এক সেশনেই বাংলাদেশের আত্মসমর্পণ

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৯, ০২:৪৩ এএম

দেশের মাটিতে আজকাল বেশ দুর্ধর্ষ। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সেই বাংলাদেশ দলকে চেনাই যায় না। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম দুদিন বৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিল। ১৭ বছর পর ওয়েলিংটনেও তাই। সেবারের মতো এবারও বাংলাদেশকে এইটুকু সময়ে পুরোপুরি অসহায় বানিয়ে নিউজিল্যান্ড জিতল ইনিংস ব্যবধানে।

শেষ দিনটা টিকে থাকলে ড্র। ৭টা উইকেট হাতে। ১৪১ রানে পিছিয়ে। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ ৫৬ ওভারেই অল আউট ২০৯ রানে। ইনিংস ও ১২ রানের পরাজয়ে মাথা অবনত। এক সেশনেই সব শেষ। বাঁহাতি শর্ট বল ম্যাস্ট্রো নিল ওয়াগনার ও অসাধারণ ট্রেন্ট বোল্ট গুঁড়িয়ে দিলেন বাংলাদেশকে।

গতকালের এই সেশনটা বাংলাদেশি সমর্থকদের দেখার জন্য ছিল বড় কষ্টকর। যদিও প্রথম দিকটা আশার বীজ বুনতে শুরু করেছিল। বল একটু নরম হতে পিচ থেকে সেভাবে সহায়তা তুলে নেওয়া কঠিন হচ্ছিল বোলারদের জন্য। কিন্তু সেই বলেই  ১০ ওভারের স্পেলে ৩৭ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালালেন বাউন্সারের রাজা ওয়াগনারই।

ওয়াগনারের হাতে যখন বল ওঠে বাংলাদেশ তখন ৪ উইকেটে ১১৬ রানে। দিনের প্রথম ১৪ ওভারে একটি উইকেট হারিয়েছে। ২৮ রান করা সৌম্য সরকার বোল্টের সুইং আর বাউন্সের সঙ্গে বেশ লড়ছিলেন। শেষে আর পারলেন না। চতুর্থ উইকেটে মোহাম্মদ মিঠুনের সঙ্গে তার ৫৭ রানের জুটির শেষ ওখানে।

ভালো শুরু দেখে কারও মনে হচ্ছিল এই দফা একটু একটু করে দিনটাকে খাটো করে আনতে পারবেন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা। ড্র করা কষ্টসাধ্য। অসম্ভব নয় বলেছিলেন তামিম ইকবাল। কিন্তু এই টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ভোগানো শর্ট পিচ বলের নিপুণ কারিগর ওয়াগনার বুঝি যেকোনো পরিস্থিতিতে একই কাজ করে যেতে পারেন। ওভার কিংবা অ্যারাউন্ড দ্য উইকেটে বাঁহাতি-ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের একই হাল হয় তার সামনে। কেউ স্বস্তিতে থাকে না। বলটা বুঝে ওঠারও সময় মেলে না। অনুশীলনে শিখে আসা সব তত্ত্ব ওয়াগনারের বোলিং ব্যাটসম্যানদের ভুলিয়ে দেয়। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল তৈরি করেন। ফিল্ডিং সাজান ভিন্নরকম। কখনো কখনো বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের শরীর বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় কারও মনে পড়ে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের আমলে ইংলিশদের সেই লেগ থিওরি বা বডি লাইন সিরিজের কথা।

না অতটা এখানে ঘটেনি। ভুল যা করার বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা করেছেন। বিশেষ করে ওয়াগনারকে খেলতে গেলেই খেলবেন না ছাড়বেন এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছেন। ফলও হয়েছে নেতিবাচক। বাজে বাজে শটে মৃত্যু। নিজের চতুর্থ স্পেলে সেট ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ মিঠুনকে (৪৭) আউট করেছেন ওয়াগনার। পরিকল্পিত বোলিং ফিল্ডিংয়ে ব্যাটসম্যানকে বাধ্য করেছেন ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিতে। পরের ওভারেই লিটন দাসেরও (১) হন্তারক ওয়াগনার। পুলের ভুলে ফাইন লেগে ক্যাচ। এবার আসে তাইজুল ইসলামের (০) পালা। যেন সাহসই পেলেন না। কাছেই দিলেন ক্যাচ।

আশা জাগানো শুরুর পর হঠাৎ বাংলাদেশ ৭ উইকেট হারানো দল। তখনো ৫১ রানে পিছিয়ে। স্ট্যান্ডবাই ক্যাপ্টেন মাহমুদউল্লাহর (৬৭) সঙ্গে লেজের যে তিনজন তাদের কথা ভাবলে হারটা তখন কয়েক মিনিট সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিছুটা ভাগ্য আর কিছুটা কৌশলে তারপরও অসম লড়াই চলে। একপ্রান্ত আগলে ধরে নেতা লড়েন। মোস্তাফিজুর রহমান তাকে ৩৪ মিনিট সঙ্গ দেন। মজার ব্যাপার, তেড়েফুঁড়ে ২ খানা ছক্কাও হাঁকিয়েছেন ফিজ। সোজা বলে তার উইকেট উপড়ে দিয়েছেন বোল্ট। তখন ওই উইকেট না পড়লে লাঞ্চের আগে সেটি হতো শেষ ওভার।

১৫ মিনিট সময় বাড়ানো হয়। ওয়াগনারের জন্য অবশ্য অতটা সময়ও জরুরি ছিল না। যদিও মাহমুদউল্লাহ এই ভয়ংকরকে ব্যাকফুটে বেশ খেলছিলেন। আবার পাঞ্চ করে ছক্কা হাঁকিয়েছেন পয়েন্টের ওপর দিয়ে। শেষে ওয়াগনারের কাছেই হার মানতে হলো পুলটা ঠিক হলো না বলে। ৬৯ বলে ১২ চার ও ১ ছক্কায় মাহমুদউল্লাহর ৬৭ ইনিংস সর্বোচ্চ। ইনিংসের একমাত্র ফিফটিও বটে। তার বিদায়ের এক বল পরই ওয়াগনার এগারো নম্বর ইবাদত হোসেনকে (০) বোল্ড করে সপ্তমবারের মতো ইনিংসে ৫ উইকেট পূরণ করেন। ৭৩ রানে তার ৯ উইকেটের ম্যাচ ফিগার ক্যারিয়ারসেরা।

নিউজিল্যান্ড অবশ্য এমনই ভেবেছিল। ৭২ ঘণ্টাও লাগেনি ম্যাচটা শেষ করতে। আড়াই দিনের সামান্য কম সময়ে ২০১.৫ ওভারে টেস্ট শেষ। শনিবার ক্রাইস্টচার্চে শেষ ম্যাচ শুরু। তিন টেস্টের প্রথম দুটিতে বাংলাদেশের বাজে হারে ২-০-তে সিরিজটাও জেতা হয়ে গেল কিউইদের। আর গতকাল ওয়েলিংটনে তাদের বিজয় উৎসবের মাঝে কেবল উড়ে বেড়াচ্ছিল বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের অসহায়ত্বের করুণ উপাখ্যান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত