নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের তুমুল আন্দোলনের মুখে গত বছর সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পাস করে সরকার। গেল অক্টোবরে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে আইন মন্ত্রণালয়। এতে সড়কে হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে ৫ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু এভাবে সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন আইনজ্ঞ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের মতে, দীর্ঘদিন পর চাপের মুখে সরকার সড়ক পরিবহন আইন করতে বাধ্য হলেও এটি এখনো কার্যকর হয়নি। এ আইনের দুই নম্বর ধারা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘সংসদে পাস, রাষ্ট্রপতির আদেশ ও গেজেট হওয়া সত্ত্বেও অনেক আইন কার্যকর হয় না।’
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর দুই নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা যে তারিখ নির্ধারণ করিবে সেই তারিখে এই আইন কার্যকর হইবে।’ এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শাহদীন মালিক বলেন, ‘এর অর্থ দাঁড়ায় সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আরেকটি তারিখ ঠিক করবে, তারপর আইনটি কার্যকর হবে।’
এ প্রসঙ্গে প্রায় একই মত দেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নরম্যালি গেজেট হয়ে যাওয়ার পর আইন কার্যকর হয়। তবে এ আইনের দুই ধারার বর্ণনা অনুযায়ী আইনটি কার্যকর হয়েছে কি না বলা যাচ্ছে না।’
এ আইনটি কার্যকর হলেও কোনো সুফল মিলবে না জানিয়ে শাহদীন মালিক বলেন, ‘পরিবহন আইনে যেসব বিষয় বলা আছে তা দিয়ে সড়কে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা যাবে না।’ যত বেশি শাস্তির বিধান সে সমাজ তত বর্বর উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘কথায় কথায় শাস্তি বাড়ালে দুর্ঘটনা কমবে না। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।’
সড়ক আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, অনুমতিপত্র ছাড়া গণপরিবহন চালানো যাবে না। আর ৫-এর ২ ধারায় বলা হয়েছে, এই অনুমতিপত্র হস্তান্তরযোগ্য হবে না এবং এর অধীনে পরিচালিত গণপরিবহনের দায়ভার অনুপতিপত্রের অধিকারীর ওপর ন্যস্ত হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ‘আইনটিতে যেসব ব্যবস্থা আনা হয়েছে তা দিয়ে কার্যকর সমাধান আসবে না। সমস্যা চিহ্নিত না করে আমরা উপসর্গ নিয়ে কাজ করেছি। ফলে আমরা সুযোগ হারিয়েছি। গণপরিবহনের বড় সমস্যা রুট পারমিট, যার পুরোটাই বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে। এটা ঠিক করতে হবে, সাজা দিয়ে ভীতি তৈরি করা যায় তবে সংস্কার করা যায় না।’
অপরাধ, বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে সড়ক পরিবহন আইনে বলা হয়েছে, পেনাল কোডের ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৮৮৯-এ ভিন্নতর কিছু না থাকলে, সাব ইন্সপেক্টর বা সমমর্যাদার কর্মকর্তা আদালতে অবহিত করলে এ আইনের অধীনে সব অপরাধ আমলযোগ্য হবে। তবে আইনের ৮৪ (মোটরযানের কারিগরি ত্রুটি), ৯৮ (ওভারলোডিং ও বেপরোয়া গতিতে মোটরযান চালনা) ও ১০৫ (দুর্ঘটনাসংক্রান্ত অপরাধ) ধারায় বর্ণিত অপরাধ ছাড়া বাকি সব অপরাধ হবে জামিনযোগ্য। এ ছাড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ বা সমমর্যাদার কর্মকর্তা এ আইনের ৬৬ (ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো), ৭২ (রেজিস্ট্রেশন ছাড়া মোটরযান চালানো), ৭৫ (মোটরযানের ফিটনেস না থাকলে), ৮৭ (মোটরযানের গতি অনিয়ন্ত্রিত হলে), ৮৯ (ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালালে) এবং ৯২ (নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করে গাড়ি চালালে) ধারায় বর্ণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আপস মীমাংসা করতে পারবেন।
এ আইনটি করার ক্ষেত্রে পরিবহন মালিকদের চাপ ছিল উল্লেখ করে ড. শামসুল হক আরও বলেন, ‘সড়কে নিরাপত্তার জন্য আইনের চেয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনেক জরুরি।’ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১৫৬ বাস অপারেটরের বদলে ৫টিকে নামাতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
