ব্যবসা সহজীকরণে সরকারি উদ্যোগ

গর্জন বেশি অর্জন কম

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০২:৫১ এএম

কোনো পণ্য আমদানি বা রপ্তানি করতে বিভিন্ন রকমের কাগজ নিয়ে ব্যবসায়ীদের এখন ঘুরতে হয় সরকারের নানা দপ্তরে। তাদের সময়, খরচ ও হয়রানি কমাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় চার বছর আগে একটি ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এটি হলে আমদানি-রপ্তানিতে বিভিন্ন অফিসে ব্যবসায়ীদের যত ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হয়, তার সবগুলোই এনবিআরে জমা দেবেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রয়োজনমতো এনবিআর থেকে নথি যাচাই করবে, ব্যবসায়ীদের আর ঘুরতে হবে না। সে উদ্যোগ এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা ও বিশ্ববাণিজ্যের নতুন বিষয়গুলো সংযোজন করে ১৯৯৪ সালে প্রণীত কোম্পানি আইন সংশোধনের কাজ শুরু করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ২০১২ সালে উদ্যোগ নেওয়ার পর মন্ত্রিসভায় অনুমোদনও পেয়েছে খসড়াটি। তাতে এক ব্যক্তির কোম্পানি খোলার সুযোগ রাখা হয়েছে, কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো শর্ত আর যোগ্যতার বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। বিদ্যমান আইনে বাংলাদেশে একা কোনো ব্যক্তির পক্ষে কোম্পানি করে ব্যবসা করার সুযোগ নেই।

পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একক মালিকানার কোম্পানি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোম্পানির ধরন সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করতে চিঠি দিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। ওই চিঠি পাওয়ার পর এখনো তা নির্ধারণ করতে না পারায় আইনটি সংসদে বিল আকারে পাঠাতে পারছে না মন্ত্রণালয়।

ব্যবসা সহজ করতে নানা পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার কথা জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরে ব্যবসার প্রক্রিয়া সহজতর করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বারবার জোর দেওয়ার প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো একের পর এক বৈঠক করে ব্যবসা সহজ করার চেষ্টায় নানা সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা করা সূচকে ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৭তম। পরের বছর এক ধাপ এগিয়ে ১৭৬তম হয় বাংলাদেশ। তখন থেকেই ব্যবসা সহজ করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কাজ শুরু করে বিডা। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ১০০-এর মধ্যে উঠে আসার লক্ষ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করলেও লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যবসার পরিবেশ সহজ হয়নি। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যবসা সহজীকরণ করার সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তদারকিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কমিটি প্রথম বৈঠকের পর এ পর্যন্ত মোটে দুটি সভা হয়েছে। এসব সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বেশিরভাগই এখনো কার্যকর হয়নি। ব্যবসা সহজ করতে

গর্জন বেশি অর্জন কম

বিডার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের দুটি কমিটিও কাজ করছে। এসব কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ বাস্তবায়ন করছে না অন্য মন্ত্রণালয়গুলো। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট পলিসি কো-অর্ডিনেশন কমিটির (পিএসডিপিসিসি) অনেক সিদ্ধান্তও সময়মতো কার্যকর হচ্ছে না বলে জানা গেছে। ২০১৮ সালের ৯ আগস্ট পর্যন্ত এ কমিটির ১১টি সভায় নেওয়া ৯৪টি সুপারিশের মধ্যে গত ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ২৫টি বাস্তবায়ন করেছে। বাকিগুলোর মধ্যে ৩৭টি বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে, ৩২টি সুপারিশ পর্যালোচনাধীন রয়েছে।

গত ১২ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলমের সভাপতিত্বে ব্যবসা সহজীকরণ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় নেওয়া অনেক সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ওই সভায় বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে ৯টি প্রক্রিয়ার বদলে ৫টি, খরচ ৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৯ লাখ করা ও ১৪৮ দিনের বদলে ৮০ দিনে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার প্রস্তাবের কথা জানান বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. কাজী আমিনুল ইসলাম। তখন বিদ্যুৎ সচিব জানান যে, এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ অবগত নয়। বৈঠকে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা করে সচল রাখতে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে ব্যাংকের শাখাগুলো প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। গত ৬ ফেব্রুয়ারি দেশের বন্দর পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিনিধি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার কথা থাকলেও ব্যাংকগুলো সরকারি ছুটির দিনে খোলা থাকে না। আর ব্যাংক খোলা না থাকায় বন্দরে পণ্য খালাস সম্ভব হয় না।

সভায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে গ্রিন চ্যানেল চালুর কথা থাকলেও তা এখনো চালু হয়নি। আমদানি পণ্যের ৫ শতাংশ পণ্য কায়িক পরীক্ষা করার সিদ্ধান্তও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো ৬৮ শতাংশ পণ্য বন্দরের ভেতর অ্যাসেসমেন্ট করে পণ্য সরবরাহ করা হয়। এতে সময় বেশি লাগে, বন্দরের ভেতরে করটেইনার ও ট্রাকজট সৃষ্টি হয়।

দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয়। এ বন্দরে কার্যক্রম এখনো অটোমেশন হয়নি। একটি প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি শেডের লোডিং-আনলোডিং, রাজস্ব আদায় ও স্কেলের ওজন সংক্রান্ত কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে অটোমেশনের কাজ চলছে। অনেক স্থলবন্দরে ব্যাংকের কোনো শাখাও নেই। বন্দর ব্যবহারকারীদের ট্রেজারি চালানের টাকা জমা দিতে উপজেলা ও জেলা শহরে যেতে হয়। যেসব বন্দর এলাকায় ব্যাংকের শাখা বা বুথ নেই, সেখানে শাখা স্থাপনে গত ১ জানুয়ারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে নৌ মন্ত্রণালয়।

জমি দলিল করা ও দলিল পেতে অনেক সময় ব্যয় হয়। জাতীয় কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, দলিল করার সময়ই সাব রেজিস্ট্রার অফিসে চার কপি দলিল দাখিল করা হবে। স্বাক্ষর ও সিলমোহর শেষে তাৎক্ষণিকভাবে এক কপি দলিল গ্রহীতার কাছে, এক কপি সহকারী কমিশনার (ভূমি), দুই কপি সাব রেজিস্ট্রার অফিসে সংরক্ষণ করা হবে। এ উদ্যোগও এখনো বাস্তবায়ন শুরু হয়নি বলে জানা গেছে।

২০০৩ সালের অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন অনুযায়ী ওয়্যারহাউস লো রিস্ক-এর ক্ষেত্রে ফায়ার লাইসেন্স দরকার, যা এখন ৯০ দিনে দেওয়া হয়। বিডা ৩০ দিনের মধ্যে এ লাইসেন্স দেওয়ার কথা বললে জনবল সংকটের কথা জানিয়ে সম্মতি দেয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভূমি মন্ত্রণালয় সারা দেশের ১৫৩ শ্রেণির জমিকে ১০ শ্রেণিতে নামানোর কাজ দুই মাসের মধ্যে করার সিদ্ধান্ত ডিসেম্বরে নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার প্রধান কাজই হবে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করার মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা। ব্যবসা সহজ করতে ব্যবসার প্রক্রিয়া সহজ করতে তার মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন কাজের ধাপ কমিয়ে আনতে সিঙ্গেল উইন্ডো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, এজন্যই প্রধানমন্ত্রী ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত মন্ত্রণালয়গুলোতে ব্যবসায়ীদের মন্ত্রী করেছেন। ব্যবসায়ীরা যখন কোনো সমস্যার সমাধান পেতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান, তখন বুঝতে হবে যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে তারা ওই সমস্যার কোনো সমাধান পাননি।

ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার বিষয়ে কার্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি, কেবল বিবৃতির মধ্যেই আটকে রয়েছে। বিডা এক্ষেত্রে অনেক চেষ্টা করলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো আগ্রহ নিয়ে কাজ না করায় অগ্রগতি হচ্ছে না।

বিদ্যমান ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে তৃপ্ত নন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম। সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘আমরা কাজ শুরু করেছি এবং এ কাজের ফোকাস হচ্ছে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সেবা যাতে সাশ্রয়ী, কম সময় ও কম প্রথা-পদ্ধতির মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের দ্রুততার সঙ্গে মানিয়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগে যে পরিবেশ থাকা দরকার, সেটা অর্জন করার বিষয়টা মাথায় রেখেই কার্যক্রমটা হাতে নিয়েছি। কাজ হচ্ছে। এতে আমরা সন্তুষ্ট নই, কারণ আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিয়োজিতদের পর্যাপ্ত জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। ভিয়েতনামে কেউ আজ ব্যবসার পরিকল্পনা করলে ছয় মাসের মধ্যে কারখানা স্থাপন করে উৎপাদন শুরু করতে পারে। বাংলাদেশে একটি ছয়তলা ভবন করতেই তিন বছর লেগে যায়।

গত বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বারের অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুইয়া বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সূচকে অর্থাৎ ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশে কিছু সমস্যা রয়েছে। সেগুলো দূর করতে পারলে বিনিয়োগ বাড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত