‘মানুষকে কাঁদানোর ক্ষমতা ছিল শাহনাজের’

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৯, ০৭:২৬ পিএম

না ফেরার দেশে চলে গেছেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ। শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় বারিধারায় নিজের বাসায় শাহনাজ রহমতউল্লাহ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। বাদ জোহর বারিধারার পার্ক মসজিদে জানাজার পর রোববার দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে বনানীর সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর কবরস্থানে দাফন করা হয় এই শিল্পীকে।

শাহনাজ রহমতউল্লাহর স্বামী অবসরপ্রাপ্ত মেজর আবুল বাশার রহমতউল্লাহ এখন ব্যবসা করেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ে নাহিদ রহমতউল্লাহ থাকেন লন্ডনে, আর ছেলে এ কে এম সায়েফ রহমতউল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করে কানাডায় বসবাস করছেন।

এদিকে ৪৬ বছরের সঙ্গীকে হারিয়ে বিরহ কাতর স্বামী আবুল বাশার রহমতউল্লাহ বসে রইলেন স্ত্রীর কবরের পাশে। দীর্ঘদিনের সংসার, কত কথা, কত স্মৃতি, কত হাসি-কান্না, আবেগ-প্রেম জড়িয়ে আছে যে মানুষটির সঙ্গে- সে আজ নেই। প্রিয় মানুষকে কবর দেওয়ার পর এক বৃদ্ধের অসহায়ত্বের ছবি হাহাকার তৈরি করে আগত মুসল্লীদের মনেও।

স্ত্রীর বিয়োগ ব্যথা ‍বুকে নিয়েও তিনি কথা বললেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। মেজর (অব.) আবুল বাশার রহমতউল্লাহ বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকেন। তাদের আসতে সময় লাগবে। এ জন্য আর দেরি করা হয়নি। তারা এলে মায়ের দোয়া অনুষ্ঠানে অংশ নেবে। আপনার সবাই দোয়া করবেন আমার স্ত্রীর জন্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘শাহনাজ রহমতউল্লাহর রক্তে ছিল গান। গান গেয়ে মানুষকে কাঁদানোর ক্ষমতাও ছিল শাহনাজের। এ রকম ক্ষমতা খুব কম শিল্পীরই থাকে।’

উল্লেখ্য, বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতউল্লাহর গাওয়া গান চারটি স্থান পেয়েছে। গানগুলো হলো খান আতাউর রহমানের কথা ও সুরে ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথা ও আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ আর ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’। এ ছাড়া অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গানের শিল্পী তিনি। মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করেন। এরপর বহু চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। টেলিভিশনে গাইতে শুরু করেন ১৯৬৪ সাল থেকে। সত্তরের দশকে অনেক উর্দু গীত ও গজল গেয়েছেন শাহনাজ। উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নেন উস্তাদ ফুল মোহাম্মদের কাছে। এরপর উস্তাদ মনির হোসেন, গজল সম্রাট মেহেদী হাসান, শহীদ আলতাফ মাহমুদের কাছেও গানে তালিম নেন তিনি। ৫০ বছরের সংগীত জীবনে শাহনাজ রহমতউল্লাহর চারটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। সংগীতে অবদানের জন্য একুশে পদক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।

দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি তার গাওয়া ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘সাগরের তীর থেকে’, ‘খোলা জানালা’, ‘পারি না ভুলে যেতে’সহ অনেক গানই এখনো ঘুরে ফেরে মানুষের মুখে মুখে।

শাহনাজ রহমত উল্লাহর জন্ম ১৯৫২ সালের ২ জানুয়ারি, ঢাকায়। তার বাবা এম ফজলুল হক, মা আসিয়া হক। মায়ের কাছেই শাহনাজের গানের হাতেখড়ি। পরিবারের সবার কাছে তিনি ছিলেন আদরের শাহীন। ছোটবেলা থেকেই শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। তার ভাই প্রয়াত আনোয়ার পারভেজ ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক। আরেক ভাই জাফর ইকবাল ছিলেন জনপ্রিয় নায়ক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত