একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগাতে পারলেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচনের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন উক্তি। এর মধ্যে রয়েছে, ‘ইসি, ভিসি, ছি ছি!’ ‘নিশিথ সূর্যের দেশ নরওয়ে, নিশিথ ভোটের দেশÑবাংলাদেশ!’ ‘ফুটবলে কে সেরা রোনালদো নাকি মেসি?/ভোট ডাকাতিতে কে সেরা ইসি নাকি ভিসি?’ ‘১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যুতে আমরা গভীর ভাবে শোকাহত!’ উল্লিখিত মন্তব্যগুলো থেকেই আঁচ করা যায় ডাকসু নির্বাচন কেমন হয়েছে এবং এই নির্বাচন নিয়ে সাধারণের প্রতিক্রিয়া কী।
২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচন যতটা আশান্বিত করেছিল, ভোটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ‘কলঙ্কিত’ করেছে। এমন বেপরোয়া অনিয়মের নির্বাচনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সচেতন মহলে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। অনেকে প্রশ্ন করছেন, সবই যদি ‘দখল’ করার মানসিকতা থাকে, তাহলে আর এমন ভোটের প্রহসনের মানে কী? শাসকরা কি তবে সকলের ক্ষোভ-বিরক্তি-ঘৃণা-আর অভিশাপ নিয়ে দেশশাসন করতে চান? কিন্তু এভাবে কতদিন?
১৯৯০ সালে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটে স্বৈরশাসক এরশাদের। এরপর দেশে নতুন করে চালু হয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন। ডাকসুর শেষ নির্বাচন হয় স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে, ১৯৯০ সালে। এরপর কয়েক মেয়াদে ‘গণতন্ত্রের দাবিদার’ দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন হয়নি। এই ‘গণতন্ত্রের দাবিদার’ সরকাররা ডাকসুকে সচল করতে পারেননি। দীর্ঘ ২৮ বছর প্রতীক্ষার পর যে নির্বাচন হলো, তাতে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক ‘কলঙ্কিত অধ্যায়’ রচনা করলেন!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। কিন্তু ভোট গ্রহণের শুরুতেই কারচুপি-অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রথমেই অঘটন ঘটে কুয়েত মৈত্রী হলে। সেখানে একটি ব্যালট বাক্সে সিল মারা ব্যালট পেপার পাওয়া যায়। অভিযোগ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ হলের প্রাধ্যক্ষ শবনম জাহানকে অপসারণ করে নতুন প্রাধ্যক্ষ নিয়োগ করে মাহবুবা নাসরিনকে। মৈত্রী হলে ভোটগ্রহণ শুরু হয় বেলা ১১টা ১০ মিনিটে।
এদিকে ব্যালট বাক্স নিয়ে গোল বাধে রোকেয়া হলেও। এই হলের নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত ৯টি ব্যালট বাক্সের মধ্যে সকালে ৬টি খোলা হলেও পাশের কক্ষে রাখা হয় বাকি তিনটি। হলের ছাত্রীরা এটি জানতে পেরে ব্যালট বাক্স ভেঙে ফেলেন এবং তিনটি বাক্সে প্রচুর সংখ্যক ব্যালট পেপার পাওয়া যায়, যদিও সেগুলো সিল মারা ছিল না। এরপর কর্র্তৃপক্ষ বেলা ৩টা থেকে রোকেয়া হলে ফের ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে বেলা ১টায় ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য প্রায় সবাই ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। তারও আগে ছাত্রলীগের কর্মীরা রোকেয়া হলে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ভিপি প্রার্থী নুরুল হককে এবং প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দীকে মারধর করে। কোনো কোনো সাংবাদিককেও মারধরের অভিযোগ পাওয়া যায়। এই নির্বাচন নিয়ে প্রধান ছাত্র সংগঠনগুলো নানা অভিযোগ আনে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে জেতাতে নির্বাচনকে যত ভাবে প্রভাবিত করা যায়, তার সব কিছুই প্রায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে। শিক্ষার্থীদের ভোট দিতে বাধা দেওয়া, হুমকি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, মারধর ইত্যাদির পাশাপাশি কৃত্রিমভাবে লাইন তৈরি করে রাখা হয়। শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছেন। কিন্তু অনেকেই ভোট দিতে পারেননি। সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ডাকসু নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শোচনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের দুর্বলতা যদি না-ই থাকবে তাহলে ভোট শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট ভর্তি বাক্স উদ্ধার হয় কীভাবে?
ছাত্রলীগ ছাড়া আর সব সংগঠনের দাবি ছিল ভোটের সময় বর্ধিত করা, হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র করা, স্টিলের বদলে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স রাখা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কোনো দাবিই আমলে নেয়নি। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ডাকসুতেও তার পুনরাবৃত্তি হবে। আবার অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ওপর ভরসা রাখতে চেয়েছিলেন। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়
কর্তৃপক্ষ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নয়। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী তারা স্বাধীন। তারা কারও নির্দেশ মানতে বাধ্য নন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের মর্যাদা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা আদর্শ শিক্ষক কিংবা নিরপেক্ষ প্রশাসক নন, বরং শাসক দলের তল্পিবাহক হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন। তা নাহলে এমন অনিয়ম ও কারচুপির পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়েছে’ বলে ‘সন্তোষ প্রকাশ’ করেন কীভাবে?
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীনদের ভূমিকাও স্বচ্ছ নয়। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এমনিতেই মানুষের মন বিষিয়ে আছে, এ পরিস্থিতিতে তাদের আত্মশুদ্ধির একটা টেস্ট কেস হতে পারত ডাকসু নির্বাচন। তারা আগেভাগেই এখানে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকনির্দেশনা দিতে পারতেন। বলতে পারতেন, নির্বাচনে যে-ই জিতুক, ডাকসু নির্বাচন যেন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়। কিন্তু তারা সে পথে এগোয়নি। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন প্রতিটি মানুষের এক প্রশ্ন : ডাকসুতে হারলে কি সরকারের গদি চলে যেত? এই নির্বাচনটা শুধু জাতির ভবিষ্যতের স্বার্থেই নয়, নিজেদের কলঙ্কমোচনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবেও সুষ্ঠু করা উচিত ছিল। যেখানে আইয়ুব-জিয়া-এরশাদের মতো সামরিক সরকারও ডাকসু নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি, সেখানে আওয়ামী লীগ এটা কেন করল? কী লাভ হলো এতে?
ভোটের অধিকার হলো প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা একটি মৌলিক অধিকার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই অধিকার হলো এক অমূল্য সম্পদ। আমাদের দেশের মানুষকে এই অধিকার অর্জন করতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। সেই ভোটাধিকার হরণের খেলা খেলে অনন্তকাল নিশ্চিন্তে ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখাটা কিন্তু একটা মস্ত ভুল। নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা এক বিরাট জটিলতায় ভোগেন। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে হেরে যাওয়ার ভয় থাকে। আর হারলে হামলা, মামলা, প্রতিপক্ষের প্যাঁদানিসহ নানা রকম ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। ফলে তাদের জেতার জন্য নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতে হয়। ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে নির্বাচনের নামে ‘প্রহসনের’ পথ গ্রহণই ক্ষমতা ধরে রাখার একমাত্র পথ হয়ে ওঠে।
মানুষ ভূতকে ভয় পেলে তা রোমহর্ষক কাহিনী হতে পারে। কিন্তু ভূত ভূতের ভয় পেলে তা প্রহসন। আমাদের দেশের গণতন্ত্রে তেমন তামাশা নিয়ত ঘটছে। যাদের নাগরিকের ভোটে জিতে ক্ষমতা দখল করার কথা, তারা নিজেরাই নির্বাচন এলে ভূত দেখছে। কী করে ভোট এড়ানো যায়, নানা ফন্দি করে কীভাবে ভোট ছাড়াই জেতা যায়Ñ তারই বিবিধ উপায় খুঁজছে। সেই উপায়ের প্রয়োগও করছে। কিন্তু এটা আগুন নিয়ে খেলার শামিল। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে কিন্তু মানুষের একমাত্র ধন হলো তার ভোট। ধারাবাহিকভাবে সেটা কেড়ে নিলে সে অনন্তকাল মুখ বুজে নাও সইতে পারে!
পুনশ্চঃ অনিয়মের নির্বাচনেও ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদের যে ফল এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, পাঁচটি ছাত্রী হলের চারটিতেই স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। পাশাপাশি তিনটি হলের জিএস পদেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। এ ছাড়া ডাকসুর ভিপি পদে বিজয়ী হয়েছেন কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর। স্বতন্ত্র কিংবা কোটা আন্দোলনের প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়াটা ছাত্র সংগঠনগুলোর জন্য একটি বিশেষ সতর্কবার্তা। কোনো দলের ব্যানার ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী বা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা কেন এত ভোট পেলেনÑ সেটা ছাত্র সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণ করে দেখার সময় এসেছে। ছাত্র সংগঠনগুলো যে গণবিচ্ছিন্ন বা শিক্ষার্থীবিচ্ছিন্ন রাজনীতি করেন, তা কি তারা উপলব্ধি করতে পারছেন? সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগ-অনুভূতি, দাবি-দাওয়ার বাইরে গিয়ে রাজনীতি করলে যে এখন আর কারও ভাত নেইÑ সেটা কি তথাকথিত ছাত্রনেতারা অনুধাবন করবেন? চেনা বুলি আর অভ্যস্ত সেøাগানে রাজনীতি করার দিন শেষ হয়ে এসেছে। এখন ছাত্ররাজনীতি করতে হলে শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে। শিক্ষার্থীদের দাবি ও চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। এবারের প্রশ্নবিদ্ধ ডাকসু নির্বাচনের ফল কিন্তু ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছে সেই প্রশ্নও রেখেছে। ছাত্র সংগঠনগুলো কি সেই আত্মোপলব্ধি বা আত্মবিশ্লেষণ করবে? নাকি প্রহসনের নির্বাচনের দায় ছাত্রলীগ আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাঁধে অর্পণ করে ‘যেমন আছি বেশ আছি’ বলে দিনাতিপাত করবে? ‘মানি না মানব না’ সেøাগানের পাশাপাশি এ বিষয়টাও একটু ভাবা দরকার।
প্রচলিত রাজনীতির প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঘৃণা এবং প্রত্যাখ্যানের নমুনা প্রদর্শিত হয়েছে ডাকসুর সর্বোচ্চ পদে নুরের বিজয়ে। এ অবস্থা এবং এ মনোভাব গোটা দেশেরও। রাজনীতিবিদদের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আছে এ ঘটনায়। কোলাহলের বাইরে এসে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। মানুষ কেন রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠছেন? এই ‘বিরাজনীতিকরণ’ প্রক্রিয়া কিন্তু দেশের জন্য, রাজনীতির জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়!
