নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন এবং সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সরকার সমর্থক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছাড়া আর সব ছাত্রসংগঠন ও জোটগুলো তো নানা অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে ডাকসু নির্বাচন বয়কটই করল। এ ছাড়া কদিন আগে ফরিদপুরের বিখ্যাত সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। সেখানে ভোট পড়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। একটা কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তো সবার আসার কথা, কিন্তু কেউ আসেনি। ভোট হচ্ছে কিন্তু মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছে না। আর যারা ভোট দিতে চাইছে তারা ভোট দিতে পারছে না। এই চিত্র আমরা সাম্প্রতিক প্রায় সব নির্বাচনেই দেখলাম। বিষয়টা এ কারণেই আমাদের মনোযোগ এবং বিশ্লেষণ দাবি করে।
ডাকসু নির্বাচনে আমরা যা দেখলাম সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুরু থেকেই ডাকসুর ভোট নিয়ে নানারকম সংশয়-সন্দেহ ছিল এবং ভোটের দিনে সে সবই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ভোটের দিন সকাল থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে যেটা দেখা গেল সেটা খুবই হতাশাজনক। বিভিন্ন হলে ভোটের জন্য সকাল থেকে আমরা কিছু ভোটারদের লাইন দেখলাম, ভিড় দেখলাম। কিন্তু এই লাইনগুলো এগোচ্ছিল না, জটলার মতো দীর্ঘক্ষণ ধরে এগুলো স্থির ছিল। দেখে মনে হয়েছে যে, এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করা, যাতে অনাবাসিক ছাত্র-ছাত্রীরা এসে ভোট দিতে না পারে।
সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা এটা করে রেখেছিল। এক ঘণ্টা-দেড় ঘণ্টা ধরে ছেলেমেয়েরা ভোট দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থেকেছে এবং এরপর হতাশ হয়ে অনেক ইচ্ছুক ভোটারও ভোট দিতে না পেরে হতাশা নিয়ে ফিরে গেছে। আমি যে কটা হলে গেলাম, সেখানকার ছেলেমেয়েরা এই
কৃত্রিম লাইন নিয়ে অভিযোগ করেছে। হলগুলো যেহেতু একটা ছাত্রসংগঠনের দখলে রয়েছে, ফলে হলের বাইরের শিক্ষার্থীদের ভোট তাদের বিপক্ষে যেতে পারে, এমন শঙ্কা থেকেই হয়তো এটা করেছিল তারা। আর কয়েকটি হলে তো শিক্ষার্থীরা প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে বস্তা ও ট্রাংকভর্তি ব্যালট পেপার উদ্ধার করেছে।
এটা খুবই দুঃখজনক যে, বাংলাদেশের একটা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও এ রকমটা ঘটল। যে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আমরা গর্ব করি, যাকে গণতন্ত্রের সূতিকাগার, মিনি পার্লামেন্টসহ নানা অভিধায় নানা সময়ে অভিহিত করা হয়েছে, সেখানেও যদি এমন একটা জঘন্য নির্বাচন হয় তাহলে আর ভরসার কোনো জায়গা বাকি থাকে না। কুয়েত মৈত্রী হলে যেটা হয়েছে যে, একজন শিক্ষক, প্রভোস্ট সেখানে তার দায়িত্ব পালন করলেন না। রিটার্নিং কর্মকর্তা থেকে শুরু করে এখানের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সবই কিন্তু শিক্ষকরাই। কিন্তু তারাই এমন একটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এসব কাজ করলেন। কুয়েত মৈত্রী হলে ব্যালট বাক্স খোলার আগেই তা ব্যালটে ভরা ছিল। আর রোকেয়া হলে ট্রাংকভর্তি ব্যালট পাওয়া গেছে। ছাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে দুই দফা ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখতে হয়েছে, পরে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। অন্যান্য কয়েকটি হলেও নানারকম অনিয়ম ও ক্ষমতাসীনদের ছাত্রসংগঠনের চাপ প্রয়োগ, বল প্রয়োগের ঘটনার কথা জানা গেছে।
মারাত্মক হতাশা নিয়ে আমরা দেখলাম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচনের মতোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও একই চিত্র দেখা গেল। এই নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষ যেভাবে আস্থা হারাল তা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কারণ নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আবার মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অনেক দীর্ঘ সময় লেগে যাবে বলে আমি মনে করি। এসব নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জিতল বা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জিতল কি না তার চেয়ে বড় কথা হলো এর মধ্য দিয়ে আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরাজিত হয়ে গেল, পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থা পরাজিত হয়ে গেল। এটা পুরো দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি, গণতন্ত্রের চর্চায় এক মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে গেল।
দুঃখজনক হলো আওয়ামী লীগ দেশের ৩০০ আসনেই জিতে যাওয়ার পরও কোথাও অন্য কাউকে আসার কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারল না। কোথাও যে কোনো ভিন্নমত আসবে, সেই সুযোগই থাকল না। ৩০০ আসনে জেতার পরও তাদের আত্মবিশ্বাস এতটাই কম যে, উপজেলা নির্বাচন, সিটি নির্বাচন কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও তারা অন্য কারও নির্বাচিত হওয়ার কোনো পথই খোলা রাখতে পারল না। একটা নিরঙ্কুশ সংসদ থাকার পরও ছোটখাটো এসব নির্বাচনগুলো তারা সামাল দিতে পারল না। বিভিন্ন নির্বাচনে ভিন্ন দলের কেউ আসতে পারে, ভিন্নমতের কেউ নির্বাচিত হতে পারে এবং বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সেগুলোকে মোকাবিলা করার নৈতিক সাহস রাখে, রাজনৈতিকভাবে সেগুলোকে মোকাবিলা করতে পারে এমনটা কিন্তু আমরা দেখলাম না। এটা গণতন্ত্রের জন্য যেমন খুবই নেতিবাচক, তেমনি সরকারের জন্যও খুবই লজ্জার।
আওয়ামী লীগের বা সরকারের আত্মবিশ্বাসের অভাবটা আসলে এসব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। আপাতত হয়তো তারা মনে করতে পারেন যে তারা সবগুলো নির্বাচনের জয় তাদের পক্ষে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এখানে আসলে উল্টো ঘটনা ঘটছে। এসব নির্বাচনের ফলই তাদের বিপক্ষে যাচ্ছে, এই নির্বাচনগুলো আওয়ামী লীগের জন্য বুমেরাং হচ্ছে। আওয়ামী লীগের বা সরকারের ওপর মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভগুলো এই ঘটনায় আরও প্রবল হচ্ছে। গণতন্ত্রে বিরোধী মতকে জায়গা দিতে হয়, তাদের ক্ষোভকে প্রকাশের ব্যবস্থাটা খোলা রাখতে হয়। কেননা, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে বিরোধী মতগুলো প্রকাশের সুযোগ না থাকলে জনগণের ক্ষোভ বাড়তে বাড়তে তা একসময় গণবিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে। এই আশঙ্কা কিন্তু আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না।
আমাদের সংবিধানে আমরা বলি যে, রাষ্ট্রের মালিক হচ্ছে জনগণ। কিন্তু সেই জনগণ যখন দেখছে যে তার মতপ্রকাশের সুযোগই নেই, অর্থাৎ সে তার ভোটই দিতে পারছে না, তখন তার আর এই নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর কোনো আস্থা থাকছে না। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং অন্যান্য নির্বাচনে আমরা ভোটারশূন্য ভোটকেন্দ্র দেখলাম। মানুষ কেন ভোট দিতে যাচ্ছে না, মানুষ কেন ভোট দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলল এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
অর্থাৎ জনগণ যে রাষ্ট্রের মালিক এটা তারা আর বিশ্বাস করছে না, জনগণের আস্থায় চিড় ধরে গেছে, জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ যখন দেখছে যে আমি ভোট দিতে গেলেই কী হবে আর না গেলেই কী হবে, তখন যে আর ভোট দিতে যাচ্ছে না। আবার যেখানে যেখানে তারা ভোট দিতে চাইল সেখানে তারা ভোট দিতে পারল না। যেমন ডাকসুতে ছাত্রছাত্রীরা ভোট দিতে চেয়েছে, কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থাটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, ভোটারের কৃত্রিম লাইন তৈরি করে তাদের ভোট দিতে দেওয়া হলো না। ফলাফল হিসেবে শেষপর্যন্ত ভোটই বয়কটের মুখে পড়ল। এটা খুবই হতাশার।
সংসদ নির্বাচনের আগে যেমন সারা দেশে বিরোধী পক্ষগুলোর ওপর হামলা-মামলা করা হয়েছে, নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো হয়েছে ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরেও কিন্তু আমরা তার কিছু নমুনা দেখলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ভিন্নমতগুলোকে সামনে আসতে না দেওয়ার এই চর্চা ন্যক্কারজনক। নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছে এমন কয়েকজনকে ভোটের দিনেও হামলা করা হলো, লিটন নন্দী, নুরুল হক নূরকে মারধর করা হয়েছে।
অথচ অনেকেই আশা করেছিলেন ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পথ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা ঘটল। ডাকসুর এমন একটা অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন খুবই ভুল বার্তা দিল, খুবই হতাশার দৃষ্টান্ত তৈরি করল। ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলে রাজনীতিতে একটা নতুন বাতাস আসতে পারত। তরুণ নেতৃত্ব তৈরির একটা পথ তৈরি হতো। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজগুলোতে নির্বাচন হতে থাকলে অন্তত একটা পর্যায়ে গণতন্ত্রের চর্চাটা হতো। ছাত্ররাজনীতিরও হয়তো বাকবদলের একটা সুযোগ আসতে পারত। কিন্তু এখন যা হলো তাতে মাস্তানতন্ত্রই আবার জয়ী হলো এবং দেশে মাস্তানতন্ত্র বিস্তারেরই উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা হলো।
সবশেষে বিশেষভাবে যে কথাটা বলা প্রয়োজন সেটা হলো এই ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করলেন। নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষ আগেই আস্থা হারিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনকে মানুষ আর বিশ্বাস করতে পারছিল না। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও সেই কাতারে গিয়ে দাঁড়াল। নির্বাচন কমিশনারদের মানুষ যে দৃষ্টিতে দেখে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও একইভাবে দেখবে। সমাজে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যে মর্যাদা অবশিষ্ট ছিল, এই ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেটুকুও প্রশ্নবিদ্ধ হলো।
এখানে যে প্রশাসন নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন তারাও একপক্ষীয়, তারাও ক্ষমতাসীনদের আনুগত্যের রাজনীতিই করেন। যেসব শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চালান তাদের ওপরও কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকদের কোনো আস্থা নেই। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কর্র্তৃপক্ষও কিন্তু একই রকম প্রশ্নবিদ্ধ। উপাচার্য, হল প্রভোস্ট বা হাউস টিউটর থেকে শুরু করে সবাই ক্ষমতাসীনদের আনুগত্যের রাজনীতি করার মধ্য দিয়েই ওই পদগুলোতে গেছেন। ফলে এমন একটা পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসনের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় সেটাই প্রমাণিত হলো।
লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ও কলামনিস্ট
