, খুনি আর সন্ত্রাসীরা অনেকক্ষেত্রে চিহ্নিত এবং এদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা রাজনীতির পরিচয়ে ‘অভিজাত’ ব্যক্তিবর্গ। এই রেসে বরাবর সরকার পক্ষ এগিয়ে থাকে। সুতরাং এই বাস্তবতা স্বীকার না করে ঘরের ছেলেদের দুধভাতে পেলে-পুষে সন্ত্রাস নির্মূল করা যাবে না। পুলিশ বাহিনীর অর্থ-বিত্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠার বাস্তবতা যত উজ্জ্বল, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা ততটাই নি®প্রভ। এ নিয়েও কম লেখা হয়নি। র্যাবের মতো এলিট বাহিনী অভিযুক্ত হচ্ছে খুনের অভিযোগে। গালকাটা হাতকাটা লাল্টু-বিন্টু-বন্টু ধরনের নানা নামধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ সন্ত্রাস করছে, সদম্ভে মার্চ করছে রাজধানীসহ দেশের বুক চিরে, রক্ত ঝরিয়ে যাচ্ছে ভয়ার্ত মানুষের চোখের সামনে। তবু বেশিরভাগ সময় ওদের টিকি ছুঁতে পারছে না পুলিশ!
নানা বৈচিত্র্যের অপরাধ আর খুনোখনি দেখে বোঝা যায় সমাজ জীবনে একটি বড় অস্থিরতা কাজ করছে। এই অস্থিরতার কারণকে না খুঁজেÑ প্রতিবিধানের ব্যবস্থা না করে শুধু ফাঁকা বুলিতে মানুষকে আতঙ্কমুক্ত করা যাবে না। সাধারণত জনগণের অর্থনৈতিক জীবন বিপর্যস্ত হলে, সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে, রাজনৈতিক অঙ্গনে জনগণের অধিকার মূল্যহীন হলে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা না থাকলে সামাজিক জীবনে হতাশা ও অস্থিরতা বিরাজ করে। বর্তমান বাস্তবতায় মানতে হবে এখন দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক বেশি স্থিতিশীল। না খেতে পাওয়া মানুষের সংখ্যা সূচকের অনেক নিচে। মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে অনেকগুণ। এমন একটি অবস্থায় দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এবং রাজনীতি গণমুখী হলে সরকার ও রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতো। আইনের শাসন দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে অনেক অনাচার ও স্বেচ্ছাচার থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। কিন্তু সে পথে কি হাঁটছে আমাদের সরকার ও রাজনীতি?
সাধারণ মানুষ যখন দেখে দলীয়করণের অন্ধত্ব নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ রাজপথ দখল করে হাঁটছে তখন সাধারণ মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া পথ থাকে না। একজন মেধাবী প্রার্থী যখন দেখেন উজ্জ্বল সার্টিফিকেট, গবেষণা, প্রকাশনা তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে যোগ্য বিবেচনা করছে না। তার বদলে তৃতীয় সারির দুর্বল প্রার্থীটি দলীয় পরিচয়ের শক্তিতে শিক্ষকের নিয়োগপত্র হাতে পাচ্ছেন তখন লাঞ্ছিত মেধাবী ও তার পরিবারের জীবনে হতাশা নেমে আসতে বাধ্য। যখন দেখে দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ে শক্তিমান ধর্ষক বা অপহরণকারী সদম্ভে ঘুরে বেড়ায় আর নির্যাতনের শিকার পরিবার পালিয়ে বেড়ায় তখন সমাজ জীবন অস্থির হতে বাধ্য। যখন কার্যকারণসূত্রে সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায় আদালতে বিচারের রায় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নির্দেশনাতে লিখিত হবে তখন অন্ধকার গ্রাস করবেই।
সড়ক দুর্ঘটনার বাড়বাড়ন্ত না হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। দুর্নীতি গ্রাস করেছে প্রশাসনের সর্বত্র। টাকা দিলে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়। গাড়ির স্টিয়ারিং চলে যাচ্ছে অদক্ষ ড্রাইভারের হাতে। টাকার শক্তিতে ফিটহীন গাড়ি ফিটনেস সার্টিফিকেট নিয়ে পথে নামছে। ট্রাফিক আইন মান্য না করলে কোনো শাস্তি হয় না। অর্থমূল্যে সবকিছু কেনা যায়। ড্রাইভার অন্যায় করে জনজীবন বিপন্ন করলেও কোনো শাসন করা যাবে না। চালক গ্রেপ্তার হলে আইনের হাতে সোপর্দ করার সভ্য রীতি এদেশে অচল। এমন ঘটনা ঘটলে চালক সমিতির ডাকে অচল হয়ে যাবে পরিবহন ব্যবস্থা। তখন দুর্বল সরকারের প্রশাসন আপস করার জন্য ছুটবে। শ্রমিক নেতা-মন্ত্রীরা যাত্রী বা পথচারী মানুষের জীবন সংহারকারী অপরাধী চালকের পাশে দাঁড়াবেন। এসবের কারণে নির্ভয়ে দুর্দমনীয় হয়ে উঠছেন গাড়ির চালক ও মালিকরা। অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ না হওয়া সংস্কৃতি মানুষের জীবন বিপন্ন করা সড়ক দুর্ঘটনাকে ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে।
বর্তমান সরকার কৃষি, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা নানা ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে পেরেছে। কিন্তু দলীয়করণ, দুর্নীতির ক্রম বিস্তার সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হয়ে দেখা দিচ্ছে। এর কারণে সরকারের কৃতিত্বও ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এদেশের বিরোধী রাজনীতি যতবেশি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকে তার অযুতাংশও যদি জনকল্যাণ চিন্তায় ভূমিকা রাখত তবে সাধারণ মানুষের মন থেকে হতাশা অনেকটা কমিয়ে ফেলা সম্ভব হতো। একটি সুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় অপরাধী যেমন প্রকাশ্যে প্রতাপ দেখাতে পারে না তেমনি জনজীবন হতাশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। এ কারণে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদেরই অগ্রণী হতে হবে। রাজনীতিতে সততার সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সকল সীমাবদ্ধতার পরও মানুষ বিশ্বাস করে রাজনৈতিক জীবনের সুস্থতা, জনগণের প্রতি রাজনীতিকদের দায়বদ্ধতা, সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় সকল অন্যায় অবিচারের লাগাম টেনে ধরতে পারবে। যদিও চলমান বাস্তবতা মানুষকে অতটা স্বপ্ন দেখায় না তবুও এই দুঃসময়ে মানুষ আশাবাদী হতে চায়। বিশ্বাস করতে চায় আমাদের রাজনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। সন্ত্রাস, খুন আর সকল অনাচারের লাগাম টেনে ধরবে নির্মোহ মানসিকতায়।
