ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি নুরুল হক নুর বলেছেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও ছাত্রদের ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ (আমরা ন্যায়বিচার চাই) প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো রাষ্ট্রের দুঃশাসনের প্রতিচ্ছবি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঢাকার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তিনি এ কথা বলেন। নুর বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামের অগ্রভাগে ছিল এই দেশের
ছাত্ররা। যেই ছাত্ররা এই দেশকে স্বাধীন করেছে, সেই ছাত্রদের আজকে ২০১৯ সালেও ‘‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হয়। এটি আমাদের রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় যে দুঃশাসন চলে, তারই একটি প্রতিচ্ছবি।’
রাজনীতিকদের উদ্দেশে ডাকসুর ভিপি বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের অনেক ভুল রয়েছে। তাদের ভুলের কারণেই আজকে আমরা এতটা পিছিয়ে রয়েছি। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে তরুণ সমাজ প্রতিবাদী চেতনা ধারণ করেছে। তারা ‘‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মাধ্যমে তারা রাজনীতিবিদদের একটি বার্তা দিচ্ছে যে, আমরা ইতিবাচক রাজনীতি চাই; আমরা দেশের কল্যাণের জন্য রাজনীতি চাই। আশা করি সেটি তারা আমলে নেবেন।’
‘স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কের’ সমালোচনা করে ভিপি নুর বলেন, ‘আমরা চাই না স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে এসে আমাদের বিতর্ক করতে হবে, কে স্বাধীনতার ঘোষক, কে ঘোষক নন। এ ধরনের রাজনৈতিক নোংরামি আমরা তরুণ সমাজ দেখতে চাই না। আমরা একটি সুস্থ ধারার রাজনীতি দেখতে চাই, যে রাজনীতি হবে দেশ ও মানুষের কল্যাণের জন্য।’
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা যারা বলেন, তারা যেন সেটা মনেপ্রাণে ধারণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের যে চার মূলনীতি সেগুলোর চেতনা যেন তারা ধারণ করে। সেটি যেন এ দেশের পাঠ্যপুস্তকে থাকে। তরুণ সমাজকে যেন এগুলো প্রভাবিত করে।’
দেশে গণতন্ত্রের পরিস্থিতি নিয়ে নুর বলেন, ‘নব্বইয়ের পর থেকে বা দেশ স্বাধীনের পর থেকেই যারা আমাদের শাসন করেছেন, তারা এক ধরনের গণতন্ত্রের মুখোশ পরে শাসন করেছেন। তারা বারবার গণতন্ত্রকে শৃঙ্খলবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এ দেশের তরুণ ছাত্রসমাজ সেটা হতে দেয়নি। যারা দেশ চালান, তাদের প্রতি প্রত্যাশা থাকবে তারা যেন আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে যান।’
বেলা পৌনে ১১টার দিকে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের পক্ষ থেকে শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। ওই সময় নুরুল হকের সঙ্গে সংগঠনের যুগ্ম-আহ্বায়ক রাশেদ খান ও ফারুক খানসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ফরমায়েশি বিরোধী দল চান না ইনু : স্মৃতিসৌধে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ শেষে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিরোধী দল করার নামে রাজাকার, বিএনপি-জামায়াতকে জামাই আদর করে সংসদে বা রাজনীতিতে টিকিয়ে রাখতে হবে, এটা আমি ঠিক মনে করি না। ঠিক তেমনি ফরমায়েশি বিরোধী দলও রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। আজকের বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দুর্নীতি, দলবাজি, প্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহার ও বৈষম্য দূর করা।’
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, শেখ হাসিনা এবং মহাজোট সরকারের নেতৃত্বে দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে। স্বাধীনতার এত বছর পর আমরা চড়াই-উতরাই পার করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক শক্তি জেঁকে বসে। তবে তাদেরকে আমরা কোণঠাসা করতে সক্ষম হয়েছি।’
গণতন্ত্রের ‘নতুন’ সংজ্ঞা দিলেন জবি উপাচার্য : স্মৃতিসৌধে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ শেষে সাংবাদিকদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনীতির যেই পুরোনো সংজ্ঞা, রাজনীতি মানেই হচ্ছে রাজপথে মিছিল করতে হবে, অবরোধ ডাকতে হবে, হরতাল করতে হবে। আমি মনে করি সেই রাজনীতির দিন শেষ হয়ে গেছে।’
মিজানুর রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্র চর্চা বলতে শুধু ভোট দেওয়াকে বোঝায় না। এটা গণতন্ত্রের একটা অনুষঙ্গ মাত্র। সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যদি জনগণ অংশগ্রহণ করতে পারে এবং সেই সুযোগ তৈরি করা হয়, আমি মনে করি সেটাই হবে সত্যিকারের গণতন্ত্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘সনাতন যেই গণতন্ত্র, মিছিলের গণতন্ত্র, সমাবেশের গণতন্ত্র, লক্ষ লক্ষ মানুষ জড়ো করার গণতন্ত্র, এটার দিন শেষ হয়ে গেছে। এটা আর কখনো বাংলাদেশে ফিরে আসবে না। দেশের মানুষের এখন আর অত সময় নাই। মিছিল, হরতাল, অবরোধ করার জন্য মানুষ আর এখন পাওয়া যাবে না।’
