টাঙ্গাইলে প্রধানমন্ত্রী

বাবা বলেছিলেন কুমুদিনী স্কুলে ভর্তি করে দেবেন

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০৩:৫২ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আর্তমানবতার সেবায় দেশের বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তাহলে আর দেশের জনগণের কষ্ট থাকবে না। তিনি বলেন, রণদা প্রসাদ সাহা দেশের নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো থেকে শুরু করে মানব সেবার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, অনেক বিত্তশালী আছেন, তারাও তা করতে পারেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের কুমুদিনী কমপ্লেক্সে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা স্মারক স্বর্ণপদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করে বলেন, এখানে একবার এসেছিলাম, সেটা ১৯৫৬ বা ৫৭ সালে। আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মাসহ সবাই এসেছিলেন। দীর্ঘ সময় এখানে ছিলেন। এই স্কুলটা, হাসপাতাল সব ঘুরে ঘুরে দেখেছেন তারা। খুব ছায়ার মতো আমার এটুকু স্মৃতি মনে আছে। তবে মনে আছে, এই জায়গা এত সুন্দর দেখে বাবা বলেছিলেন আমাকে এই কুমুদিনী স্কুলে ভর্তি করে দেবেন। তবে হোস্টেলে রেখে পড়ানো আমার মায়ের খুব একটা মনঃপূত ছিল না। তাছাড়া এরপর ’৫৮ সালে মার্শাল ল হয়। আমার বাবাকে জেলে নিয়ে যায়। আমাদের পড়াশোনা এমনিতেই বন্ধ। পরে আর আসা হয়নি। তবে ’৮১ সালে দেশে ফেরার পর আমি অনেকবারই এসেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ব্যাপকভাবে মানুষের জন্য কাজ করেছিলেন, তিনি বিধবাদের জন্য কাজ করেছিলেন। তিনি শুধু মানুষের সেবা করার জন্য এবং মানুষকে মানুষের মতো বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বিরাট এক কর্মযজ্ঞ গড়ে তুলেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রণদা প্রসাদ দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও পরিশ্রম ও বুদ্ধিমত্তায় তিনি বাংলার অন্যতম ধনী হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন। তবে অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার পরও তিনি ভোগ-বিলাসে ডুবে যাননি। বরং অর্জিত অর্থ মানবকল্যাণে ব্যয় করেছেন।

নারী শিক্ষার প্রসারে রণদা প্রসাদের ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি একে একে ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী কলেজ এবং পিতার নামে দেবেন্দ্র কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তিনি আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের পরবর্তী প্রজন্ম প্রতিষ্ঠাতার মানবিক প্রয়াস-প্রান্তিক অসহায় জনপদে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও নারী শিক্ষা প্রসারে নিজেদের নিবেদিত রেখেছেন। ট্রাস্টের সেবা কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়েছে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ, কুমুদিনী নার্সিং স্কুল ও কলেজ এবং রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়। অনগ্রসর মানুষের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কুমুদিনী ট্রেড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট।

কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বিডি) ৮৬ বছর কার্যকাল পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানে উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (মরণোত্তর), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (মরণোত্তর), জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদকে ২০১৯ সালের রণদা প্রসাদ স্মারক স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে শেখ রেহানা এবং নজরুলের পক্ষে কবির নাতনি খিলখিল কাজী পদক গ্রহণ করেন।

বেলা ১১টার পর হেলিকপ্টারে করে ঢাকা থেকে মির্জাপুরে পৌঁছেই কুমুদিনী কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে ৩১টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের আনুষ্ঠানিকতা সারেন। তিনি কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমস পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষার্থীদের মনোমুগ্ধকর ডিসপ্লে উপভোগ করেন। বিকেলে তিনি জেলার সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বাবা এই বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার জন্য সারাজীবন যে ত্যাগ স্বীকার করে গিয়েছেন, তারই পাশে থেকে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন আমার মা (শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব)। তাদের কথা সবসময় মনে রেখেছি যে, আমার বাবা কী করতে চেয়েছিলেন, যা তাকে ঘাতকের বুলেট করতে দেয়নি। তার সেই অসমাপ্ত কাজের একটু যদি করতে পারি তবে সেটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

‘বাংলাদেশকে আজ আর কেউ দরিদ্র দেশ বলে অবহেলা করতে পারে না এবং করুণার চোখে দেখে না’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বরং সারাবিশ্ব বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে দেখে’।

তার সরকারের টানা দুই মেয়াদের শাসনে দেশের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে গত ১০ বছরে আমরা এই পরিবর্তন সর্বত্র আনতে পেরেছি। কাজেই এই বাংলাদেশকে আরও অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং এই সমাজ ও দেশকে গড়ে তুলতে চাই।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিব প্রসাদ সাহা। বক্তৃতা করেন ট্রাস্টের পরিচালক ও ভাষাসৈনিক প্রতিভা মুৎসুদ্দি এবং পরিচালক শ্রীমতী সাহা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সংসদ সদস্য একাব্বর হোসেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত