বিরাটনগরে আসার পর থেকে পিঠ বাঁচানোর মোক্ষম একটা অস্ত্র খুঁজে নিয়েছেন বাংলাদেশের কোচরা। খারাপ কিছু হলেই তার দায় চাপাচ্ছেন মেয়েদের অনভিজ্ঞতা ও তারুণ্যে। এ যেন শেখানো বুলি। কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনও যা বলছেন, একই কথা শোনা যাচ্ছে অভিভাবক হয়ে আসা বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলির মুখেও।
গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ স্বাগতিকদের কাছে নাস্তানাবুদ হয়েছে ৩-০ ব্যবধানে। আর গতকাল ভারতের কাছে ৪-০ গোলে অসহায় আত্মসমর্পণে বিদায় নিয়েছে আসর থেকে। কোচরা মুখে উন্নতির বুলি আওড়ালেও এই মেয়েদের শীর্ষ পর্যায়ের জন্য তৈরি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ তারা। নেপাল আর ভারত ধারে-ভারে, ঐতিহ্যে, অভিজ্ঞতায় এগিয়ে থাকলেও তারা অনতিক্রম্য নয়। অন্তত কালকের প্রতিপক্ষ ভারত এমন কিছু নয় যে তাদের হারানো যেত না। কিন্তু ম্যাচের আগেই যে বাংলাদেশের মেয়েদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে একটাই ধারণা- ‘তোমরা বয়সে তরুণ, অভিজ্ঞতায় অনেকটা পিছিয়ে।’
মেয়েদের ভেতরে আত্মবিশ্বাসটা শেষ করে দিতে এ কথাগুলোই তো যথেষ্ট। তাই তো এই মেয়েরা এক গোল খেলেই স্নায়ুর চাপে পড়ে যায়। সেই চাপ থেকে বেরোনোর চেষ্টা করতে গিয়ে ভুলে যায় তাদের সহজাত খেলা। আর তাতেই তাদের পেয়ে বসে অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষরা। ছন্নছাড়া রক্ষণভাগ পেয়ে দ্রুতই জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে নেয় তারা।
দায়টা অনভিজ্ঞতা এবং তারুণ্যে চাপালেও নিজেদের ব্যর্থতা কি চেপে রাখতে পারবেন বাংলাদেশের কোচ আর ফুটবল সংগঠকরা? সাফের জন্য যতটুকু প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল, সেটা কি নিতে পেরেছে বাংলাদেশের মেয়েরা? দল এভাবে হেরে যাওয়ায় সামনে চলে আসছে প্রশ্নগুলো।
ভারত চলতি বছর সাফের প্রস্তুতি হিসেবে দেশ-বিদেশ ঘুরে খেলেছে ১১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। অভিজ্ঞদের ছেঁটে ফেলে তারাও এবার রেখেছে তারুণ্যে আস্থা। কিন্তু তাদের খেলায় ঠিকই দেখা গেছে পরিণতিবোধ। কোচের বেঁধে দেওয়া পরিকল্পনা পুঙ্খানুপুঙ্খ মেনে সাধারণ এ মেয়েরাই হয়ে উঠেছে অসাধারণ, দলকে তুলে নিয়েছে টানা পঞ্চম ফাইনালে। দুয়েকজন ছাড়া এই ভারতের বাকিরা সাধারণ মানের। অথচ এই পর্যায়ে খেলার প্রস্তুতি থাকায় তারা শুরুর চাপটা সামলে আক্রমণে গিয়েছে। পেয়েছে গোলের দেখা। গোল পাওয়ার পর তা ধরে রাখতে যা যা দরকার ছিল তার সবই করেছে ভারতের মেয়েরা।
আর বাংলাদেশের মেয়েরা এক গোলেই হারিয়ে ফেলেছে নিজেদের। হয়ে পড়েছে ছন্নছাড়া। তারা এই পর্যায়ে খেলার জন্য মোটেই তৈরি নয়। উপমহাদেশের সর্বোচ্চ আসরে খেলার আগে তারা যে একটিও প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়নি। বাফুফের কর্তাদের এ নিয়ে ছিল না কোনো মাথাব্যথা। তাদের কাছে বয়সভিত্তিক পর্যায়ের সস্তা সাফল্যই অনেক বড়।
এই দলের একঝাঁক ফুটবলার সম্প্রতি খেলেছে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাই পর্ব। সেটাকেই বড় প্রস্তুতি হিসেবে নিয়েছেন বাংলাদেশের কোচরা। তারা যেন ভুলেই গেছেন, বয়সভিত্তিক পর্যায় আর শীর্ষ পর্যায় কখনই এক হতে পারে না। বাংলাদেশের মেয়েরা শীর্ষ পর্যায়ে খেলার চাপটাই নিতে পারছে না।
ম্যাচ শেষে ভারতের কোচ মায়মুল রকি যেখানে প্রশংসা করলেন তারুণ্যের, সেখানে বাংলাদেশের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন হারের দায় দিলেন সেই তারুণ্যকেই। গড়গড়িয়ে শেখানো বুলিগুলোই যেন কাল আওড়ে গেছেন ছোটন, ‘আবার সেই নিজেদের ভুল থেকেই গোল খেয়ে আসলে ছন্নছাড়া হয়ে গেছি। আসলে ভারত অনেক পরিপক্ব দল। গোল খাওয়ার পর আমাদের মেয়েরা নার্ভাস হয়ে যায়। বয়স কম, অনভিজ্ঞতার কারণেই আসলে এই ভুলগুলো বারবার করছে তারা। এদের পরিণত হয়ে উঠতে আরও সময় দিতে হবে।’
ভারত কোচ মায়মুল রকি অবশ্য তরুণদের পারফরম্যান্সেই রাখছেন আস্থা, ‘আমাদের মেয়েদের গড় বয়স ২১ বছর ৪ মাস। বেশির ভাগ সিনিয়র খেলোয়াড় এই দল থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু যারা আছে, তারা ভালো করছে বলেই জয় পাচ্ছি। এই ম্যাচ নিয়ে আমার যা পরিকল্পনা ছিল সেটা মেয়েরা মাঠে বাস্তবায়ন করেছে।’
এটা ঠিক বাংলাদেশের মেয়েদের আরও সময় দিতে হবে। কিন্তু মূল দলকে অবহেলায় রেখে কেবল বয়সভিত্তিক দলগুলোকে গুরুত্ব দিলে কিন্তু এভাবেই পিছিয়ে থাকতে হবে ভারত-নেপালের কাছে।
