সিকান্দার আবু জাফর উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন। অন্যদের ছাপিয়ে উঠতেন শারীরিক উচ্চতায়, হারিয়ে দিতেন কাজেও। শিরদাঁড়া খুবই শক্ত ছিল, সেখানে কাজ করত অঙ্গীকারের দৃঢ়তা। এসবকে যদি দৈর্ঘ্য বলি তবে প্রস্থে ছিল সাহস। লোকে বলত বেপরোয়া। অনেক কাজ করেছেন সিকান্দার আবু জাফর। বহু ধরনের কাজ, একই কাজের ভেতরেও একাধিক কাজ ছিল। প্রধানত ছিলেন লেখক। প্রচুর লিখেছেন, এবং বহু রকমের লেখা লিখেছেন। শুরু করেছিলেন গল্প ও উপন্যাস দিয়ে। কবিতাও ছিল সঙ্গী হিসেবে। তার গদ্যে কবিতা আছে, আছে কবিতার ছন্দস্পন্দন ও উপমা, শব্দের সতর্ক প্রয়োগ; আবার তার কবিতায় দেখা যাবে রয়েছে গদ্যের সতর্কতা, আছে যুক্তিপরম্পরা, রয়েছে উক্তির সঙ্গে উক্তির অম্বয়, এবং ধ্বনির সঙ্গে অর্থের অবিচ্ছিন্ন সাযুজ্য। নাটক লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন কবিতা ও নাটক, লিখেছেন পত্রিকার সম্পাদকীয়। আর গান তো লিখেছেন দু’হাতে। মনে হবে তার সব লেখাই বুঝি স্বতঃস্ফূর্ত, যে কথা তিনি নিজেও বলেছেন, কিন্তু ভেতরে ছিল রুচির সংযম এবং যুক্তির শৃঙ্খলা। জোর দিয়ে কথা বলতেন আমাদের জাফর ভাই। তার ওই কণ্ঠস্বর তার সব লেখাতেই শুনতে পাই।
কিন্তু কেবল লেখা তো নয়, ছিলেন অসাধারণ এক সম্পাদক। ছিলেন সংগঠক। মোটরগাড়ি কিনে সে-গাড়ি চালিয়েছেন নিজের হাতে। মোটরগাড়ির কলকব্জা কলাকৌশল সম্বন্ধে ধারণা রাখতেন। ছাপাখানা বিষয়ে যেমন ছিল কৌতূহল তেমনি ছিল অভিজ্ঞতা। নিজেই একটি ছাপাখানা খুলে বসেছিলেন। প্রয়োজনে নিজের বইয়ের ও পত্রিকার প্রচ্ছদ নিজেই আঁকতেন। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও ছিল তার। সাংস্কৃতিক দল গড়ে তুলেছেন। ব্যবসাবিমুখ ছিলেন না। মোটেই না। ছিল ব্যাপক যোগাযোগ। লেখকদের তো অবশ্যই, রাজনৈতিক কর্মী, আমলা, ব্যবসায়ী, সব ধরনের লোককে কাছে টেনে নিতে পারতেন, একেবারে অনায়াসে। সবাই আসত অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে, এবং কেউই হতাশ হতো না।
এ এক অসাধারণ মানুষ; নেতৃত্বে আগ্রহী নন, কিন্তু নেতৃত্ব তাকে দিতে হয়; ঘাড়ে এসে পড়ে, তাতে বিরক্ত হন না, নালিশ করেন না, হাসিমুখে কাজ করেন। হাসিমুখ ছাড়া তাকে দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। হাঁপানি ছিল, কিন্তু যে কোনো পরিস্থিতিতেই তার উপস্থিতি ছিল আনন্দদায়ক। ভীষণ মজলিসি, কিন্তু সর্বদাই কর্তব্য-সচেতন। তবে সব কাজের চেয়ে বড় ছিলেন তিনি। নিজের কাজের চেয়ে মানুষটি বড়, এমন ঘটনা বিরল নয়; কিন্তু কাজও বড় মানুষটিও বড়, এবং দু’য়ের ভেতর সম্পর্কটা দ্বান্দ্বিক, এমন দৃষ্টান্ত সহজে পাওয়া যায় না। সে জন্যই জাফর ভাই ছিলেন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও উল্লেখযোগ্য। আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের বন্ধ্যা সংস্কৃতিতে অমন মানুষ অনেক পাওয়া যায় না। এবং পাওয়া গেলেও তারা একাকী হয়ে পড়েন, সহকর্মীর অভাবে। সিকান্দার আবু জাফরের বেলাতেও তেমনটা ঘটেছে বলে আমরা টের পাই।
খুলনার লোক তিনি, ছিলেন কলকাতায়। সেখানেই ছাত্রজীবনের সমাপ্তি এবং কর্মজীবনের সূচনা। অল্পবয়সেই সান্নিধ্যে এসেছিলেন ‘শনিবারের চিঠি’র সজনীকান্ত দাস ও স্থিতধী গবেষক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের; কাজ করেছেন নজরুলের দ্বিতীয় পর্যায়ের সান্ধ্য-দৈনিক ‘নবযুগে’ও। কলকাতাতেই তার থাকার কথা ছিল। থাকতেনও, যদি না দেশভাগের ভূমিকম্প সবকিছুকে তছনছ করে না দিত। কলকাতায় তখন একঝাঁক প্রতিভাবান মুসলমান তরুণ সাহিত্যচর্চা করছিলেন। অনিবার্যভাবেই তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানবাদী হয়ে পড়েছিলেন। পাকিস্তানবাদীদের ভেতরও প্রগতিশীল একটা অংশ ছিল। কারও কারও প্রবণতা ছিল মার্কসবাদ-অভিমুখী। সিকান্দার আবু জাফর এই বড় গোষ্ঠীরই একজন। সকলের সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব ছিল; এবং সে বন্ধুত্বের গুণগত গভীরতা নিতান্ত সামান্য ছিল না। দেশভাগ ওই তরুণদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। কেউ কেউ ঢাকামুখী হয়েছেন, সাতচল্লিশ শেষ হওয়ার আগেই। ঢাকায় যারা আসবেন ভাবেননি, তাদেরও অধিকাংশকেই চলে আসতে হয়েছে, ১৯৫০ সালে। দাঙ্গার কারণে। জাফর ভাইও চলে এসেছেন। কলকাতায় তিনি গুছিয়ে বসেছিলেন। তার স্ত্রী ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের। কলকাতাতেই তারা থাকবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু থাকা হলো না।
তাতে দমে যাননি। দমবার পাত্র ছিলেন না তিনি। তার কবিতাতে পঙ্ক্তি আছে ‘মারবে তবু মরব না’। এ তার একবারে ভেতরের কথা। আত্মসমর্পণ তার রক্তে ছিল না। তার পূর্বপুরুষ পাঠান ছিলেন, এটা অন্যরা জানত, তিনিও বলতেন। পাঠানদের একটা গুণ অনমনীয়তা, আরেকটা গুণ সহিষ্ণুতা। এ দু’টি গুণ তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন বলে ভাবতে ভালো লাগে; তবে গুণ দু’টিকে তিনি যে বিকশিত করেছিলেন সেটি খুব বড় একটা সত্য। ঢাকায় এসেছিলেন শরণার্থীর মতোই। কিন্তু শরণার্থী থাকেননি। তার প্রথম কবিতার বই ‘প্রসন্ন প্রহরে’র ভূমিকাতে তিনি লিখেছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি মাটিতে শিকড় মেলে দাঁড়াবার চেষ্টাতেই বেশি ভরসা পাই।’ এই মাটি ভূতলে যতটা না থাকে তার চেয়ে বেশি থাকে জনজীবনে। সেখানে প্রোথিত তিনি আগেও ছিলেন, ঢাকাতে এসে পুনরায় প্রোথিত হলেন। তার সবচেয়ে পরিচিত কবিতাটিতে, যেটি গানও বটে, বলা হয়েছে ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই, আমাদের সংগ্রাম চলবেই’। সে-মনোভাবটা সব সময়েই তার চালিকাশক্তি। সাতচল্লিশের আগেও যেমন ছিল, পরেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। জনতার সংগ্রাম আর তার নিজের সংগ্রামÑ এই দুইকে তিনি কখনো পৃথক করেননি, আমি’র কথা আলাদা করে ভাবেননি, আমাদের বাদ দিয়ে। আর ছিল আশাবাদ। ‘সংগ্রাম চলবেই’ এই ঘোষণাটি এসেছিল ১৯৬৫ সালে, সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে ফাতেমা জিন্নাহ যখন সামরিক বাহিনী ও বুনিয়াদি গণতন্ত্রী সমর্থিত আইয়ুব খানের কাছে পরাজিত হয়েছেন, এবং সে-কারণে সারা দেশে যখন হতাশার একটা শৈত্যপ্রবাহ বইতে শুরু করেছে তখন। সিকান্দার আবু জাফর নিজে কখনোই হতাশ হননি; না সাতচল্লিশে, না পঁয়ষট্টিতে, না একাত্তরে। একাত্তরের ৭ মার্চ তিনি কবিতা লিখেছেন ‘বাঙলা ছাড়ো’ নামে। লিখেছেন এবং সরকারি পত্রিকা ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এ সেটা ছেপেছেন। অনুমান করি পত্রিকার সম্পাদকদের ভেতরও তিনি প্রতিবাদের স্পৃহা ও আশাবাদ সংক্রমিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ওই কবিতায় কেবল সংগ্রামের কথা বলা হয়নি, শত্রুকে হাঁকিয়ে দেওয়ার কথাটাও বলা হয়েছে, অত্যন্ত স্পষ্ট করে।
৭ মার্চের ক’দিন পরেই তো এলো ২৫ মার্চ। শুরু হলো নির্বিচারে গণহত্যা। সিকান্দার আবু জাফর তখন ‘অভিযোগ’ নামে যে ইশতেহারটি লেখেন তাতে তার বেপরোয়া দুঃসাহসের চূড়ান্ত প্রকাশ দেখা যাবে। এটি তিনি তার নিজের ছাপাখানা থেকে ছেপে বিলি করেছেন; ২৬ জুলাই ১৯৭১-এ। ইশতেহারটিতে কেবল যে আবেগ আছে তা নয়, স্তরে স্তরে যুক্তিও আছে। আবেগ তো থাকবেই, কোন্ বাঙালির আবেগ ছিল না সেদিন, আর দেশপ্রেমিক এই কবির আবেগ থাকবে না সে কেমন কথা। আবেগ অবশ্যই ছিল, কিন্তু বক্তব্যতে শৃঙ্খলাও ছিল। তিনি বলছেন হামলার পেছনে রয়েছে পুঁজিবাদী স্বার্থ। লগ্নিপুঁজির ও কারবারি স্বার্থের চাহিদার বিষয়টা কারও অজানা নয়; সেই স্বার্থে পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ববঙ্গকে একটি উপনিবেশ করতে চেয়েছিল। পূর্ববঙ্গবাসী তাতে বাধা দিয়েছে, তাই শাসকদের এই তৎপরতা। তিনি লিখেছেন, ‘আসলে বাংলাদেশে এই নির্বিচার গণহত্যা পাকিস্তানি জঙ্গি শাসকরা যে কোনো অজুহাতেই করত।’ একাত্তরে পূর্ববঙ্গবাসী বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছে, তারা পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রত্যাখ্যান আসলে শোষণকেই প্রত্যাখ্যান। পাকিস্তানি শাসকরা তাই গণহত্যায় নেমেছে। ২৬ জুলাইতেই তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন যে পাকিস্তানের আর বাঁচার কোনো উপায় নেই; মৃত্যু তার অবধারিত। ইশতেহারটি শেষ হয়েছে পাকিস্তানের জন্য অগ্রিম ‘ইন্নাল্লিাহে’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে।
পাকিস্তানের এই অবধারিত মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার জন্য যে আহ্বানটি তিনি জানিয়েছেন সেটা ছিল একাধারে জরুরি এবং বিপজ্জনক। তার একাংশে তরুণদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, ‘বিভিন্ন শহর গ্রাম থেকে আজও যারা স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশীদারের জন্য আসতে পারোনি, তারা দলে দলে ছুটে এসো। তোমার নিরীহ বৃদ্ধ পিতামহকে ওরা পশুর মতো হত্যা করেছে, কুকুর দিয়ে খাইয়েছে তাদের লাশÑ তুমি তার বদলা নেবে না? তোমার অবুঝ কচি ভাইবোনদের সঙ্গীনে গেঁথে ওরা শকুনের মুখে তুলে দিয়েছে তুমি তার বদলা নেবে না? তোমার নিষ্পাপ যুবতী সহোদরাকে ওরা লুণ্ঠিত-যৌবনার ধিক্কার উপহার দিয়েছে তুমি তার বদলা নেবে না?’ এটি ছেপে বের করবার পর তার পক্ষে তো আর ঢাকায় থাকা সম্ভব ছিল না। হানাদাররা তাকে খুঁজেছে, তিনি আত্মগোপন করেছেন, এবং এক সময়ে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। ১৯৫০-এ পাকিস্তানি-হিন্দুস্তানি জাতীয়তাবাদের ধাক্কাতে তাকে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসতে হয়েছিল, ১৯৭১-এ পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের নৃশংস আক্রমণের মুখে প্রতিরোধের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য আবার কলকাতায় যেতে হলো। কলকাতায় গিয়েও তার অবসর ছিল না। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, ইশতেহারটি পুনঃপ্রকাশ করেছেন, এবং ‘অভিযান’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশও শুরু করে দিয়েছিলেন। অভিযান চলতো, দেশ যদি দ্রুত স্বাধীন না হয়ে যেত।
পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ যে কেমন নিষ্ঠুর সেটি বুঝতে তার সময় লাগেনি। কিন্তু বরাবরই তিনি আশাবাদী, ১৯৪৭-এ তার আশাবাদের রূপটা ছিল প্রসন্ন, তখনকার কবিতার বইয়ের নাম ‘প্রসন্ন প্রহর’। ১৯৫৪-তে তার কবিতার বইয়ের নাম দাঁড়াচ্ছে ‘তিমিরান্তিক’। তিমির ছিল, কিন্তু তিমির যে অন্ত হবে এমন চিহ্ন তিনি দেখতে পেয়েছেন। বিশেষ করে ১৯৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পরে। পরবর্তীকালে সামরিক শাসন এসেছে। বইয়ের ধরন তখন বদলে যাচ্ছে, নাম হচ্ছে ‘বৈরী বৃষ্টিতে’। এরপরে তিনি লিখেছেন ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের কবিতা। যেগুলো পাওয়া যাবে ‘বৃশ্চিক-লগ্ন’ নামের বইতে। সেখানে তিনি অনেকটা নজরুলের ধরনে রাজনৈতিক ও সামাজিক অসংগতিগুলোকে হাস্যকর করে তুলেছেন। এমনকি ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ বলে অভিহিত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেও ‘তুমি ধন্য ধন্য হে’ বলে বিদ্র্যপ করতে ছাড়েননি। বইটিতে এক আজব দেশের কথা আছে যেখানে ‘জনপদ মাঠ নদী বন্দর গ্রাম নগর থেকে/ কুকুর-ত্রস্ত মানুষের দল জঙ্গলে আশ্রিত।’ পশুরা তাই চরম দুর্ভাবনায় পড়েছে। এত জন্তুর ঠাঁই তারা দেবে কোথায়? ঠাট্টা করে নয়, খুব আন্তরিক স্বরে কবি গোলাম মোস্তফা একদা লিখেছিলেনÑ ‘পাকিস্তানে অভাব কি ভাই পাকিস্তানে অভাব কি’, সেই কবিতাকে ব্যঙ্গ করে লেখা হয়েছে ‘আজব দেশের জাতীয় সংগীত’। কবিতার মূল গায়েন ধুন ধরেছে, ‘আমাদের সব আছে ভাই সব আছে/ সাজ আছে রূপসজ্জা আছে, হাড়ের নলে মজ্জা আছে গরজ মত গলায় গলায়, হুকাহুয়া রব আছে।’
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
