সিনেমা হল মালিকরা ঘোষণা দিয়েছেন, তারা হল বন্ধ করে দেবেন। এমন হুমকিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা, কিন্তু সমাধান কোথায়? পরিচালক, প্রযোজক ও হল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন সুদীপ্ত সাইদ খান
একসময় বাংলাদেশে ১২ শতাধিক সিনেমা হল ছিল। হলের সংখ্যা কমতে কমতে এখন মাত্র পৌনে দু’শতে নেমে এসেছে। নানা কারণেই সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সিনেমা হলগুলোর নাজুক অবস্থা সচল করতে এবার ব্যবস্থা চাইল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি। শুধু ব্যবস্থা চেয়েই ক্ষান্ত হয়নি তারা। দিয়েছে হুমকিও। হল বাঁচাতে সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তারা বন্ধ করে দেবে সিনেমা হল। ১২ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে প্রদর্শক সমিতি জানায়, বিদেশি ছবি আমদানির ক্ষেত্রে নীতিমালা সহজ ও দেশীয় ছবি নির্মাণ বাড়ানোর বিষয়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ না নিলে ১২ এপ্রিল থেকে দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি।
এদিকে প্রদর্শক সমিতির এমন ঘোষণায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে চলচ্চিত্রাঙ্গনে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান গণমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন, প্রদর্শক সমিতির এমন সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন না তারা। প্রয়োজনে পাল্টা আন্দোলনে নামবেন।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিনেমা হল মালিকরা যে কথাগুলো বলেছেন তাতে যুক্তি আছে। তারা ভালো কনটেন্ট চান। আমরাও মনে করি, ভালো কনটেন্ট ছাড়া সিনেমা হল টেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু ভালো কনটেন্ট দিতে হলে আমাদের সুযোগ করে দিতে হবে। প্রযোজক লাভবান হলেই সে বারবার ইনভেস্ট করবে। কিন্তু হল মালিকরা ন্যায্য পাওনা থেকে প্রযোজকদের বঞ্চিত করছেন। ধরুন, মধুমিতা হলের টিকিটের দাম ১৫০ টাকা। কিন্তু প্রযোজক পায় ৩০ টাকা। এই ৩০ টাকার মধ্যেই প্রযোজকের সিনেমা বানানো, পাবলিসিটি, মেশিন ভাড়া সব দিতে হয়। এতে করে প্রযোজক হিসেবে আমার খরচ হচ্ছে প্রতি টিকিটে ৩৫-৩৬ টাকা। প্রতি টিকিটে লস ৫ থেকে ৬ টাকা। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে প্রযোজক তো লসই গুনবেন। তারা তো আর সিনেমা বানাবেন না। এই অসম বণ্টনের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত এটার কোনো সমাধান হবে না।’
মধুমতী সিনেমা হলের মালিক ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আল্টিমেটাম হচ্ছে হল বাঁচানোর জন্য। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অনেক ছবিই মুক্তি পেয়েছে কিন্তু কোনো ছবিই ব্যবসাসফল হয়নি। সরকার তো অনেক কিছুই করার কথা বলেছে কিন্তু সেগুলো তো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ভারতীয় ছবি আনতে জটিলতা, যৌথ প্রযোজনায় ছবি বানাতে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেটাও খুব কঠিন। ভালো মানের দেশীয় ছবিও নির্মিত হচ্ছে না। তাহলে হলগুলো চলবে কী করে?’
সিনেপ্লেক্সের প্রসঙ্গ টেনে এনে নওশাদ বলেন, ‘আমাদের দেশের সিনেপ্লেক্সগুলোতে যেখানে হলিউডি ছবি আন্তর্জাতিক মুক্তির দিনেই রিলিজ হচ্ছে, সেখানে কলকাতার বাংলা ছবি বা ভারতীয় হিন্দি ছবি এখানে একই দিনে কেন মুক্তি পাবে না?’
এদিকে হল মালিকদের কারচুপির কারণে দেশীয় প্রযোজকরা লগ্নি তুলে আনতে পারছেন নাÑ এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নওশাদ বলেন, ‘টাকা উঠে আসছে না, হল মালিকরা কারচুপি করছেÑ এটা সবাই বলে। হল মালিকরা যদি কারচুপিই করে, তাহলে সিনেমা হলে ছবি না দিলেই তো হয়। কিন্তু তা না করে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করলে তো হবে না। বাস্তব বিষয়টা মেনে নিতে হবে।’
তবে কি সত্যিই হল বন্ধ করে দেওয়া হবে? নাকি এটা নিছকই হুমকি? এমন প্রশ্নের জবাবে হল মালিকদের এই নেতা বলেন, ‘সিনেমা শিল্পকে বাঁচানোর লক্ষ্যে যেকোনো ধরনের সমঝোতায় আমরা আগ্রহী। মূলত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমাদের এমন উদ্যোগ।’
শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতি, প্রদর্শক সমিতির পরস্পরবিরোধী এমন বক্তব্য কি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে? এই সমস্যার সমাধানই বা কোথায়? জবাবে চিত্রনায়ক ও সংসদ সদস্য নায়ক ফারুক বলেন, ‘প্রদর্শক সমিতির ঘোষণাটি আমিও শুনেছি। বেশিরভাগ পত্রিকা হেডলাইন করেছে, সিনেমা হল বন্ধের আল্টিমেটাম দিয়েছে তারা। আমাদের এ রকম হেডলাইনে থাকলে চলবে না। কারণ এই হেডলাইনের নিচের মূল কথাগুলোর দিকে জোর দিতে হবে। তারা কেন সিনেমা হল বন্ধের মতো ঘোষণা দিতে পারে, সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। তাদের সেই সমস্যাগুলো নিয়েও ভাবতে হবে। আর সবকিছু ভেবে নিয়েই সবার সঙ্গে বসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এর সমাধানটা কোথায়? এটা এভাবে প্রেস কনফারেন্স করে বলে লাভ হবে না। চারদিকে চার রকম কথা না বলে সবাইকে একসঙ্গে বসে কথা বলতে হবে।
সেক্ষেত্রে সবাই যদি চায়, তাহলে আমরা শিগগির তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসে মিটিং করব। সেখানে প্রদর্শক ভাইদেরও থাকতে হবে। নিজেদের সমস্যাগুলো সেখানে বলতে হবে। হিন্দি সিনেমা এনে লাভ হবে না। দেশীয় সিনেমা বানাতে হবে। এজন্য এফডিসির এমডিসহ সবাইকে বসেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
