পৃথিবী নামক অতি ক্ষুদ্র গ্রহটিতে যে বিস্ময়করভাবে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছিল, মানুষও সেখানে বায়োলজিক্যালি একটি প্রাণীমাত্র, অন্তত আজ অবধি। আর দশটা প্রাণীর মতোই হাত-পা-চোখ-মুখওয়ালা! শক্তিমত্তার দৌড়েও সে তো আহামরি কিছু নয়! একজন শিম্পাঞ্জি আর একজন মানুষকে পারস্পরিক মল্লযুদ্ধে লাগিয়ে দিলে আজও, নিশ্চিত মানুষই পরাজিত হবে। প্রশ্ন তো তাহলে ওঠেই যে, এরকম অগুরুত্বপূর্ণ অবস্থা থেকে জীবজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছে যাওয়ার রহস্য কী! কী সেই ম্যাজিক যা ইকো-সিস্টেমের মাঝামাঝি অবস্থান থেকে টান মেরে মানুষকে একেবারে শীর্ষে নিয়ে এল? শুধু তাই নয়, ইকোসিস্টেমের বারোটা বাজিয়ে তাকে ধ্বংসের চূড়ান্তে নিয়ে এসেছে, বলা চলে পুরো পৃথিবী টিকবে কি-না তা নির্ভর করছে একদা অখ্যাত এই প্রাণীটির ওপরই! ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক ইয়ুভাল নোয়াহ হারারির মতে, সেই আশ্চর্য ক্ষমতার নাম কল্পনা, কাল্পনিক গল্প বলার ক্ষমতা। যা নেই, তার ওপর আস্থা রাখবার ক্ষমতা। অবজেক্টিভ রিয়েলিটি থেকে ফিকশনাল রিয়েলিটিতে উত্তরণের ক্ষমতা।
হ্যাঁ, বিবর্তনবাদ নানাভাবে লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে মানুষ কীভাবে কীভাবে বদলে গেছে হাজার বছরে! কিন্তু অন্য প্রাণিকুলের চেয়ে ঠিক কী সেই বাড়তি গুণাবলি সে অর্জন করেছিল যা তাকে সুস্পষ্ট ভিন্ন রাস্তায় নিয়ে গেছে! একজন দুর্দান্ত শল্যবিদের মতো মানবজাতির অতীত-বর্তমান চিরে চিরে নতুন নতুন চিন্তার খোরাক আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন হারারি তার সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত ও সমাদৃত বই ‘হোমো স্যাপিয়েন্স : এ ব্রিফ হিস্টরি অব হিউম্যানকাইন্ড’-এ। ২.৫ মিলিয়ন বছর আগে, কোনো প্রত্যুষে আফ্রিকার কোনো এক অঞ্চলে যে মানবজাতির উন্মেষ ঘটেছিল, ৭০ হাজার বছর আগে শুরু হয় তার বুদ্ধিমত্তার বিকাশ! হ্যাঁ, নাম তার ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ (বুদ্ধিমান মানুষ)। তার কাছাকাছি কিছু প্রজাতিÑ হোমো ইরেকটাস, হোমো রুডলফেনসিস, হোমো নিয়ানডারথালিস ইত্যাদি কাছাকাছি মানুষরাও টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, বীরদর্পে টিকে থাকল শুধু স্যাপিয়েন্স! পৃথিবীর প্রায় সব যুদ্ধই সম্পদ দখল নয়, গল্প দখলের যুদ্ধ! এই সুদীর্ঘ ইতিহাস অল্প কথায় কীভাবে বলা সম্ভব বা আদৌ বলা সম্ভব কি! আজ থেকে ১১ হাজার বছর আগে কৃষি বিপ্লব, ৫০০ বছর আগের বিজ্ঞান বিপ্লব, ২৫০ বছর আগের শিল্পবিপ্লব, বছর ৫০ আগের তথ্য/টেকনো বিপ্লবের পথ ধরে জটিলসব সামাজিক বুননের পথ ধরে আজ মানুষ এগিয়ে চলেছে যন্ত্রমানব হওয়ার পথে।
কাল্পনিক গল্পে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধা, একসঙ্গে কাজ আদায় করিয়ে নেয় এই গ্রহের অন্য কোনো প্রাণীর বেলায় ঘটেনি বলে প্রথম দিকে অ্যানিমিজম এবং পরে বহু ও একক ভগবানের উদ্ভব ঘটেছে খুব তাড়াতাড়ি। শুধু তাই না, ভগবান সৃষ্টির ভেতর দিয়ে মানুষ নিজেকেই প্রাণিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ বলে ঘোষণা দেয়। নতুন আবিষ্কারের মোড়ে মোড়ে, নতুন পরিবর্তনের সঙ্গে অচেনা দেবতারা যখন খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন মানুষ নতুন নতুন কাল্পনিক গল্প, মূল্যবোধ তৈরি করেছে। ভগবান আকাশ থেকে মাটিতে নেমে এসেছেন। ভগবানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে মানুষ নিজেই তৈরি করেছে কমিউনিজম, সোশ্যালিজম, লিবারালিজম অথবা সাম্প্রতিক কাল্পনিক গল্প ‘হিউম্যানিটি’। অথচ হিউম্যানিটির কোনো বায়বীয় অস্তিত্ব নেই, যা আছে তা শুধু আমাদের চিন্তায়! একইভাবে জাতীয়তাবাদ, ক্যাপিটালিজম বা সোশ্যালিজম, জাতিসংঘ অথবা দেশপ্রেম এগুলোও এক একটি কাল্পনিক গল্পের ওপর মানুষের বিশ্বাস ছাড়া আর কিছু না! চলতি সময়ে একক যে আইটেমটির ওপর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ ভগবানের চাইতেও বেশি বিশ্বাস, তার নাম ডলার। ডলারের অস্তিত্ব কোথায়? একটুকরো কাগজ বৈ তো কিছু নয়। অথচ এ দিয়ে বাস্তব উপাদান অনায়াসেই পাওয়া যাবে। সৃষ্টির জগতের আর কোনো প্রাণীকে ডলার দিয়ে কাজ করানো যায়! আরও আছে। বর্তমানে সারা পৃথিবীর মোট ডলারের পরিমাণ প্রায় ৬০ ট্রিলিয়ন। অথচ ছাপানো মোট কয়েন এবং ডলারের ব্যাংক নোট রয়েছে ৬ ট্রিলিয়নেরও কম। তাহলে দেখা যাচ্ছে ৯০% এরও বেশি ডলারের অস্তিত্ব শুধু অ্যাকাউন্ট বইয়ে বা কম্পিউটারের সার্ভারে, অর্থাৎ মানুষের কল্পনায়! অথচ মানুষ দিব্যি তার ওপরে ভরসা রেখে চালিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর তাবৎ কর্মকা-! আজকের পৃথিবী তাই ‘অবজেক্টিভ রিয়েলিটি’ ও ‘সাবজেক্টিভ রিয়েলিটি’র মিশেল এক যাদু-বাস্তবতা!
৫০ ভাষায় অনূদিত, ১০ মিলিয়নের ওপরে বিক্রি হয়ে যাওয়া এ জনপ্রিয় বইটিতে তিনি মানুষের ইতিহাস ব্যাপারটিকে বিচ্ছিন্ন একটা বিষয় মনে না করে অনুসন্ধান করেছেন ইতিহাস ও জীববিজ্ঞানের মধ্যে আন্তঃসম্পর্কটি কেমন ছিল, ঠিক কী কী মৌলিক পার্থক্য ছিল মানুষ ও অন্য প্রাণীর ভেতর, আর কেনই-বা প্রাণীর একটি শাখাই বিকাশ লাভ করেছে, অন্যরা নয় কেন! ইতিহাসে কখনোই কি মানুষে মানুষে ন্যায়বিচার ছিল! অথবা মানুষ এই যে এতদূর এলো, আজকের মানুষ কি আগের মানুষের চেয়ে বেশি সুখী! আজকের সময়ে ক্ষুধা নিবারণের দুর্দশা, রোগশোকে ভোগার দুর্দশা কমে এসেছে, মানুষের আয়ু অনেক বেড়েছে, কিন্তু সামগ্রিক সুখ এখনো অধরা রয়ে গেছে। জৈবিক মানুষের দেহে কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অনুপ্রবেশের ভেতর দিয়ে ভবিষ্যতে যে যান্ত্রিক-মানুষের দিন শুরু হতে যাচ্ছে, সেখানে মানুষ কতটুকু সুখী হতে পারবে, তা ভাববার দিন কি এখনই নয়!
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব-ইতিহাসের পিএইচডি এবং দার্শনিক হারারি এই গল্প অতি দ্রুততায় ও দক্ষতায় বলার চেষ্টা করেছেন। এখানে পরতে পরতে ‘কেন’ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টায়, কল্পনা, ফিলসফি ও তার নিজস্ব ব্যাখ্যার বুননে বইটি শুধু তথ্যের ঠাস-বুনটই নয়, ইতিহাসের বা নৃ-বিজ্ঞানকেন্দ্রিক বই-ই নয়, হয়ে উঠেছে রোমাঞ্চোপন্যাসের মতো রহস্যময় ও জমজমাট। আসলে ‘স্যাপিয়েন্স’-এর সাড়ে চারশ’ পৃষ্ঠা নিতান্তই ছোট পরিসর এত বড় গল্পের জন্য।
হারারি একজন ইতিহাস-বলিয়েই নন, তিনি একজন প্রভাব বিস্তারকারী বক্তাও। ঐতিহাসিক বিবর্তনের পটভূমিতে ভবিষ্যতের মানুষ কোনদিকে যাবে তার কোনো প্যাটার্ন বোঝার অবকাশ আছে কি না, সে বিষয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও গবেষণায় নিয়োজিত তিনি। তার বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে পৃথিবীর বড় বড় করপোরেশন, ব্যক্তি এবং রাষ্ট্র। ২০১৪ সালে স্যাপিয়েন্স ছাড়াও এর মধ্যেই আরও দুটি প্রভাব বিস্তারকারী বই লিখে হই চই ফেলে দিয়েছেন তিনি।
লেখক : কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক
