খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের জামাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসক রাজন কর্মকার (৩৯) মারা গেছেন। গতকাল ভোররাতে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা যায়নি। তবে হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকরা। স্কয়ার হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. আসাদ দেশ রূপান্তর বলেন, ‘রবিবার
ভোররাত ৩টা ৪৫ মিনিটে রাজন কর্মকারকে তার পরিবার হাসপাতালে নিয়ে আসে। তবে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।’
এদিকে রাজনের সহকর্মীদের দাবি, অতীতেও স্ত্রীর নির্যাতনে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন রাজন। শনিবার রাতেও ২টার দিকে রাজনের স্ত্রী কৃষ্ণা চন্দ্র মজুমদার শাশুড়িকে ফোন করে তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দেন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে লাশের ময়নাতদন্তের দাবি জানান সহকর্মীরা। তবে ময়নাতদন্ত ছাড়াই খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের পরিবার লাশ নিতে চাইলে বাধা দেয় রাজনের সহকর্মী চিকিৎসকরা। মন্ত্রী গতকাল দিনভর স্কয়ার হাসপাতালে ছিলেন। এ সময় রাজনের সহকর্মীরা স্কয়ার হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ করেন। স্কয়ার হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ লাশের ময়নাতদন্তের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি অভিযোগ করেছেন রাজনের মামা সুজন কর্মকার। রাজনের লাশ সুরতহাল শেষে গতকাল সন্ধ্যায় স্কয়ার হাসপাতাল থেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সোমবার সকালে লাশের ময়নাতদন্ত করা হবে।
শেরেবাংলা নগর থানার ওসি জানে আলম মুন্সী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে খুব দ্রুতই প্রতিবেদন দেওয়া হবে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে রাজনের লাশের ময়নাতদন্ত করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুপুরে মন্ত্রীর লোকজন স্কয়ার হাসপাতালে গেলে মৃতের পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়। ঘটনায় হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ থানায় ফোন করে জানালে পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রাজন কর্মকার বিএসএমএমইউর ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তার স্ত্রী একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তারা তেজগাঁওয়ের ৪৭ ইন্দিরা রোডে হাসেম বাড়ির ৩/সি ফ্ল্যাটে থাকতেন। শনিবার রাতে রাজধানীর গ্রিন রোডের গ্রিন লাইফ হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিস শেষে রাত ১২টায় বাসায় ফেরেন রাজন। রবিবার ভোররাতে পরিবারের সদস্যরা রাজনকে অসুস্থ অবস্থায় স্কয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনলে কর্তব্য চিকিৎসক ডা. সজীব মৃত ঘোষণা করেন। এরপর সকালে মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই রাজনের লাশ নিয়ে যেতে চান, কিন্তু এতে রাজনের সহকর্মীরা বাধা দেন। বাধার মুখে লাশ নিতে ব্যর্থ হয়ে মন্ত্রী হাসপাতালের ১৪ তলায় একটি ক্যাবিনে অবস্থান করেন। দিনভর ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে গতকাল বিকেলে খাদ্যমন্ত্রী রাজনের মামা সুজন কর্মকারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে রাজনের সহকর্মীরা বাধা দেন। তারা বলেন, সুজন কর্মকারকে ভয়ভীতি দেখানো হতে পারে; এ জন্য সুজনের সঙ্গে আমরাও যাব। এ সময় মন্ত্রীর লোকজনের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন রাজনের সহকর্মীরা। যুবলীগের কর্মী পরিচয় দিয়ে একজন রাজনের সহকর্মীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেন। পরে শেরেবাংলা নগর থানার এসআই তোফাজ্জল হোসেন পরিস্থিতি শান্ত করে রাজনের সহকর্মীদের থানায় অভিযোগ করতে বলেন। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি খাদ্যমন্ত্রী।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ডা. আহসান হাবিব হেলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই বছর আগেও রাজন স্ত্রীর সঙ্গে কলহ করে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তখন রাজনের শরীরে বেশ কিছু আঘাতের চিহ্ন ছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই রাজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের হোক। ময়নাতদন্ত ছাড়া এই লাশ যদি পোড়ানো হয়, তাহলে সবার মনেই একটা সন্দেহ থেকে যাবে।’
রাজনের সহকর্মী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. বারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাড়ি রাজনের বাড়ির পাশেই। তার পরিবারের সঙ্গে আমার সবসময় যোগাযোগ হয়। রাজন ও তার স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ ছিল। রাজনের মা আমাকে জানিয়েছেন, গতকাল রাত ২টার দিকে রাজনের স্ত্রী কৃষ্ণা গ্রামের বাড়িতে ফোন করে তার শাশুড়িকে বলেন, তোর ছেলেকে মারব আমিও মরব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই রাজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের হোক। এ জন্য ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ নিতে দেওয়া হবে না।’ রাজনের মামা সুজন কর্মকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনের মা-বাবা গ্রামে থাকেন। তারা আমাকে বলেছেন, রাজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করতে যা যা করণীয় সব করতে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে নিহতের শ্বশুরবাড়ির লোকজন স্বাভাবিক মৃত্যু ধরে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু একজন লোকের এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। আমরা লাশের ময়নাতদন্ত চাই।’
উল্লেখ্য, রাজন কর্মকারের বাড়ি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার এখলাসপুর গ্রামে। পিতা সুনীল কর্মকার ও মাতা খুকু রানি কর্মকার উভয়ই অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। তিন ভাই-বোনের মধ্যে রাজন সবার বড়। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অষ্টম ব্যাচের (বিডিএস) ছাত্র ছিলেন।
