ডাকসুর তিন সাবেক ভিপি ও জিএস

‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট দিতে না পারা লজ্জার’

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৯, ০৪:৫৪ এএম

১৯৮৯ সালে ডাকসুর জিএস ছিলেন বর্তমানে বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক আহমেদ। ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে পরপর দুবার জিএস ও ১৯৮২ সালে ভিপি ছিলেন বর্তমানে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আখতারুজ্জামান। আর সর্বশেষ ১৯৯০ সালে ডাকসুর জিএস ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন। এই তিন সাবেক নেতার দুজন গতকালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ডাকসুর ঐতিহ্য ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নষ্ট হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন। তারা ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে পুনরায় নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যজন ‘মোটা দাগে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে’ মন্তব্য করলেও ‘অনিয়মগুলোর তদন্ত হওয়া উচিত’ বলে মনে করেন।

এই বিতর্কের সমাধান করতে হবে : ডা. মুশতাক আহমেদ

আমি হতাশ। আমাদের আশা ছিল ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী মিলে একটি শান্তিপূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন করবে। এখানে শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারবে না, সিল মারা ব্যালট পাওয়া যাবে, হল দখলে রেখে ভোট হবে, ডাকসুর দীর্র্ঘ ইতিহাসে এমন ঘটনা এর আগে কখনোই হয়নি। কৃত্রিম লাইন তৈরি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট দিতে দেয়নি। এটা লজ্জার বিষয়।

জাতীয় নির্বাচনের মতো ডাকসু নির্বাচনও যদি বিতর্কিত হয়, ভোট কারচুপি হয়, আগে থেকেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরে রাখা হয়, তা হলে জাতি কোথায় যাবে?

এই লজ্জা থেকে রক্ষা পেতে হলে এই নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে। তার আগে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। কীভাবে অনিয়মগুলো হলো, কারা করল, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ ডাকসুর মতো ঐতিহ্যবাহী গৌরবোজ্জ্বল নির্বাচনে এমন করতে না পারে। এবারের ডাকসুর বিতর্কের সঙ্গে জড়িতদের নতুন নির্বাচনে রাখা যাবে না।

ডাকসুর দীর্ঘ ইতিহাসে এবারের মতো ঘটনা আগে ঘটেনি। আমি যেবার ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হই, ওই নির্বাচনে ন্যূনতম কোনো অনিয়ম হয়নি। অভিযোগও ওঠেনি। শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ফল প্রকাশের পর অবশ্য আমাদের ছাত্রীদের বিজয় মিছিলে প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন ছাত্রদল হামলা করেছিল। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।

এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কেবল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরাই বিতর্কিত হলেন না; দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার পথও প্রশ্নবিদ্ধ হলো। অবশ্যই বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এ বিতর্কের সমাধান করতে হবে।

ছোটখাটো অভিযোগের কারণ বের করতে হবে : আখতারুজ্জামান

এবারের ডাকসু নির্বাচন ভালো হয়েছে। ১৮টা হলের ৪৩ হাজারের বেশি ভোটার। প্রত্যেক হলে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়েছেন। ব্যবস্থাপনাও ভালো ছিল। এতগুলো হলের মধ্যে মাত্র দুইটা হলে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তাও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ সেখানে পুনরায় ভোটগ্রহণ করেছে। ফলে আমি বলব নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।

ডাকসুর মতো একটি স্পর্শকাতর নির্বাচনে কোনো হানাহানি হয়নি। রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি। কোনো গন্ডগোল হয়নি। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। তাই বলব মোটা দাগে ভালো ভোট হয়েছে।

দীর্ঘদিন ডাকসু নির্বাচন হয়নি। এবার সরকার চেয়েছে বলেই নির্বাচন হলো। নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা ছিল। সবার দাবি ছিল নির্বাচন হোক। তারপরও আমি বলব এতগুলো হলের মধ্যে মাত্র দুইটা হলে কেন অনিয়মের অভিযোগ উঠল, সেটা দেখতে হবে। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, কুয়েত মৈত্রী ও রোকেয়া হলে যে ব্যালট পাওয়া গেল, সেগুলোর মধ্যে কোনো মিল ছিল না। স্বাক্ষরও এক ছিল না। সুতরাং কারা কেন এমন অভিযোগ করল, সেটার তদন্ত দাবি করছি। ছোটখাটো যে বিতর্ক, সেটার কারণ বের করতে হবে।

ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রলীগ কিন্তু কোনো প্রতিরোধ করেনি। শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনী মাঠে ছিল। শেষ পর্যন্ত ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছে। আমি বলব এটা ছাত্ররাজনীতির বড় গুণ। ছাত্রলীগ সে গুণ প্রকাশ করেছে। মোট কথা নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।

সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে : খায়রুল কবির খোকন

নির্বাচন হয়নি। জাতীয় নির্বাচনের চেয়েও আরও এক ধাপ নিচে নেমে গেছে ডাকসু নির্বাচন। আমাদের প্রত্যাশার বাইরে। জাতীয় নির্বাচনের মতো ডাকসুতেও ভোট ডাকাতি হলো। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য। ডাকসু নির্বাচনকে কলঙ্কিত করার জন্য সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে। এর পরিণতি ভালো হবে না।

আমরা আশা করেছিলাম, অন্তত জাতীয় নির্বাচন থেকে সরকার শিক্ষা নেবে। ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। ২৮ বছর পর নির্বাচন। সরকার এখানে হাত দেবে না। কিন্তু যা হলো তা জাতির প্রত্যাশার বাইরে। সরকার ডাকসুকেও জোর করে দখল করে নিল।

নির্বাচন পরিচালনায় সরকারদলীয় শিক্ষকদের নেওয়া হয়েছে। এসব শিক্ষক দলীয় মানসিকতা থেকে কাজ করেছে। তারা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ ছিল না। ফলে একচেটিয়াভাবে ভোট কারচুপি করেছে। এটি সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। জাতির এমন প্রত্যাশা কাম্য ছিল না।

ডাকসু নির্বাচনে অনিয়মের আশঙ্কা প্রথম থেকে দেখা দিয়েছিল। সব ছাত্রছাত্রীর দাবিদাওয়াকে উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের দিকে যাচ্ছিল। ছাত্রলীগ ছাড়া আর সব সংগঠনের দাবি ছিল ভোটের সময় বাড়ানো, হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র করা, স্টিলের বদলে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স রাখা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তা কিছুই করেনি। ডাকসু নির্বাচনকে যে কলঙ্কিত করবে, তাদের আচার-আচরণে তা প্রকাশ পেয়েছিল।

আমরা ভেবেছিলাম এত বছর পর নির্বাচন হচ্ছে, সরকার এখানে হস্তক্ষেপ করবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ওপরে ভরসা রাখতে চেয়েছিলাম। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নয়। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী তারা স্বাধীন। তারা কারও নির্দেশ মানতে বাধ্য নয়। কিন্তু তা হলো না। বিশ^বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন ও ছাত্রলীগ মিলে সব ইতিহাস কলঙ্কিত করল।

যেভাবে জোর করে ছাত্রলীগকে বিজয়ী করা হলো, তাতে ডাকসুর ভাবমূর্তি কিছুই রইল না। ঐতিহ্য থাকল না। ভবিষ্যতে আর ডাকসু নির্বাচন হয় কি না সন্দেহ রয়েছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মতো জায়গায় যদি এমন হয়, তা হলে মানুষ কোথায় যাবে। ডাকসুর প্রতি মানুষের আর কোনো আশা রইল না। এত বছর ধরে ডাকসু যে ইতিহাস-ঐতিহ্য বহন করে আসছিল, এই সরকার তা নষ্ট করে দিল। একদিন সরকারকে এর জন্য খেসারত দিতে হবে। ছাত্রসমাজ এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই রুখে দাঁড়াবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত