ডাকসুর গৌরবে কালির ছোপ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৯, ০৪:২২ এএম

আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, ভোটগ্রহণে ব্যাপক অনিয়ম ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ, পুনঃভোটের দাবি এবং ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি সব প্যানেলের বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন। বর্জনকারীরা গতকাল সোমবার দুপুরে ভোট বাতিল করে নতুন ভোট দেওয়ার দাবিতে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন সম্পন্ন ও ফল ঘোষণা শুরু করে প্রশাসন।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১৪ হলের ফল জানা গেছে। এর মধ্যে ছয়টি পদে স্বতন্ত্ররা ভিপি-জিএস হয়েছেন। বাকি সবই ছাত্রলীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।

নির্বাচনে ভোট বর্জনকারী ছয়টি প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিকেল ৫টার দিকে ভিসি কার্যালয় থেকে অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। তবে তারা আজ ক্লাস বর্জন করে রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। এতে সবাইকে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়ে তারা বলেছেন, ‘ডাকসু এই নির্বাচনের ফল প্রকাশ করলে এবং এই নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় তফসিল না দিলে ভিসির পদত্যাগ চাওয়া হবে।’

তবে ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ বাতিল করার মতো কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা বিক্ষোভ করতেই পারে, কিন্তু আমি যতটা দেখেছি, এরকম দাবি করার মতো অবস্থা মনে হয়নি। তারা কোনো প্রমাণ দিলে তদন্ত করে দেখব, উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে কিছু অনিয়ম হয়েছিল, তবে সেখানে নতুন ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার দিয়ে আবার ভোটগ্রহণ শুরু করে দেওয়া হয়। অধ্যাপক সামাদ বলেন, রোকেয়া হলে বহিরাগত কিছু লোক ব্যালট পেপারের ট্রাংক ভেঙে ল-ভ- অবস্থা তৈরি করে। এজন্য সময়মতো ভোট শুরু হতে পারেনি। এছাড়া বাকি ১৬টি হলের সবকটিতে আমি নিজে গিয়েছি। কোনো অনিয়ম চোখে পড়েনি।

বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকদের একটি পর্যবেক্ষক দল গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, একটি বড় অসংগতি মনে হয়েছে, ব্যালট পেপারে কোনো সিরিয়াল নম্বর ছিল না। ৪৩ হাজার ভোটারের একটি নির্বাচনের ব্যালট পেপারে সিরিয়াল নম্বর না থাকাটা আমাদের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। কারণ এতে নির্বাচনের ফলাফলে গুরুতর অনিয়ম ঘটানো অনেক সহজ। কোন হলে কোন সিরিয়াল গেল, তাও ট্র্যাক রাখার উপায় থাকার কথা নয়।

তারা বলেন, বহুল প্রতীক্ষিত ডাকসু নির্বাচনের এই অনিয়মের ঘটনাগুলো আমাদের খুবই লজ্জিত করেছে। এ ঘটনা জনগণের কাছে পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, যা সার্বিকভাবে অ্যাকাডেমিক পরিবেশ বিঘ্নিত করবে। এত বছর পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচন সফলভাবে না করতে পারার ব্যর্থতার দায়ভার প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষক সবার এবং এই ব্যর্থতা পুরো শিক্ষক সম্প্রদায়ের নৈতিকতার মানদন্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

গতকাল সরেজমিন ভোটকেন্দ্রগুলো ঘুরে এবং প্রার্থী, সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল ৬টা থেকেই ভোটাররা হল কেন্দ্রে আসতে শুরু করে। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি প্রবেশ পথে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়। ভোটগ্রহণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় ঢাবি ছিল থমথমে, প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগে ভরা।

ভোট শুরুর পর কুয়েত মৈত্রী হলে আগেই সিল দেওয়া ব্যালট পেপারভর্তি ব্যালট বাক্স উদ্ধারের পর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে ওই হলের প্রাধ্যক্ষ শবনম জাহানকে বহিষ্কার করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরপর বেলা ১১টায় আবার ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রোকেয়া হলে সিল না মারা ব্যালট পেপারসহ ব্যালট বাক্স উদ্ধার করা হলে এ নিয়ে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়।

এ সময় ছাত্রলীগ ছাড়া সব ছাত্রসংগঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অভিযোগ করলেও প্রশাসন তা আমলে নেয়নি বলে বিক্ষোভ বাড়তে থাকে। সব হলের সামনেই লম্বা লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা প্রশাসনকে মেরুদন্ডহীন এবং অনিয়মের নির্বাচন করছে বলে গালাগাল দিতে থাকে।

তবে উপাচার্য আখতারুজ্জামান শিক্ষার্থীদের ভোট বর্জনের দাবিকে অযৌক্তিক অভিহিত করে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তবে এও বলেছেন, যারা অনিয়ম করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন তিনি।

সরেজমিন ঘুরে এবং শিক্ষার্থীদর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রলীগ সকালেই তাদের সমর্থিত নেতাকর্মীদের দিয়ে লম্বা লাইন তৈরি করে রেখেছিল। সেই লাইন যেন আর শেষ হয় না। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছিল নানাভাবে।

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে দুপুর দেড়টার দিকে ছাত্রদল এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সম্মিলিতভাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রগতিশীল ছাত্রজোট, ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র মুক্তি জোট, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বতন্ত্র জোট ও স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ। এরপর উপাচার্যের কার্যালয়ের বাইরে বিক্ষোভ সমাবেশ করে তারা আজকের ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য প্যানেলের ডাকসুর সহসভাপতি প্রার্থী লিটন নন্দী তার ওপর হামলার অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করেন এবং ফের ভোটের দাবি জানান। তার অভিযোগ, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে বেলা ১১টার দিকে তিনি ভোট পরিস্থিতি পরিদর্শনে গেলে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী তাকে ধাওয়া দেয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ভিপি পদপ্রার্থী নুরুল হক নুরুর ওপর হামলা চালায় বলেও অভিযোগ করেন লিটন নন্দী। এই হামলা ও অনিয়মের কারণ দেখিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ভোট বর্জন করে। এর আগে স্বতন্ত্র জোট তাদের নিজস্ব ফেইসবুক পেজে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। সেখানে তারা জানান, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে, ছাত্রলীগ এবং প্রশাসনের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে এবং অরণি সেমন্তি খান ও শ্রবণা শফিক দীপ্তিকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করায় স্বতন্ত্র জোট ডাকসু ২০১৯ বর্জন করছে।

কুয়েত মৈত্রী হলের বিষয় খতিয়ে দেখতে অধ্যাপক সামাদকে প্রধান করে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ডাকসুর সাতটি প্যানেল নির্বাচনে অনিয়মে অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানের দাবি ভোট সুষ্ঠু ও আনন্দমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের যে শৃঙ্খলাবোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এগুলো দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত