সিলেট মদন মোহন কলেজের ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক সাইফুর রহমানকে (৩০) খুন করার দায় স্বীকার করেছেন এমসি কলেজের ছাত্রী নিশাত তাসনিম রুপা (২০) ও তার প্রেমিক, একই কলেজের ছাত্র মোজাম্মিল হোসেন।
সোমবার সিলেট মহানগর হাকিম তৃতীয় আদালতে তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালতের বিচারক সাইফুর রহমান তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন।
আদালত ও পুলিশসূত্র জানায়, ‘জবানবন্দিতে রুপা বলেছে, কলেজ শিক্ষক সাইফুর রহমান তাদের বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসাবে থাকতেন। এই সুবাদে তিনি রুপার সঙ্গে প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কিন্তু সম্পর্কটি রুপা আর চালিয়ে যেতে চান নি। সম্প্রতি এমসি কলেজেরই আরেক ছাত্র মোজাম্মিলের সঙ্গে রুপার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।’
‘অন্যদিকে কিছুদিন আগে সাইফুর রহমান লজিং বাড়ি (রুপাদের বাড়ি) ছেড়ে নগরীর টিলাগড়ে একটি মেসে ওঠেন। কিন্তু রুপার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক চালিয়ে যেতে তিনি বিভিন্নভাবে চাপ অব্যাহত রাখেন। এই অবস্থায় রুপা সাইফুর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা করে।’
জবানবন্দিতে রুপা জানিয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী রুপা গত শনিবার সাইফুর রহমানকে এমসি কলেজে ডেকে আনেন। এরপর ক্যাম্পাসে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করেন। নিজ বাড়ি থেকে নিয়ে আসা বিষ মেশানো সেমাই খেতে দেন সাইফুরকে। সেমাই খেয়ে সাইফুর কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নিয়ে নগরীর সোবহানীঘাটের হোটেল মেহেরপুরে চলে যান। হোটেল কক্ষে গিয়ে ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে সাইফুরকে হত্যা করেন রুপা। এরপর সেখানে আসেন রুপার প্রেমিক মোজাম্মিল হোসেন। রুপা ও মোজাম্মিল মিলে সাইফুরের লাশ একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে দক্ষিণ সুরমার তেলিরাই এলাকায় নিয়ে সড়কের পাশে ফেলে দেন। সাইফুরকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় রুপা ও মোজাম্মিল হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানায়, ‘সাইফুর গুরুতর অসুস্থ, তাই তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি।’
জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালতের নির্দেশে রুপা ও মোজাম্মিলকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে প্রভাষক সাইফুর রহমান হত্যার বিচার দাবিতে সোমবার সিলেট মদন মোহন কলেজ ও সিলেট এমসি কলেজে মানববন্ধন করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফলতইল সগাম গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে সাইফুর রহমান মদন মোহন কলেজে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। তিনি সিলেট এমসি কলেজে লেখাপড়া করেছেন।
সাইফুর রহমান শাহপরান এলাকার খিদিরপুর গ্রামের শফিকুর রহমানের বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসাবে দীর্ঘ দিন ছিলেন। ওই সময় শফিকুর রহমানের মেয়ে রুপার সঙ্গে তার প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিছুদিন আগে সাইফুর রহমান লজিং বাড়ি ছেড়ে টিলাগড়ে একটি মেসে ওঠেন।
গত শনিবার তিনি মেস থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন। পরদিন রবিবার দক্ষিণ সুরমার একটি সড়কের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ রবিবার রাতেই অভিযান চালিয়ে নিজ বাড়ি থেকে রুপাকে এবং টিলাগড়ের একটি মেস থেকে রুপার প্রেমিক মোজাম্মিল হোসেনকে আটক করে। আটক মোজাম্মিলের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার আলমপুর গ্রামে। তিনি টিলাগড়ে মেসে থেকে এমসি কলেজে পড়েন।
সাইফুর রহমান খুনের ঘটনায় তার মা রনিফা বেগম বাদি হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের নামে সোমবার দক্ষিণ সুরমা থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি খায়রুল ফজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রুপা ও মোজাম্মিলকে আটকের পর তারা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেও সাইফুর রহমান হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তাদেরকে আদালতে হাজির করা হলে সেখানে তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।’
আদালতে রুপার দেওয়া জবানবন্দি উদ্ধৃত করে ওসি আরো জানান, শারীরিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে সাইফুর রহমান রুপাকে চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এ কারণেই পরিকল্পনা করে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
সাইফুর রহমানের মায়ের দায়ের করা মামলায় রুপা ও মোজাম্মিলকে আসামি করা হয়েছে।
