এরশাদ ধাঁধায় জাপা

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৯, ০২:৪৩ এএম

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে নিয়ে গোলকধাঁধায় জাতীয় পার্টি (জাপা)। দলের চেয়ারম্যান কখন কী করেন, এ নিয়ে সব সময়ই আতঙ্কে থাকেন। কখন কী কারণে কার ওপর সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হন, তা এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না দলের অনেক সিনিয়র নেতাও। বুঝতে পারেন না মতিগতি।

বিশেষ করে, গত শুক্রবার মধ্যরাতে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে প্রথমে কো-চেয়ারম্যান ও ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পরদিন সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনায় সবকিছুই ‘ধোঁয়া ধোঁয়া’ লাগছে নেতাদের কাছে। এর মধ্যে দলের কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদকে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। শূন্য কো-চেয়ারম্যানের পদ। বাদ পড়তে পারেন মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাÑ এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। এসব নিয়ে দলের নেতাদের মধ্যে ভয়ও কাজ করছে। বহিষ্কার হওয়ার ভয়ে মুখ খুলছেন না দলের নেতারা। গত সোমবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘আমিও ভয়ে আছি। কখন চিঠি পাই।’  তবে জি এম কাদেরকে হঠাৎ করেই দুই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনায় তৃণমূল জাপা ভীষণ ক্ষুব্ধ। গত বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে আগামী সাত দিনের মধ্যে জি এম কাদেরকে স্বপদে  (কো-চেয়ারম্যান) না ফেরালে পার্টি থেকে গণপদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন রংপুর বিভাগের মহানগর জেলা, পৌরসভা ও উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ। দাবি পূরণ না হলে ভবিষ্যতে রংপুর বিভাগে পার্টির সব কর্মকা- প্রতিহত করার ঘোষণাও দেন তারা। 

এ ব্যাপারে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রংপুর মহানগর সভাপতি ও সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘জি এম কাদের স্বচ্ছ ইমেজের নেতা। দল বা রাজনীতি ঘিরে তার কোনো ব্যক্তিস্বার্থ নেই। এমন নেতার ব্যাপারে দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত আমরা মানি না। দলের একটি কুচক্রী মহল চেয়ারম্যানকে এ ব্যাপারে ভুল বুঝিয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পার্টির দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, জি এম কাদেরের ঘটনায় কেন্দ্রীয় জাপাও ক্ষুব্ধ। কেন্দ্রের অনেক নেতা নিজেদের দলের কর্মকা- থেকে নিষ্ক্রিয় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। অনেকে ইতিমধ্যেই চেয়ারম্যানের বিভিন্ন কর্মকা-ের সমালোচনা করতে শুরু করেছেন। এ ঘটনাসহ দলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে গত চার দিনে এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন অন্তত শীর্ষ ১০ নেতা। এরশাদ তাদের কারোর সঙ্গেই দেখা করেননি।

এ ব্যাপারে জি এম কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছে এখনো বিষয়টি অবিশ^াস্য লাগছে। কারণ অব্যাহতির আগের দিনও তিনি আমার কাজের প্রশংসা করলেন। ভালোভাবে কাজ করতে বললেন। রাতে অব্যাহতি পত্র পাঠালেন। কেন করলেন, কী কারণে, ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে আমি দলের জন্য কাজ করে যাব। সংসদে ও এলাকায় কাজ করব।’  

এ ব্যাপারে দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি জি এম কাদেরের ঘটনার বিষয়ে চেয়ারম্যান স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, এটা আমাদের দুই ভাইয়ের ঘটনা। তুমি এর মধ্যে এসো না।’ তবে জি এম কাদের ও তিনি এখন পর্যন্ত এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি বলেও জানান রাঙ্গা।

কারও সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে বিভিন্ন সময়ে এরশাদের নেওয়ার বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে ভালো চোখে দেখছেন না সভাপতিম-লীর দুজন। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানকে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ঠিকই; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি যখন যা ইচ্ছে তা-ই করবেন। অবশ্যই তাকে দলের কথা ভাবতে হবে। জি এম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করার পর দল যখন কিছুটা গুছিয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই তিনি আবার সিদ্ধান্ত বদলালেন। এতে দলের ক্ষতি হয়ে গেল। এভাবে একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে দল এখনো দাঁড়াতেই পারল না।

এ ব্যাপারে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও যুবসংহতির সভাপতি আলমগীর শিকদার লোটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান স্যারের সিদ্ধান্ত অবশ্যই শিরোধার্য। কিন্তু দলে নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা না থাকলে ‘চেইন অব কমান্ড’ থাকে না। কেউ কাউকে মানতে চায় না। কারও প্রতি কারও শ্রদ্ধাবোধ থাকে না। হাইকমান্ডের সঙ্গে নেতাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দল ঠিকমতো চলতে পারে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের দুই যুগ্ম মহাসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান একেক সময় একেক কথা বলেন। উনি যে কার কথায় কখন কী করেন, তা এখনো বুঝতে পারলাম না। তার কারণেই দল দাঁড়াতে পারছে না। আমরাও কাজ করতে পারছি না। কখনোই দলের নেতাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে শুনিনি। এভাবে দল চলে না।’

অবশ্য জি এম কাদেরের ঘটনাও এরশাদের আরেক ‘নাটক’ বলে মনে করছেন দলের শীর্ষ নেতারা। এরশাদ ও রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছে ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছে, সন্দেহ হচ্ছে। আমার মনে হয়, দলের যে পক্ষের চাপে স্যার এটা করেছেন, তাদের কাছে জি এম কাদেরের দলে জনপ্রিয়তা ও শক্তির পরীক্ষার প্রমাণ দিতে চান। বিশেষ করে রওশন এরশাদের পাল্টা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই এরশাদ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

‘তবে এমন ঘটনা অসম্মানজনক’ বলে মনে করছেন ভাইস চেয়ারম্যান আলমগীর শিকদার লোটন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা আমার ক্ষেত্রেও হতে পারে। তার চেয়ে ভালো, দূরে সরে থাকা। দল আমাকে অনেক দিয়েছে। আর কিছু চাই না।’

এরশাদের এমন অস্থিরতা ও বারবার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘ ৩০ বছরেও দল নতুন নেতৃত্ব পেল না বলে মনে করছেন দলের শীর্ষ নেতারা। তাদের মতে, এরশাদ সরকারের সময়ে যারা মন্ত্রী ছিলেন, ক্ষমতাধর ছিলেন, এখনো এরশাদ সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। তারা এখনো এরশাদকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের কথাই শুনছেন। ’৯০ সালের পর জি এম কাদের ও মশিউর রহমান রঙ্গাসহ দু-তিনজন ছাড়া নতুন কোনো নেতৃত্ব তৈরি হয়নি। এখন এরশাদ ও দল রীতিমতো হাস্যকর হয়ে উঠেছে। এখানে বহিষ্কার ও বহাল হতে সময় লাগে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত