ডিএনএতে সমাধান ৭ জটিল রহস্যের

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৯, ১২:২২ এএম

কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ঘটনা সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ করা হয়। আর এইসব আলামত যেমন রক্ত, বীর্য, মূত্র, অশ্রু, লালা ইত্যাদি থেকে ডিএনএ তথ্য বের করা হয় যে পরীক্ষার মাধ্যমে তাকে বলা হয় ফরেনসিক টেস্ট। এটা দিয়ে শনাক্ত করা যায় অপরাধীকে। সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন বর্তমানে অনেকটাই পাল্টে গেছে। তাই অপরাধ মোকাবিলায় ও অপরাধী শনাক্তে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক কলাকৌশল ও প্রযুক্তি। আর এর মধ্যে ফরেনসিক টেস্ট করে তদন্ত করা এখন খুবই প্রচলিত। আর এর কল্যাণে আগে সমাধান করা যায়নি এমন অনেক হত্যা রহস্যের সুরাহা হচ্ছে ৫০ বছর পরেও। রিডার্স ডাইজেস্টের প্রতিবেদন অবলম্বনে এমন সাতটি হত্যাকান্ড নিয়ে লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ

ব্রাইটনের হত্যাকারী কে?

আজ থেকে ৫০ বছর আগের কথা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন ২৩ বছর বয়সী জেন ব্রাইটন। ১৯৬৯ সালের ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু ব্রাইটন পরীক্ষা দিতে যাননি। বিভিন্নভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে তার প্রেমিক গেলেন ব্রাইটনের অ্যাপার্টমেন্টে। গিয়ে দেখেন বিভীষিকাময় দৃশ্য। নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে ব্রাইটনকে। হত্যা করার আগে তাকে ধর্ষণও করা হয়েছে। পুরো ঘর ও বিছানাজুড়ে রক্ত। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে আঘাতের চিহ্ন। ভারী জিনিস দিয়ে তার মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে উপর্যুপরি আঘাত করেই গেছে হত্যাকারী। তারপর তার হত্যা নিয়ে জল গড়িয়েছে বহু। আগের রাতেও যে মেয়েটি বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে মজা করে ডিনার করে এলো সেই মেয়েটির হত্যার রহস্যের কিনারা করা যায়নি ৫০ বছরেও। এমন কোনো ধারণা নাকি নেই যেটাকে এই খুনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। কিন্তু হত্যাকারী লাপাত্তা। 

অবশেষে ২০১৮ সালে হত্যা রহস্য ভেদ হয়। সেটা এই ফরেনসিক বিজ্ঞানের বদৌলতে। প্রমাণিত হয় জেন ব্রাইটনকে খুন করেছিলেন মাইকেল স্টাম্পটার নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্তু ব্রাইটন খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই ২০০১ সালে ৫৪ বছর বয়সে মারা যান মাইকেল। একবার এক বিশেষ প্রয়োজনে মাইকেল স্টাম্পটারের ভাইয়ের ডিএনএ স্যাম্পল দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

মিডলসেক্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মারিয়না জানান, অবশেষে তারা সেই জিনিসটি খুঁজে পেয়েছেন যেটার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন। ভাইয়ের দেওয়া সেই ডিএনএ স্যাম্পলের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় তদন্তকারীদের কাছে থাকা মাইকেলের ডিএনএর স্যাম্পলের। আর এভাবেই শনাক্ত হয় ব্রাইটনের খুনি। কিন্তু ততদিনে মারা গেছেন মাইকেল। পরে জানা যায় মাইকেল আরও ৫ জনকে ধর্ষণ এবং তিনজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিলেন তাদের মধ্যে ব্রাইটন একজন। পরে বাকি হত্যাকান্ডের রহস্যেরও কিনারা হয়েছিল।

image

তদন্তকারীরা ধারণা করছেন মাইকেল হয়তো ব্রাইটনের জানালা দিয়ে তার অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশ করেছিলেন। কারণ মাইকেল কাজ করতেন অ্যাপার্টমেন্টের কাছের একটি রাস্তার ধারে। সেখান থেকেই হয়তো তার নজরে পড়েছিলেন ব্রাইটন। ব্রাইটনকে খুনের তিন বছর পর এক নারীকে লাঞ্ছনার ঘটনায় একবার গ্রেপ্তারও হন তিনি। কিন্তু ১৯৭৫ সালে তিনি জেল থেকে বেরিয়ে যান। এর কিছুদিন পর এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে ২০ বছরের জন্য জেলে যান। জেল থেকে মুক্তির মাত্র ১৩ মাস আগে জেলেই তার মৃত্যু হয় ক্যানসারে।

দাঁত দিয়ে যায় চেনা

এই ঘটনা আজ থেকে ৪১ বছর আগের। ১৯৭৮ সালে ফ্লোরিডা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন তরুণী এক রাতে নির্মমভাবে খুন হন। সেই তরুণীদের এত নির্মমভাবে আঘাত করা হয়েছিল যে তাদের মুখই চেনা যাচ্ছিল না। থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ এসে তাদের যখন উদ্ধার করে তখন তাদের মধ্যে একজন ছিল উপুড় করে চাদর দিয়ে মোড়ানো অবস্থায়। লেভি নামের সেই তরুণীর সারা শরীরে যেন রক্তের বন্যা বইছে। একজন অফিসার তার গায়ের চাদর সরাতেই দেখতে পেলেন তার নিতম্বে কামড়ের চিহ্ন। আরেক তরুণী মার্গারেট বোম্যানের রুমটিতে প্রবেশ করার মতো অবস্থা ছিল না। রক্তে ভেসে ছিল ফ্লোর, দেয়ালজুড়ে ছিল রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। মার্গারেটকে এতটাই নির্মমভাবে মারা হয়েছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল তার শিরñেদ করা হয়েছে। এই দুজনকে হত্যার দেড় ঘণ্টা পর ছয় ব্লক দূরে চেরিল থমাস নামে আরেক তরুণী তার হামলার শিকার হন।

খুনিকে পালিয়ে যেতে যিনি দেখেছেন তার বর্ণনা মিলে যায় টেড বান্টি নামে এক সিরিয়াল কিলারের সঙ্গে। অত্যন্ত সুদর্শন টেড এই তিনজনকে হত্যার আগে ছিলেন শিকাগো জেলে। সেখান থেকে পালিয়েছিলেন তিনি। তারপর পুলিশ তার খোঁজে চিরুনি অভিযান চালিয়েছে কিন্তু যেন বেমালুম গায়েব হয়ে গেছেন টেড। শিকাগো থেকে মিশিগান, আটলান্টা হয়ে অবশেষে তিনি থিতু হন ফ্লোরিডার টালাহাসিতে। নতুন নাম ধারণ করেন ক্রিস হ্যাজেন। সেই আবাসস্থল ছিল ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুব কাছে। টেড বান্ডি ছিলেন প্রায় ছয় ফুট লম্বা। সেই সঙ্গে ঢেউ খেলানো বাদামি চুল, অদ্ভুত সুন্দর চোখ, স্মার্টনেস তার ব্যক্তিত্বে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল। সুদর্শন ছিলেন বলে টেড সহজেই নারীদের আকৃষ্ট করতে পারতেন। তার  ভক্সওয়াগন বিটল গাড়ি ছিল দারুণ অস্ত্র। গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে বলে তরুণীদের সহানুভূতি চাইতেন। মাথায় আঘাত করে অজ্ঞান করে নারীদের ধর্ষণ করতেন। অনেক সময় আবার হত্যার পর মৃতদেহের সঙ্গে মিলিত হতেন টেড।

যাই হোক তিন তরুণী খুনের ঘটনায় পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল টেড বান্টিকে। গ্রেপ্তারও করা হলো। কিন্তু টেডই যে এই কাজ করেছে তার কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে সেটার সমাধান হয় কামড়ের দাগ ও লালা থেকে। টেডের কয়েকটি দাঁত ছিল নকল। আর কিছু দাঁত এলোমেলো। লালা থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ ও পুলিশের কাছে থাকা দাঁতের এক্সরে থেকে তাকে অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

এই ঘটনার পর টেডকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি সকালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

গোপন চিরকুট

১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যে বাড়ির বাইরে খেলছিল ৮ বছরের ছোট্ট শিশু এপ্রিল। তার পর থেকেই সে নিখোঁজ। বাবা-মা ও স্থানীয় পুলিশ সবাই খুঁজে ব্যর্থ। ওই এলাকায় সম্ভাব্য এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে খোঁজা হয়নি এপ্রিলকে। তিন দিন পর বাড়ি থেকে ২০ মাইল দূরে এপ্রিলের লাশ পাওয়া যায়। ক্ষতবিক্ষত ছোট্ট এপ্রিলের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না।

image

লাশের পাশে ছিল সেক্স টয়, কিছু শপিং ব্যাগ। তার পায়ের একটি জুতা পাওয়া গেলেও আরেকটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। ছোট্ট এই মেয়েটিকে ধর্ষণ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তারপর পুলিশ তন্ন তন্ন করে খুনিকে খোঁজার চেষ্টা করে গেছে। খুনের সম্ভাব্য যত কারণ ছিল খতিয়ে দেখেছে কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। দুই বছর পর শিশুটির লাশ যেখানে পাওয়া গেছে তার পাশে কাঠের ওপর লেখা দেখা গেছে একটি মেসেজ। তাতে লেখা ছিল ‘আমি খুন করেছি আট বছর বয়সী এপ্রিলকে, আমি আবারো খুন করব।’ কিছুদিন পর আরেকটি চিরকুট পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিল ‘তোমরা কি আরেক পাটি জুতা খুঁজে পেয়েছ? হা হা হা আমি আবারও খুন করব’।

এপ্রিলকে হত্যার ১৪ বছর পর আবারও এই রকম চারটি চিরকুট পাওযা যায় ওই এলাকার তিনজন কিশোরীর সাইকেলের পাশে। আরেকটি চিরকুট পাওয়া যায় ওই এলাকার এক কিশোরীর মেইল বক্সে। সেই চিরকুটে লেখা ছিল, ‘হাই হানি। আমি সেই ব্যক্তি যে এপ্রিলকে অপহরণ করে ধর্ষণ ও খুন করেছি। পরবর্তী শিকার হবে তুমি।’ প্লাস্টিকে মোড়ানো সেই চিরকুটের সঙ্গে থাকত ব্যবহৃত কনডম ও পুরুষের গোপন অঙ্গের ছবি।

এসব ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। চিরুনি অভিযান চালানো হয় ইন্ডিয়ানাতে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। খুনি থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারপর পেরিয়েছে ৩০ বছর। অবশেষে ২০১৮ সালের মে মাসে এই শিশুর খুনের রহস্য উদঘাটন করা হয়।  অন্য আরেকটি খুনের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার পুলিশ গ্রেপ্তার করে ৫৯ বছর বয়সী জন ডি মিলারকে। তাকে যখন গ্রেপ্তার করা হয় তখন তার ময়লার ঝুড়িতে ছিল তিনটি ব্যবহৃত কনডম। জেনেটিক ডিএনএ টেস্টিং অ্যানালাইসিস ব্যবহার করার পর এপ্রিলের সম্ভাব্য খুনির ডিএনএর সঙ্গে মিলে যায় মিলারের ডিএনএ। পরবর্তী সময়ে মিলার এপ্রিলকে ধর্ষণ করে হত্যার কথা স্বীকার করে পুলিশের কাছে। ছোট্ট এপ্রিল যখন বাইরে খেলছিল তখন তিনি তাকে গাড়িতে করে ঘোরার প্রস্তাব দেন। এপ্রিল রাজি না হলে তাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান।

চুইংগামে সমাধান

হত্যার ৩৫ বছর পর রহস্যের জট খুলে ব্যবহৃত চুইংগামের মধ্য দিয়ে। হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে ১৯৮১ সালে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে। ২৪ বছর বয়সী তরুণী নোভা ওয়েলসের লাশ খুঁজে পাওয়া যায় তার ফ্ল্যাটে সিঁড়ির নিচে বিশেষভাবে তৈরি একটি আলমারিতে। হত্যার পর তার লাশ সেখানেই গুম করে ফেলা হয়। খুন হওয়ার তিন সপ্তাহ পর নোভার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এই হত্যাকান্ডের পর গ্রেপ্তার করা হয় নোভার সাবেক প্রেমিক ওসমন্ড বেলকে। তবে যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যান ওসমন্ড। কোনো কূলকিনারা না করা গেলেও নোভার পরিবার এই হত্যা মামলা বন্ধ করতে রাজি ছিল না। ওসমন্ডের ভয় ছিল তিনি হয়তো আবার গ্রেপ্তার হতে পারেন। তাই তিনি বেনামে চিঠি পোস্ট করতে লাগলেন অন্য আরেকজনকে দায়ী করে। চিঠির মুখ বন্ধ করতে তিনি আঠা লাগাতেন লালা দিয়ে। অবশেষে ২০১৭ সালে এই রহস্যের কিনারা হয়। কে খুন করেছে নোভাকে সেটা জানা যায়। আর সেটা হয় চুইংগামের মাধ্যমে। কারণ নোভার মৃতদেহ নষ্ট করে ফেলার জন্য যে আলমারি তিনি ব্যবহার করেছিলেন সেখানে পাওয়া গেছে ব্যবহৃত চুইংগাম। সেই চুইংগাম আর চিঠিতে ব্যবহৃত লালার ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে তার থেকে প্রাপ্ত ফলের সূত্র ধরে এত বছর পর আবারও গ্রেপ্তার করা হয় ওসমন্ডকে। দেওয়া হয় ১২ বছরের জেল। প্রথমে যখন চুইংগাম পাওয়া গিয়েছিল তখন ওসমন্ড বলেছিলেন তার ব্যবহৃত চুইংগাম অন্য কেউ খুন করে সেখানে রেখে দিয়েছে। যাতে তিনি ফেঁসে যান। তিনি হত্যা করেননি।  গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে ওসমন্ড জানান, নোভা ও তার দুটি সন্তান ছিল। কিন্তু এর মাঝেই নোভা জড়িয়ে পড়েন পরকীয়ায়। আর এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি হত্যা করেন নোভাকে। ওসমন্ড ছিলেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। বাড়ির দেয়াল ভেঙে তার ভেতর তৈরি করেছিলেন এই আলমারি।

কুকুরের পশম

২০০১ সালের আগস্ট মাসে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে কুকুর নিয়ে রাস্তায় হাঁটছিলেন লিন্ডলে উডস। এ সময় তিনি ডাস্টবিনে দেখেন ১৬ বছরের এক কিশোরীর মরদেহ। তার মাথা পেঁচানো ছিল কালো রঙের প্লাস্টিক ব্যাগ দিয়ে। দুই হাত বাঁধা ছিল পেছনের দিকে। আর শরীর মোড়ানো ছিল সবুজ রঙের প্লাস্টিক ব্যাগ দিয়ে। কিশোরীর নাম লেনে তাইরান। তার লাশটি যেখানে খুঁজে পাওয়া গেছে সেই জায়গাটি ছিল তার বাড়ি থেকে ১০ মাইল দূরে। ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে বন্ধুর সঙ্গে ক্রিসমাসের শপিং শেষে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন তাইরান।

image

তার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ। অনেক খুঁজেও তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ১০ মাস পর খুঁজে পাওয়া যায় তার মরদেহ। তাইরানের দেহ ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় কুকুরের পশম। আর এই পশম দিয়ে হত্যাকারীকে ধরা হয়। এই পশম পাঠানো হয় টেক্সাসের বিজ্ঞানীদের কাছে। যারা বের করে দিয়েছিলেন কুকুরের আংশিক ডিএনএ। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা যায় কুলার নামের সেই কুকুরটি আরও আগেই মারা গেছে। পরে গ্রেপ্তার করা হয় কুকুরের মালিক জন টেইলরকে। তাইরানের হাত বাঁধা ছিল যে নেট দিয়ে সেই নেট খুঁজে পাওয়া যায় জন টেইলরের বাড়িতে। তারপর বাড়ি তল্লাশি করে হত্যার বিভিন্ন আলামত খুঁজে পায় পুলিশ। ব্রিটিশ ক্রিমিনাল কেসের ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে প্রথম যেটা কিনা কুকুরের ডিএনএ ব্যবহার করে সফলতা পাওয়া গেছে।

ম্যারিন ভাস্ত্রা

১৯৯৯ সালে নেদারল্যান্ডসে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয় ম্যারিন ভাস্ত্রাকে। নেদারল্যান্ডসের হাই-প্রোফাইল ক্রিমিনাল কেসগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এই ১৭ বছর বয়সী ম্যারিন ভাস্ত্রার ঘটনা। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায়। লাশের পাশ থেকে আলামত হিসেবে শনাক্ত করা হয় অপরাধীর রক্ত ও বীর্য। সন্দেহভাজন হিসেবে দেশটির কুলাম নামক এলাকার ১৭০ পুরুষের মধ্যে ১৬২ জনেরই ডিএনএ টেস্ট করা হয়েছিল এ ঘটনায়। কিন্তু কিছুতেই কোনো সুরাহা হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত আলামতের সঙ্গে সন্দেহভাজন কারও ডিএনের সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি। এরপর দেশটির পাবলিক প্রসিকিউশন সার্ভিস আরও প্রায় ৯০০ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করে। কিন্তু তাও ফলাফল একই থাকে।

image

এরপর সন্দেহের মোড় ঘুরে যায় ওই এলাকায় অবস্থানরত রিফিউজিদের। হত্যাকাণ্ডের পর ওই এলাকায় দাঙ্গা বেধে যাওয়ার উপক্রমও হয়েছিল। এরপর ২০১২ সালে নতুন এক আদেশ আসে। এতে বলা হয়, ওই এলাকার আশপাশের পাঁচ কিলোমিটারে যতজন পুরুষ অবস্থান করছে, তাদের সবার ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। প্রায় ৯ হাজার ব্যক্তির কাছ থেকে ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। অবশেষে ১৩ বছর পর ২০১২ সালে এ ঘটনার সুরাহা হয়। জেসপার নামে স্থানীয় এক কৃষককে এ ঘটনায় আটক করা হয়। তার নমুনার সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা নমুনার সাদৃশ্য পাওয়া যায়। পরে সে হত্যার কথা স্বীকারও করে। সে জানায়, মে মাসের ১ তারিখে মেরিন মোটরসাইকেল চালিয়ে বাসায় ফিরছিল। এ সময় তার নজর পড়ে মেরিনের দিকে। তাকে সে অপহরণ করে। জোরাজুরি করায় মেরিনের গলা কেটে দেয় ছুড়ি দিয়ে। তারপর তাকে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় জেসপারের ১৮ বছরের সাজা হয়।

বাথটাবে লাশ

১৯৭৭ সালে ইউএসের সল্টলেক সিটিতে নিজের বাড়ির অ্যাপার্টমেন্টে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় ১৬ বছর বয়সী শ্যারন স্কোলমেয়ারকে। তার হাত ছিল বাঁধা আর মুখে ছিল কাপড় গোঁজা। তার মা কাজ থেকে ফিরে বাসায় প্রবেশ করতে পারছিলেন না। বহুবার কলিংবেল আর দরজা ধাক্কাধাক্কির পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া দিচ্ছিল না শ্যারন। তারপর তিনি বাড়ির ম্যানেজারকে গিয়ে বললে, ম্যানেজারের কাছে থাকা চাবি দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন। বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় খোঁজা শেষ করে বাথরুমে উঁকি দিতেই শ্যারনকে দেখতে পান পানিতে ডোবানো অবস্থায়। সে সময় বাড়ির ম্যানেজার পুলিশকে ফোন করে শ্যারনের ঘটনা জানান। শ্যারন ছিল বাথটাবে। তাই সেখান থেকে কোনো ধরনের আলামত খুঁজে পায়নি পুলিশ। সম্ভাব্য সব রকম কারণ খতিয়ে দেখা হলেও হত্যাকারী ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ তখন আলামত হিসেবে সংগ্রহ করেছিল সেই বাথটাবের পানি।  অবশেষে চল্লিশ বছর পর সেই পানি দিয়ে ঘটনার সুরাহা করা হয়। ‘গন্ডাধপ’ পদ্ধতিতে সংগৃহীত সেই পানি এত বছর ধরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ফরেনসিক তদন্তেরও অগ্রগতি হয়েছে অনেক। সেই পানি থেকে ২০১৭ সালে বের করা হয়েছে হত্যাকারীর ডিএনএ। যা কিনা মিলে গেছে বাড়ির ম্যানেজার প্যাট্রিকের সঙ্গে। গ্রেপ্তার করা হয় ৫৯ বছর বয়সী প্যাট্রিককে।

image

এর আগেও আরেকটি মামলা ছিল প্যাট্রিকের। বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তাকে দুই মামলায় মাত্র পাঁচ বছরের সাজা দেওয়া হয়। পরে মামলার নথি থেকে জানা যায় শ্যারনের অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশ করার জন্য তিনি নিজের কাছে থাকা চাবি ব্যবহার করেছিলেন। মধ্যরাতে তিনি যখন অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশ করেন তখন শ্যারন ঘুমাচ্ছিল। রান্নাঘর থেকে ছুরি নিয়ে তিনি শ্যারনের কাছে গিয়ে ধর্ষণ করতে চান। রাজি না হলে ছুরিকাঘাতে হত্যার ভয় দেখিয়ে তার হাত-পা বাঁধেন। মুখে গুঁজে দেওয়া হয় কাপড়। তারপর করা হয় ধর্ষণ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত