কিশোরগঞ্জে ১৬ সিনেমা হল বন্ধ, মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন শতাধিক কর্মী

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৯, ১০:৪০ পিএম

দিন যত যাচ্ছে ততই ধ্বসে পড়ছে সিনেমা ব্যবসা। এদিকে হল মালিকরা ঘোষণা দিয়েছেন ১২ এপ্রিল থেকে বন্ধ করে দেবেন সকল সিনেমা হল। এমন পরিস্থিতিতে জানা গেল কিশোরগঞ্জের সিনেমা হলের করুণ চিত্র। কিশোরগঞ্জের ১১টি উপজেলায় এক সময় ২৫টি হল ছিল। প্রত্যেকটা হলই এক অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ব্যবসা করত। ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ১৬টি। কিন্তু কেন বন্ধ হয়ে গেল কিশোরগঞ্জের হলগুলো? দেশ রূপান্তরকে তার সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জের একাধিক সিনেমা হল মালিক, কর্মচারী ও দর্শকরা।

সিনেমা হল মালিকরা জানান, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা কিশোরগঞ্জে এক সময় বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল সিনেমা। কালের বিবর্তন আর সময়ের চাহিদার কাছে আজ হার মানতে বসেছে সেই মাধ্যম। ফলে একের পর এক বন্ধ হতে হতে জেলার ২৫টি সিনেমা হলের মধ্যে ১৬টিই বন্ধ হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে অশ্লীলতার কারণে মধ্যবিত্ত দর্শক হল বিমুখ হতে থাকে। এ অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি দুই দশকে। দর্শক সংকটে লোকসান গুনতে থাকেন হল মালিকরা। এখন জেলার ২৫টি সিনেমা হলের মধ্যে ৯টি চালু আছে। আবার চালু হলগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে নিয়মিত প্রদর্শনী হয় না। বন্ধ হলগুলোর মধ্যে রয়েছে জেলা শহরের ইউনিভার্সেল টকিজ, সদরের পুলের ঘাট বাজারে রাখি টকিজ, করিমগঞ্জে সংগীতা ও আঁখি, ভৈরবে পলাশ ও ছবিঘর, বাজিতপুরের সরারচরে শান্তি মহল ও আশা, হোসেনপুরে সখী সিনেমা হল, কটিয়াদিতে কথাচিত্র, পাকুন্দিয়ায় মৌসুমী, ফালগুণী ও সুমন সিনেমা হল এবং তাড়াইলের কেয়া,  সৈকত ও কুলিয়ারচরের আনন্দ সিনেমা হল। অনিয়মিতভাবে প্রদর্শনী চলে জেলা শহরের রংমহল টকিজ সিনেমা হল।

বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলের স্থানে গড়ে উঠছে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা। এ ছাড়া টিকে থাকা হলগুলোর সমস্যার শেষ নেই। জেলার শহরে নিয়মিত চালু থাকা একমাত্র হল রথখোলার মানসী। হলটির মালিক বিনতী রায় পাখি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিনেমার গুণগত মান, অশ্লীল দৃশ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির কারণে কেউ সিনেমা হলে আসতে চায় না। প্রতি শোতেই আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। কিভাবে যে সিনেমা হল টিকিয়ে রাখব বুঝে উঠতে পারছি না।’

সম্প্রতি মানসী সিনেমায় ছবি দেখতে আসা মামুন মিয়া, কাইরুল মিয়া, কণা আক্তার, বিলকিস আক্তারসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা অভিযোগ করেন, দর্শক এখন রুচিশীল। কিন্তু হলগুলোর যন্ত্রপাতিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। নেই ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম, পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা আর অশ্লীল কাটপিস সিনেমাই বেশি প্রদর্শন করা হয়। যা পরিবার নিয়ে দেখার মতো নয়। আবার মানসম্মত চলচ্চিত্রও নির্মাণ হচ্ছে না। এ সব কারণেই হল দর্শকশূন্য।

শহরের প্রাণকেন্দ্র গৌরাঙ্গ বাজারের রংমহল টকিজ সিনেমা হলটি একনামে পরিচিত ছিল। বন্ধ হওয়ার পথে হলটির ম্যানেজার সন্তোষ কুমার বলেন, ‘মূলত দক্ষ নায়ক-নায়িকা সংকটের কারণে সিনেমা হলে দর্শকরা আসেন না। বর্তমানে কিশোরগঞ্জে নায়ক সাইমন সাদিক, পরীমণি ও অপু বিশ্বাস ছাড়া দর্শকরা কারো সিনেমা দেখেন না।

মূলত মান্না মারা যাওয়ার পর এই ব্যবসা আরও লাটে উঠে। অনেক দর্শকই মনে করেন, এখনকার আর্টিস্টরা ভালোভাবে কথাই বলতে পারেন না। এ জন্য দর্শকরা সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ব্যবসা খারাপ হওয়ার জন্য প্রথমত দায়ী অশ্লীল সিনেমা। এরপর রয়েছে আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব ও ইন্টারনেট। আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে একটি পরিবার ঘরে বসেই সব ছবি দেখতে পাচ্ছেন। তাহলে তারা আর কি দেখতে হলে আসবে? সবই তো মোবাইলে পাওয়া যায়। তাহলে কী দেখতে তারা হলে আসবেন?

এক সময় কটিয়াদি উপজেলার অন্যতম হল ছিল কথাচিত্র। বন্ধ হয়ে যাওয়া এ সিনেমা হলের মালিক মো. খোকন সিকদার বলেন, চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার আগেই পাইরেসির কারণে দর্শকরা দেখে ফেলে। পরে কি আর এ সব দর্শক সিনেমা হলে আসবে? গত কয়েক বছর ধরে লোকসান গুনতে গুনতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তাই হল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। সিনেমা হলের জায়গায় মার্কেট তৈরি করে মাসে মাসে নগদ টাকা গুনছেন বলেও জানান তিনি।

জেলা সদরের পুলেরঘাট বাজারের বন্ধ হয়ে যাওয়া রাখি সিনেমা হলের মালিক মো. ফরিদ আহম্মেদ সিনেমা হল চালাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ঋণ করে নতুন সিনেমা নিয়ে আসার পর পুঁজি উঠে আসে না, তাই বিকল্প ব্যবসার কথা ভেবে হল বন্ধ করে দিয়েছেন। করিমগঞ্জ উপজেলার আঁখি সিনেমা হলের মালিক মো. মোশারফ হোসেন জানান, বিগত এক মাসে লাভের আশায় সিনেমা চালিয়ে দুই লাখ টাকারও বেশি লোকসান গুনেছেন। তাই এখন সিনেমা হল ভেঙে মার্কেট তৈরি হচ্ছে।

মালিকরা সিনেমা হলের বদলে নতুন ব্যবসা করছেন। অন্যদিকে কর্মচারী হয়ে গেছেন বেকার। রংমহল হলের কর্মচারী নূর ইসলাম বলেন, হল চালু থাকাকালীন কিছু বেতন পেতাম, যা দিয়ে আমার সংসার চলত। এখন ঋণ করে সংসার চালাচ্ছি। সিনেমা হলের শতাধিক কর্মচারী-শ্রমিকেরা বেকার হয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কিশোরগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘হল পরিদর্শনে গিয়ে দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি মানসম্মত চলচ্চিত্র ও অশ্লীলতার কারণে এবং আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে সবাই ঘরে বসেই সব ছবি দেখতে পাচ্ছেন যার ফলে হল বিমুখ হয়ে পড়েছেন দর্শক। তাই জেলার অধিকাংশ হল বন্ধ হয়ে গেছে।’ দর্শকদের হলমুখী করতে হলে আশু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এ তথ্য কর্মকর্তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত