দুঃসাহসিক সাংবাদিকতার অন্য নাম মেরি কোলভিন। যুদ্ধের প্রকৃত রূপ মানুষের সামনে তুলে ধরতে তিনি চষে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। যেখানেই যুদ্ধ সেখানেই মেরি কোলভিন। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে প্রথমে হারিয়েছিলেন একটি চোখ। তারপর সিরিয়ার রণাঙ্গনে উৎসর্গ করলেন নিজের জীবনটিকেই। লেবানন, ফিলিস্তিন, চেচনিয়া, কসোভো, সিয়েরা লিওন, জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কা, পূর্ব তিমুর, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া থেকে শুরু করে সমসাময়িক সব যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই সরেজমিনে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন তিনি। যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকার এই যুদ্ধ সাংবাদিককে নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি
ব্যক্তিগত জীবন
কোলভিনের জন্ম আমেরিকায়। ১৯৫৬ সালে, নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সে। সাংবাদিকতায় তার ক্যারিয়ার শুরু হয় ফ্রান্সের প্যারিসে ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালে (ইউপিআই)। পরে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং ১৯৮৫ সালে ‘দ্য সানডে টাইমস’ পত্রিকায় ফরেন অ্যাফেয়ার্স করেসপন্ডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। এই পত্রিকায় নিজের নামটিকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করতে খুব বেশি সময় নেননি তিনি। ১৯৮৬ সালেই তিনি লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির একটি সাক্ষাৎকার নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই সাক্ষাৎকারের কয়েকদিন আগেই গাদ্দাফির বাসভবনে বোমা হামলা করেছিল আমেরিকা। এই হামলায় গাদ্দাফির শিশুকন্যা নিহত হয়। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে গাদ্দাফি কোলভিনের পায়ের সবুজ জুতোর প্রশংসা করেছিলেন এবং তার শরীর থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। কোলভিন গাদ্দাফির অনুরোধ নাকচ করে দেন। সে বছরই ইরাকে একটি অ্যাসাইনমেন্টে গিয়ে দ্য টাইমস পত্রিকার কূটনৈতিক প্রতিবেদক প্যাট্রিক বিশপের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরে তারা বিয়ে করেন।
তবে, কোলভিনের জীবনে দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে আসেন বলিভিয়ান বংশোদ্ভূত সাংবাদিক জুয়ান কার্লোস গুমোসিও। বলা যায়, তার সঙ্গে আত্মিক বাঁধনে বাঁধা পড়েছিলেন কোলভিন। ১৯৯৬ সালে তারা বিয়ে করেন। কিন্তু দাম্পত্যজীবন খুব বেশি সুখের হয়নি তাদের। ২০০২ সালে গুমোসিও আত্মহত্যা করেন।
সাংবাদিক জীবনের প্রথম অধ্যায়
যুদ্ধক্ষেত্রে সাবলীল পদচারণা ছিল কোলভিনের। পৃথিবীর যে প্রান্তেই যুদ্ধ হোক তিনি এমনভাবে সেই যুদ্ধের ময়দানে হাজির হতেন, যেন তার জীবন বলে কিছু নেই। তার যুদ্ধবিষয়ক প্রতিবেদনগুলোর চেয়েও ভয়ংকর ছিল তার অভিযান। ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামের নেতা ইয়াসির আরাফাতের মোট ২৪টি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন মেরি।
একটা ঘটনা না বললেই নয়। ১৯৯৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছিল পূর্ব তিমুর। সেই যুদ্ধক্ষেত্রে জাতিসংঘের একটি দলের সঙ্গে আস্তানা গেড়েছিলেন তিনি। সেখানে ছিল প্রায় ১৫০০ শরণার্থীর একটি ক্যাম্প। তাদের বেশিরভাগই নারী এবং শিশু। এ অবস্থায় ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী ওই বিল্ডিংটি উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল। ফলে, সেখানে অবস্থান করা সাংবাদিক এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তারা দ্রুত শহর ছাড়েন। কিন্তু কোলভিন শরণার্থীদের ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন। সেনাবাহিনীর হুমকির মুখেই টানা চারদিন তিনি শরণার্থীদের সঙ্গে অবস্থান করেন। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায় তার এই অবস্থানের কথা। ফলে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি হয় ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর ওপর। শেষ পর্যন্ত কোলভিনের একগুঁয়েমিতে বেঁচে যায় ওই ১৫০০ শরণার্থী।
যুদ্ধক্ষেত্রের মতো কঠিনতম এলাকায় অবস্থান করে সরেজমিনে প্রতিবেদন তৈরিকে তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতেন। তার মতে, যুদ্ধের ময়দানে একটা পক্ষ থাকে যারা এটার শিকার। তাদের কথা কেউ শুনতে পায় না। এমন অসহায়ের পাশে থাকাকে নৈতিক দায়িত্ব মনে করতেন কোলভিন। তিনি বলেন, ‘অসহায় মানুষকে পাশ কাটিয়ে আসা কাপুরুষতা। যদি কোনো সাংবাদিকের সুযোগ থাকে তাদের জন্য কিছু করার, তবে তার তা-ই করা উচিত।
চোখ হারানোর গল্প
২০০১ সাল। চলছে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী ও স্বাধীনতাকামী তামিল টাইগাররা একে অপরের প্রতিপক্ষ। এই যুদ্ধ কভার করার জন্য দায়িত্ব পড়ে কোলভিনের ওপর। তিনি তামিল নিয়ন্ত্রিত একটি জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় থেকে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠাচ্ছিলেন। তার প্রতিবেদন থেকেই বিশ^ জানতে পারে যুদ্ধের কবলে পড়ে কীভাবে দিনের পর দিন ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করছিল সাধারণ মানুষ। ২০০১ সালে ১৬ এপ্রিল কোলভিনকে তার সাহসিকতার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল। সেদিন রাতে তিনি একটি কাজুবাদামের ক্ষেতে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু হুট করেই চারপাশ থেকে তীব্র আলো এসে পড়ে। এই আলোটি ছিল তামিল গেরিলাদের খুঁজে বেড়ানো শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর। তার দিকে এগিয়ে আসছিল একজন টহল সেনা।
এ অবস্থায় আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে দু’হাত ওপরে তুলে কোলভিন বলে উঠলেন, ‘সাংবাদিক! আমেরিকান!’ তিনি ভেবেছিলেন তার পরিচয় পেলে হয়তো সেনারা তাকে নিরাপদে সরে যেতে দেবে। কিন্তু ঘটল তার উল্টোটা। তার পাশেই একটি গ্রেনেড ছুড়ে মারে সেনারা। এই বিস্ফোরণে মারাত্মক আহত হন কোলভিন। এক সৈনিক তার শরীরে কোনো অস্ত্র লুকানো আছে কি-না দেখছিল আর বলছিল, ‘তুমি আমাদের মারতে এসেছো, হাহ্?’ পরে তাকে একটি ট্রাকের পেছনে ছুড়ে মারল। সে যাত্রায় কোলভিন বেঁচে গিয়েছিলেন, কিন্তু হারাতে হয় তার বাম চোখটি। ফলে সেই সময়ের পর থেকে কোলভিন সবসময় একটি চক্ষুবন্ধনী ব্যবহার করতেন। এই ঘটনাটি শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর জন্য ছিল লজ্জাজনক। কিন্তু চোখ হারানোর খবরে তামিল টাইগারদের কাছে তিনি নায়কে পরিণত হয়েছিলেন। অসংখ্য তামিল তাদের একটি চোখ কোলভিনকে দিতে চেয়েছিলেন।
সাংবাদিকতা তার অস্থিমজ্জায় এমনভাবে ঢুকেছিল যে, এক চোখ হারিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও তিনি শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন লিখে গেছেন। তাকে দেখতে এলে বোনকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘যখন একটা শিশু বারুদের আগুনে পুড়ে মরে, তখন তার কেমন কষ্ট হয় আমি জেনে গেছি। এটা আমি আর ভাবতে পারছি না।’
ফাইনাল অ্যাসাইনমেন্ট
সুস্থ হওয়ার পর কোলভিন যখন আবারও যুদ্ধের ময়দানে ফিরে গেলেন, তখন অনেকেই সমালোচনা করে বলেছিলেন, কিছু পত্রিকা পুরস্কারজয়ী প্রতিবেদনের আশায় তাদের প্রতিনিধিদের জীবন শঙ্কায় ফেলে দিচ্ছে।’ কিন্তু এ বিষয়ে কোলভিনের সহকারী জেন ওয়েলেসলি বলেছিলেন, ‘মেরি যা করতে ভালোবাসে তা যদি সানডে টাইমস তাকে করতে না দিত, তবে সে ধ্বংস হয়ে যেত।’
মধ্যপ্রাচ্যে যখন আরব বসন্তের দামামা বেজে উঠল, কোলভিন সেখানেই যাওয়ার মনস্থির করলেন এবং এমন সব প্রতিবেদন তৈরি করতে শুরু করলেন, যা অন্যদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে, এই বীরত্ব তার শেষ পরিণতি ডেকে এনেছিল।
২০১২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আসাদপন্থি সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সিরিয়ার হোমস শহর থেকে তিনি তার সর্বশেষ প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ফটোগ্রাফার পল কনরয়। ফটোসাংবাদিকতায় আসার আগে কনরয় ছিলেন ব্রিটিশ রয়্যাল আর্টিলারির যোদ্ধা। কনরয়কে সঙ্গে নিয়ে কোলভিন সেদিন একটি ড্রেনের ভেতরে হামাগুড়ি দিয়ে হোমস শহরের ভেতরে ঢুকে পড়েন। কোলভিনের সাহায্যেই সেদিন বিবিসি ও সিএনএন শহরের ভেতরের ভয়ানক কিছু ভিডিও ফুটেজ এবং খবর প্রকাশ করেছিল। যুদ্ধের তীব্রতায় কনরয় হোমস ছেড়ে পালাতে চাইলে কোলভিন তাকে বলেছিলেন, ‘এটা তোমার ব্যাপার, আমি এখানেই থাকব। কারণ আমি যুদ্ধেরই প্রতিবেদক।’
বিবিসিকে কোলভিন বোমার আঘাতে একটি দুই বছরের শিশুর মরে যাওয়ার খবর জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, স্থানীয় একটি হাসপাতালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কীভাবে শিশুটির পেট ওঠানামা করছিল। আর তার বাবা আহাজারি করছিলেন।
মেরি কোলভিনের সর্বশেষ প্রতিবেদনটি ছিল সিএনএন-এর সঞ্চালক অ্যান্ডারসন কোপারকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকার। এই সাক্ষাৎকারটি তখন দেখছিলেন কোলভিনের নিজ পত্রিকার সম্পাদক সিন রায়ান। তিনি দেখছিলেন, কী ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে কোলভিন তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি কোলভিনকে জরুরি বার্তা পাঠালেন, ‘আজ রাতেই এই নরক থেকে ফিরে আসো।’ কিন্তু কোলভিন আর কখনোই ফিরে আসেননি।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের অনুগত সৈনিকরা হন্যে হয়ে কোলভিনকে খুঁজছিল। কারণ তাদের নাকের ডগার ওপর দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বর্বরতার চিত্র কোলভিন পশ্চিমা গণমাধ্যমে পাচার করছিলেন। যে কোনো উপায়েই হোক সৈন্যরা কোলভিনকে হত্যা করতে চাইছিল। শেষ পর্যন্ত তারা সফলও হয়।
২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সিরিয়ান সরকারি বাহিনীর নির্মম অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যান কোলভিন। একটি ভিডিওতে দেখানো হয়, একজন চিকিৎসক সার্জনের গাউন পরে দুটি ‘বডি ব্যাগৎ-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তিনি দুটি ব্যাগই খোলেন। শুধু দুজন সাংবাদিকের মুখ দেখানো হয় ক্যামেরায়। তাদের নাম বডি ব্যাগের ওপর লেখা রয়েছে। দুটি নামের একটি ছিল কোলভিন অন্যটি ফরাসি সাংবাদিক রেমি ওচলিকের। অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন সেদিন কনরয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় লাশ সংরক্ষণের উপায় ছিল না বলে দুটি লাশই হোমস শহরে কবর দেওয়া হয়।
