গ্লোবাল ট্রেন্ডস ২০১৭, ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুসারে, বিশ্বে যত উদ্বাস্তু আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় আশ্রয়দানকারীর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। রোহিঙ্গা সংকট তাই প্রকট আকার ধারণ করেছে বাংলাদেশে। রোহিঙ্গা সমস্যার প্রেক্ষিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্গেনার তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরের বিষয়ে ব্রিফ করেন।
নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব শহিদুল হক নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমাদের পূর্ণ আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ার কারণে দীর্ঘদিনেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কাজ শুরু করা যায়নি। এর থেকে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে? আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে এই কাউন্সিলকে জানাতে চাই যে, মিয়ানমার থেকে আসা নতুন কাউকে আর বাংলাদেশে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি অভিযোগ করেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় মিয়ানমার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেসব ছিল ‘ফাঁকা বুলি’। এ বিষয়ে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে তারা। একজন রোহিঙ্গাও স্বেচ্ছায় রাখাইনে ফিরে যেতে রাজি হয়নি, কারণ সেখানে তাদের নিরাপদে বসবাস করার মতো পরিস্থিতি মিয়ানমার এখন ও তৈরি করেনি। তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশের নাগরিক যারা নিজ দেশে বর্বরোচিত নৃশংসতা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শিকার, এমন নিগৃহীত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তাদের মানবিক আশ্রয় দেওয়ার জন্যই কি বাংলাদেশকে মূল্য দিতে হচ্ছে?”
এদিকে গত বছরের এপ্রিলে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে রোহিঙ্গাদের ফিলিপাইনের নাগরিকত্ব প্রদান করে সে দেশে নিয়ে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে এখনো পর্যন্ত আর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ভারতও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না এটা তারা আগেই ঘোষণা করেছে। এমনকি ভারতে যে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছিল তাদের অনেকেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এখন পুনরায় বাংলাদেশে ঢুকছে। এতে শুধু রোহিঙ্গা মুসলিমই নয় অনেক হিন্দুরাও পালিয়ে এসেছে।
তাই রোহিঙ্গা সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা করা যাচ্ছে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই ১১ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমান রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত আট লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। এর ওপর নতুন করে আরও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান করা সত্যিই দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের পক্ষে। এমতাবস্থায় স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে রোহিঙ্গারা তাহলে যাবে কোথায়?
এর আগে ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের অধিবেশনে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের জন্য মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মাঝে সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মিয়ানমার প্রতি সপ্তাহে ১৫০০ জন করে এবং দুই বছরের মধ্যে সব রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হলেও সেই অঙ্গীকার পালন করছে না উপরন্তু এখনো রোহিঙ্গা আগমন ঘটছে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত। চুক্তি সই করেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মিয়ানমার। এমনকি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য গঠিত কফি আনান কমিশন ৮৮টি সুপারিশ প্রস্তাব করে যা আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে পাঁচটি সুপারিশ প্রস্তাব করেন সেগুলোও বাস্তবায়িত হয়নি।
সর্বশেষ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব নিরাপত্তা পরিষদের বিবেচনার জন্য তিনটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এগুলো হলো- কফি আনান অ্যাডভাইজরি কমিশনের সুপারিশগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা পরিষদের পুনরায় কক্সবাজার ও রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত অসামরিক ‘সেফ জোন’ সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়ায় সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর ক্যাম্প রয়েছে। রোহিঙ্গাদের আগমনে এই এলাকার পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। তাই সবদিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ২০১৯ সালের এ প্রকল্পে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে ১ লাখ রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য শরণার্থীশিবির গড়ে তোলা হচ্ছে।
এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান। প্রাথমিকভাবে ২৩ হাজার রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করা হবে। কিন্তু ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর নিয়ে অনেকেই বিরূপ মন্তব্য করছেন। তাদের যুক্তি ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা হলে তারা আর কোনো দিনই মিয়ানমারে ফেরত যেতে চাইবে না। ভাসানচর কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র স্থায়ী এবং টেকসই সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে তাদের জন্মভূমিতে পুনরায় পুনর্বাসন করা।
এই প্রত্যাবাসন বিষয়ে জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত কারেন পিয়ার্স বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তারা অত্যন্ত হতাশ। শরণার্থীরা ফিরে যেতে স্বচ্ছন্দবোধ করবে, এমন পরিবেশ অবশ্যই সেখানে নিশ্চিত করতে হবে। বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের রাষ্ট্রদূত এ অধিবেশনে বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যেন নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং সম্মানজনক হয়, তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শর্ত ছাড়াই জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলকে রাখাইনে গিয়ে তদন্ত করতে দেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার কথাও তারা বলেন।
জাতিসংঘে চীনের উপ-রাষ্ট্রদূত উ হাইতাও বলেন, এটা একেবারেই মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়। সুতরাং তাদেরই এর সমাধান খুঁজে বের করার সুযোগ দিতে হবে। চীনের প্রতিনিধির এমন বক্তব্যের সঙ্গে রাশিয়ার দূত দিমিত্রি পলিয়ানস্কিও সহমত প্রকাশ করেন। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য যুক্তরাজ্য গত ডিসেম্বরে একটি প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করেছিল, যেখানে বলা হয়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমারকে একটি সময় বেঁধে দেওয়া হোক। কিন্তু রাশিয়া ও চীন ওই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা বর্জন করে। এ থেকে বোঝা যায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান খুব সহজে হবে না, কারণ মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিতে রাজি নয়। আবার জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার ভেটো প্রদানের ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধার সৃষ্টি করছে।
সুতরাং, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাশিয়া, চীন, ও ভারতকে পাশে পাওয়ায় বাংলা দশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মিত্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও কেন তাদের পাওয়া যাচ্ছে না তা খতিয়ে দেখা উচিত। কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করা এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ মিয়ানমারের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোহিঙ্গা সংকটে। ‘অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট’ শীর্ষক কমিশন (কফি আনান কমিশন) রিপোর্টের সুপারিশ মিয়ানমার বাস্তবায়ন করলেই রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে সহজ ও দ্রুত সমাধান নিশ্চিত হবে এবং পুনরায় তারা তাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পাবে মিয়ানমারে।
লেখক: গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।