জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তৎপরতা

চিঠি চালাচালি ও সুপারিশে ব্যস্ত আইনি লড়াইয়ে আগ্রহ কম

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ০১:২৮ এএম

মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ থাকলেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সে পথ তেমন একটা মাড়ায় না। গত দুই বছরে কমিশন যেসব ঘটনা নিষ্পত্তি করেছে তার মধ্যে খুব স্বল্পসংখ্যক ঘটনার জন্য মামলা করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কমিশন চাইলেই ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি পথে যেতে পারে। সম্প্রতি হাইকোর্টও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশন শুধু তদন্ত, প্রতিবেদন, সুপারিশ ও চিঠি চালাচালিতে ব্যস্ত থাকে বলে উষ্মা প্রকাশ করে। তবে মানবাধিকার রক্ষায় গঠিত সাংবিধানিক সংস্থাটি বলছে, মামলার বিষয়টি বাধ্যতামূলক না হওয়ায় এবং বাজেট সীমিত হওয়ায় মূল কাজের বাইরে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে মামলা করা হয়।

২০১৩ সালে মিরপুরের এক বাসায় গৃহকর্মী খাদিজাকে (১২) গরম ইস্ত্রির ছ্যাঁকা দিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় মানবাধিকার কমিশন প্রতিবেদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ২৮ বার সুপারিশ ও তাগিদপত্র পাঠালেও সাড়া পায়নি। প্রতিকার পেতে চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশন (সিসিবি) গত বছরের ২২ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। গত ৬ মার্চ স্বরাষ্ট্র সচিব ও কমিশনের প্রতি জারি করা রুলের শুনানির দিন কমিশনের পক্ষে কোনো আইনজীবী তো ছিলেনই না উপরন্তু রুলের জবাবও দেয়নি কমিশন। আইনে বিধান থাকার পরও ভুক্তভোগীদের পক্ষে কমিশন কেন আদালতে আসে না এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় শুধু তদন্ত, প্রতিবেদন, সুপারিশ ও চিঠি চালাচালিতে কেন সীমাবদ্ধ থাকে সে প্রশ্ন তুলে ওইদিন আদালত উষ্মা প্রকাশ করে।

সিসিবির সভাপতি ব্যারিস্টার আব্দুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খাদিজা নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শুধু তাগিদপত্র দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। অথচ তারা চাইলেই উচ্চ আদালতে এসে খুব দ্রুততম সময়ে এ বিষয়ে প্রতিকার পেতে পারত। ওই নির্যাতিতাও বিচার পেত।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশনের যা করা উচিত, অনেক ক্ষেত্রেই তা করছে না। তাদের কাজও খুব একটা দৃশ্যমান নয়। ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের যদি কোনো সীমাবদ্ধতা থেকেই থাকে তাহলে আদালতের দ্বারস্থ হলেই পারে। এটা যেমন তাদের জন্য সুযোগ তেমনি দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কমিশন তাদের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করুক এটাই আমরা চাই।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে আসা ৬৪৪টি অভিযোগের মধ্যে ৩৫৬টি এবং ২০১৮ সালে ৭৩৫টি অভিযোগের মধ্যে ৫৫৯টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে কমিশন। এসব নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগের সিংহভাগ তদন্ত, প্রতিবেদন দাখিল ও সংশ্লিষ্ট দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে চিঠি বা সুপারিশ পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভুক্তভোগীদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য ২০১৭ সালের মে মাসে সারা দেশে ১০০ সদস্যের একটি আইনজীবী প্যানেল গঠন করে কমিশন। দুই বছরে এই প্যানেলের সদস্যরা ২৫টির বেশি মামলা আদালতে নিতে পারেননি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের ১২ (দ) ধারায় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তিকে আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগের তদন্ত-পরবর্তী সময়ের কার্যাবলিতে কমিশন চাইলে এই আইনের ১৯ (খ) ধারা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পক্ষে বা কমিশন নিজেই আবেদন করতে পারবে বলে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া আইনের ১৯ (৬) ধারায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলা বা আইনগত কার্যধারায় পক্ষ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার কমিশনের থাকবে বলা হয়েছে।

কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারহানা সাঈদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিরপরাধ জাহালমের কারাবাস, বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষণের মামলা, র‌্যাবের গুলিতে লিমনের পা হারানো, গাজীপুরের শ্রীপুরে ধর্ষণচেষ্টার বিচার না পেয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে বাবা-মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনা এবং সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলায় নিরীহ একজনকে আসামি করার ঘটনায় কমিশন আইনজীবী প্যানেল নিয়োগ দিয়ে লড়াই করেছে। তবে কয়েক বছরে এ ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়া মামলার সংখ্যা ২০ থেকে ২৫টির বেশি হবে না।

জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে কেউ চাইলে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। কিন্তু আমাদের মূল কাজ মামলা করা নয়, অভিযোগের তদন্ত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে সুপারিশ করা। আর সব অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা দেওয়া বা মামলা করাও সম্ভব নয়। এ কাজটি করবে রাষ্ট্র। ক্ষেত্রবিশেষে গুরুতর অভিযোগ এবং যারা অসচ্ছল ও অসহায় তাদেরকে আমরা আইনি সহায়তা দিই। কিন্তু আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তেমনি ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দিতে বাজেটের ঘাটতিও রয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত