ডাকসু ও হল সংসদের দায়িত্ব গ্রহণ

প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্যের প্রস্তাবে ভিপি নুরের আপত্তি

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৯, ০২:৪৫ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্যরা দায়িত্ব নিয়েছেন। গতকাল শনিবার কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্যরা ডাকসু কার্যালয় এবং হল সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ হলে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে ডাকসু কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় সংসদের দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্য করার প্রস্তাব নিয়ে বিভক্তি দেখা দেয়। বৈঠকে ছাত্রলীগের প্যানেলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সদস্য করার জোরালো দাবি উঠলেও নবনির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর এর বিরোধিতা করেন।

সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে হলে অবৈধ ছাত্র থাকা, সিট দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ না থাকা এবং ক্যাম্পাসের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। এদিকে ডাকসুর কার্যকরী কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠান চলাকালে দুপুরে অনিয়মের অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচন এবং সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ পদেও নির্বাচনের দাবিতে ডাকসুর সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্র ফেডারেশন। সংগঠনটির ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পুনর্নির্বাচনের পাশাপাশি সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ পদেও নির্বাচন দাবি করছি।’ ছাত্রদলও সভা চলাকালীন মুখে কালো কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করে। মিছিলটি মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সভায় উপস্থিত একাধিক সদস্য জানান, ডাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলায় ডাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদের কার্যকরী সভা শুরু হয়। সভায় কেন্দ্রীয় সংসদের নির্বাচিত ২৫ সদস্য ছাড়াও উপাচার্য ও কেন্দ্রীয় সংসদের নব নিয়োগপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এতে সংবাদকর্মীদের প্রবেশের কোনো অনুমতি ছিল না।

সভায় সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) গোলাম রাব্বানী। এরপর মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর রাব্বানী কেন্দ্রীয় সংসদের সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই সময় সভাপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুমতি নেন জিএস। এক বছরের জন্য অনুমতি দেন উপাচার্য আখতারুজ্জামান।

দুপুর ১টা ২০ মিনিটে দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে ডাকসুর ফটকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠান সফলভাবে বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের সহায়তা দিয়েছেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। তাকে আজীবন সম্মাননা সদস্য দেওয়ার জন্য কার্যকরী পরিষদ দাবি উত্থাপন করে। পরবর্তী কার্যনির্বাহী সভায় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ডাকসুর গঠনতন্ত্র বলে, যেদিন প্রথম কার্যকরী সভা অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন থেকেই ৩৬৫ দিনের সেই শুভযাত্রাটি শুরু হলো। আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি ডাকসুর ভিপি, জিএস, এজিএসসহ প্রত্যেককেই।’

এর আগে দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আজীবন ডাকসু সম্মাননা সদস্য হিসেবে মনোনীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয় ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে। জিএস গোলাম রাব্বানী সভাপতির কাছে এই প্রস্তাব তুলে ধরেন। সভায় ভিপি নুরুল হক নুর ছাড়া অন্য সবাই প্রস্তাবটি সমর্থন করে।

এ বিষয়ে নুর সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অনেকেই নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তুলেছে। সে রকম একটি জায়গা থেকে আমি মনে করি না মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সদস্য পদ ঘোষণা করা উচিত এখানে। প্রধানমন্ত্রী একজন অত্যন্ত সম্মানের ব্যক্তি, তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধান। এখানে ডাকসুর আজীবন সম্মাননা পদ দেওয়া তার জন্য বড় কিছু নয়। আমরা কয়েকজন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছি।’

ওই সময় জিএস গোলাম রাব্বানী ভিপি নুরকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘কয়েকজন না, ভিপি শুধু নিজেই আপত্তি জানিয়েছেন।’

নুর আরও বলেন, ‘আমরা যখন দায়িত্ব নিচ্ছি, তখন আমাদের অনেক ভাইয়েরা বোনেরা এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে মিছিল করছে, পুনর্নির্বাচন দাবি করছে। আমি ভিপি হিসেবেও তাদের এই দাবি সমর্থন করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি অছাত্র ও বহিরাগতদের হল থেকে বের করে দেওয়ার দাবি তুলেছি। হল থেকে গণরুম, গেস্ট রুম পর্যন্ত মেধার ভিত্তিতে সিট দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপের বিষয়েও বলেছি।’

জিএস গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডাকসুর কেন্দ্রীয় গঠনতন্ত্রের ১৮ ধারা অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সম্মাননা সদস্য দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তাবনার পর সভাপতি সিদ্ধান্ত নেবেন। যেহেতু সভায় ২৫ জনের ২৪ জনেই সমর্থন দিয়েছে, সেহেতু আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ইতিবাচক রেজাল্ট পাব। স্যার আমাদের সে রকমই ইঙ্গিত দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাবিতে রিকশা ও সাইকেলের জন্য আলাদা লেইন তৈরি করা হবে। রিকশা ভাড়া নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। রিকশা ড্রাইভারদের আলাদা ড্রেস দেওয়া হবে। এ ছাড়া ভারী যানবাহন চলার বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ সময় রাব্বানি অভিযোগ করে বলেন, ‘ভিপি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বেশ কিছু ফাইল স্বাক্ষর করেছেন। এটি তিনি করতে পারেন না।’ এ বিষয়ে ডাকসুর ভিপি বলেন, ‘এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি দায়িত্ব না নিয়ে স্বাক্ষর করব কীভাবে।’

গতকাল সভা শেষে ডাকসুর সদস্যরা ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, শিখা চিরন্তন ও শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

গত ১১ মার্চ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের পর গতকাল এই মেয়াদের প্রথম কার্যকরী সভার মাধ্যমে দীর্ঘ ২৮ বছর পর আবারও যাত্রা শুরু করল ডাকসু। এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ২৫টি পদের ২৩টিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মনোনীত প্রার্থীরা জয়ী হন। বাকি দুটি পদের মধ্যে ভিপি পদে জয়লাভ করেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর এবং সমাজসেবা সম্পাদক হিসেবে জয়ী হন আকতার হোসেন। এ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্যরা পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত