অতিসম্প্রতি, ২০১৯ সালের ৪ মার্চ এক রিট আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বলে, ‘এটি আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক যে, স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর পরও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আমরা এখনো যাচাই-বাছাই করে চলেছি যে তারা শ্রেষ্ঠজনক কিনা!’ সত্যিই তো এটা একটি জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার। কিন্তু কেন এই যাচাই-বাছাই? কেননা, এর একটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছেন বাঙালি জাতির সূর্যসন্তান। আমাদের সমাজে যদি একজন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ও বর্তমান থাকে আর তারা যদি একজন মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দাবি করে, তবে সেটা হবে আমাদের দেশ ও জাতির সঙ্গে প্রতারণাÑ সব শহীদের সঙ্গে প্রতারণা। সুতরাং আমাদের সমাজে কোনো ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ থাকতে পারবে না! তারা দণ্ডনীয় অপরাধে অপরাধী। আর তাই এবারের দাবি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, বিএনপির আমলে প্রায় ২২ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে সাড়ে এগারো হাজার মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থান পেয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, মহান মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পরও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা থাকার অভিযোগ কেন পাওয়া যাচ্ছে? এটার জন্য কে দায়ী? দায়ী হচ্ছে আমাদের প্রক্রিয়া। মুক্তিযোদ্ধা নিবন্ধীকরণের বা অন্তর্ভুক্তিকরণের যে প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়া এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটির সংজ্ঞায়ন ১২ বার করা হয়েছে। সর্বশেষ কয়েক দিন আগেও করা হলো। প্রশ্ন হলো, আমরা এতবার কেন মুক্তিযোদ্ধা শব্দটির সংজ্ঞায়ন করছি? ১৯৭২ সালে কিন্তু একটি অর্ডারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নিজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়ন করেছেন। ‘সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা’ থাকতে পারে। অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু সবাইকে এক কাতারে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে ফেলা তো মেনে নেওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতি ও কালের প্রয়োজনে বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা খেতাব আমরা চেয়েছি। তারাও কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু এই যে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটির সংজ্ঞায়ন নিয়ে আমরা ১২ দফা পার হলাম, এর ফলে মুক্তিযোদ্ধা শব্দটির বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা নিজেরা নিজেদের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা শনাক্ত করছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কাউকে সার্টিফিকেট দিলেই তিনি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছেন এবং নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া। এর ফলে দুর্নীতির সুযোগ থেকে যাচ্ছে এবং প্রক্রিয়াটি মোটেও স্বচ্ছ নয়। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব থাকারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নিয়ে একটা শ্রেণি বাণিজ্যিকীকরণ করছে এবং আমরাই সেই সুযোগ দিচ্ছি। এ রকম উদাহরণের শেষ নেই। গণমাধ্যমের বরাতে আমরা জানতে পেরেছি, গাজীপুরে প্রকাশ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট বেচাকেনা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভুক্তভোগী একজন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীকে একাত্তর টেলিভিশনের লাইভ প্রোগ্রামে ফোন করে বলেছেন, ‘স্যার যদি এভাবে চলে তাহলে আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় যাব?’ কী লজ্জাজনক ব্যাপার! স্বাধীনতার এত বছর পর এসেও আমাদের জাতি হিসেবে এসব জঞ্জাল সামলাতে হচ্ছে!
আমাদের দণ্ডবিধির ৪১৬ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি অন্যের রূপ ধারণ করে প্রতারণা করে, তবে তা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে অন্য কোনো ব্যক্তি বলে প্রতারণা করে অথবা জ্ঞাতসারে কোনো ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তি বলে চালিয়ে প্রতারণা করে অথবা নিজেকে বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে সে নিজে বা সে ব্যক্তি অন্য যে ব্যক্তি নয়, সে ব্যক্তি বলে চালিয়ে প্রতারণা করে, তবে ওই ব্যক্তি অপরের রূপ ধারণ করে প্রতারণা করেছে বলে গণ্য হবে।’ দণ্ডবিধির ৪১৯ ধারা অনুযায়ী এ অপরাধীর কমপক্ষে তিন বছর জেল হওয়ার বিধান রয়েছে। তাহলে কেউ যদি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দেয়, তবে তা দণ্ডবিধির ৪১৬ ধারা অনুযায়ী একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং দণ্ডবিধির ৪১৬ ধারা অনুযায়ী এই অপরাধীর কমপক্ষে তিন বছর জেল হওয়ার বিধান রয়েছে।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু আমাদের দণ্ডবিধি অনুযায়ী জালিয়াতির অপরাধও সম্পাদন করছে। দণ্ডবিধির ৪৬৩ ধারা অনুযায়ী, ‘কোনো ব্যক্তি যদি জনসাধারণের কিংবা কোনো ব্যক্তিবিশেষের ক্ষতির জন্য অথবা কোনো দাবি বা স্বত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে অথবা কোনো ব্যক্তিকে তার সম্পত্তি ত্যাগে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে অথবা কোনো প্রকাশ্য বা অনুক্ত চুক্তি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে অথবা কোনো প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে বা যাতে প্রতারণা সংঘটিত হতে পারে, এরূপ অভিপ্রায়ে, কোনো মিথ্যা দলিল কিংবা দলিলের অংশবিশেষ প্রণয়ন করে, তবে উক্ত ব্যক্তি জালিয়াতি করেছে বলে পরিগণিত হবে।’ আবার দণ্ডবিধির ৪৭১ ধারা অনুযায়ী, ‘কোনো ব্যক্তি যদি প্রতারণামূলকভাবে বা অসাধুভাবে এমন একটি দলিলকে খাঁটি দলিল হিসেবে ব্যবহার করে, যে দলিলটি একটি জাল দলিল বলে সে জানে অথবা বিশ্বাস করে অথবা বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে, তবে সে ব্যক্তি যেন সে নিজে দলিলটি জাল করেছে, এমনভাবে দণ্ডিত হবে।’ দণ্ডবিধির ৪৬৫ ধারা অনুযায়ী এ অপরাধীদের কমপক্ষে দুই বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম অথবা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
এখন কথা হলো, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা মূলত নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করে একটি ভুয়া সনদের মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে প্রতারণা ও জালিয়াতি করছে। প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে যদি কোনো কাজ করা হয়, সেটা তো প্রতারণাইÑ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট প্রদর্শন করে কোনো ব্যক্তি যদি ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেয়Ñ তার মানে ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি চুরি করছে। রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তাহলে তাকে কেন ফৌজদারি আইনের আওতায় আনা হবে না? এ ছাড়া, দণ্ডবিধির ১৯৮ ধারা অনুযায়ী, ‘কোনো ব্যক্তি যদি কোনো সার্টিফিকেট বাস্তব গুরুত্বপূর্ণ কোনো দিক থেকে মিথ্যা বলে জানা সত্ত্বেও দুর্নীতিমূলকভাবে তাকে সত্য বা খাঁটি সার্টিফিকেট হিসেবে ব্যবহার করে বা করার চেষ্টা করে, তবে সে ব্যক্তি স্বয়ং মিথ্যা সাক্ষ্য দান করলে যেভাবে দণ্ডিত হতো, এ ক্ষেত্রেও সে সেভাবে দণ্ডিত হবে।’ এবার, দণ্ডবিধির ১৯৩ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা সার্টিফিকেট দিয়ে কেউ অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করলে তার তিন থেকে সাত বছরের জেল হতে পারে। মনে রাখতে হবে, দণ্ডবিধি আইন, এমনকি সাংবিধানিক আইনের অধীনেও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। যেমন : একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তার অধিকার হরণ হচ্ছে বলে উচ্চ আদালতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে রিট মামলা করতেই পারেন। আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১-এ বলা আছে, বাংলাদেশের নাগরিকের মৌলিক অধিকারের একটি হচ্ছে তার সুনাম ক্ষুণœ না হওয়া। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কারণে যেহেতু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানহানি হচ্ছে, তাহলে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে রিট মামলা উচ্চ আদালতে চলতেই পারে। আরও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, যারা মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও প্রতারণা করছে, তাদের সন্তানরা সব ক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে, যে পরিবারগুলোতে শহীদ হয়েছেন, সে পরিবারগুলো ওঠে আসতে পারেনি। এটা তো সত্য, অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আজ রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। যারা একসময় অস্ত্র হাতে অনিশ্চয়তার পথে যুদ্ধ করেছিলেন, তাদের অনেকে এখন ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের জন্য আমরা কিছু করতে পারিনি। সেখানে যদি একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বা তার পরিবার সুযোগ-সুবিধা নেয়, তা কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা অন্তর্ভুক্তিতে যারা সহযোগিতা করেছেন, তারা কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সবাই সমান। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তাহলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে যারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন, তারা অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনের মাধ্যমে সেটা সম্ভব। মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটা যদি স্বচ্ছ রাখতে হয়, সে ক্ষেত্রে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে সে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারে। মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম হতে হবে প্রকাশ্য। সাংবাদিকরা চাইলে বসে শুনবেন। বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আপত্তি উপস্থাপন করতে পারবেন। আমাদের দেশে কত বিষয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই করার মতো একটি জাতীয় সংবেদনশীল বিষয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি তোলা কি আমার পক্ষে খুব বেশি কিছু চাওয়া?
