আগুন প্রতিরোধে গুচ্ছ নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৯, ০২:২৪ এএম

অগ্নিকান্ড ও ক্ষয়ক্ষতি রোধে বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনের ভিত্তিতে ছাড়পত্র দেওয়া, নিয়মিত পরিদর্শন করে প্রতি বছর নবায়নের ব্যবস্থা রাখাসহ একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে বনানীর এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকান্ড নিয়ে আলোচনার পর তিনি এসব অনুশাসন দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার মধ্যে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে মানা, তিন মাস পরপর উঁচু ভবনে ফায়ার সার্ভিসের মহড়া দেওয়া, আগুন লাগার পর ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে উন্নত ব্যবস্থা রাখার বিষয়ও রয়েছে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এ সময় তিনি সভার অন্যান্য সিদ্ধান্তের কথাও জানান। মন্ত্রিসভা বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুনে হতাহত হওয়ার ঘটনায় শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, যখন ভবন তৈরি আগুন প্রতিরোধে গুচ্ছ নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর করা হবে, তখন ফায়ার সার্ভিস একটি ক্লিয়ারেন্স দেয়, এ ক্লিয়ারেন্স যথেষ্ট নয়। এটা ভায়াবল কি না সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কলকারখানার মতো প্রতি বছর তা নবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। এক থেকে তিন মাসের মধ্যে অগ্নিনির্বাপণ মহড়া দিতে হবে। ধোঁয়ায় শ্বাসবন্ধ হয়ে অনেকে মারা যায়। ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে। ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আগুনে মৃত্যুর হার অনেকটা কমে যাবে। ধোঁয়া বন্ধ করার কৌশল, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সেটা ব্যবহার করতে হবে। আগুন লাগার পর অনেক সময় পর্যাপ্ত পানির অভাবে ফায়ার সার্ভিস কাজ করতে পারে না। ঢাকায় যে খাল, ডোবা, ঝিল ছিল তা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই যেখানেই সম্ভব জলাধার তৈরি করে পানির অভাব পূরণ করতে হবে। ধানমন্ডি ও গুলশান লেক যাতে কেউ দখল করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার লেকগুলোকে ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। এখন ফায়ার সার্ভিসের সাকল্যে তিনটি ল্যাডার আছে, যেগুলো ২৩ তলা পর্যন্ত যেতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা ও ল্যাডারের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে। প্রকৌশলীরা যেন পরিবেশ ও বাস্তবতার নিরিখে অবকাঠামোর নকশা করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। যে ঘর তৈরি করা হয় তা অনেকটা ম্যাচ বাক্সের মতো।

প্রতিটি ভবনে ফায়ার এক্সিট নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু হাইরাইজ নয়, প্রতিটি দালানে শতভাগ ফায়ার এক্সিট নিশ্চিত করতে হবে।

অনেক জায়গায় ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে দরজা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফায়ার এক্সিট যেন সব সময় ওপেন থাকে, অর্থাৎ ম্যানুয়ালি যেন তা খোলা যায়।

জরুরি প্রয়োজনে মানুষ যেন বহুতল ভবন থেকে তারপলিনের মাধ্যমে ঝুলে নামতে পারে, সেই পদ্ধতি চালু করতে হবে। অনেক দেশে আছে তারপলিনে (কাপড়ের মতো জিনিস) ঝুলে মানুষ নামতে পারে। এ সিস্টেমটা যে-কেউ ব্যবহার করতে পারে। শুধু ফায়ার সার্ভিস করবে তা নয়। তারপলিনে ঝুলে একসঙ্গে অনেক লোক উঁচু ভবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। লাফ দিয়ে পড়ার কারণে অনেকে গুরুতর আহত হয়েছে, মারাও গেছে। তারপলিন থাকলে লাফ দেওয়া লাগবে না।

প্রতিটি হাসপাতাল ও স্কুলে বারান্দাসহ খোলা জায়গা রাখা জরুরি। আগুন লাগার সময় অনেকে লিফট ব্যবহার করেন। কিন্তু সারা বিশ্বেই আগুন লাগার সময় লিফট ব্যবহার করা নিষেধ। ভবনে আগুন লাগলে লিফট ব্যবহার না করা। ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন যারা করে তারা অনেক সময় অনেক কিছু ব্লক করে দেয়, এটা যেন না করে। প্রতিটি ভবনে কমপক্ষে দুটি এক্সিটওয়ে রাখতে হয়। তিনি সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ব্রিফিংয়ের পর সাংবাদিকরা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের কার্যালয়ে গিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা তাদের কাজকে আরও উজ্জীবিত করবে। পূর্তমন্ত্রী বলেন, বনানীর এই আগুনের ঘটনার পর দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ঢাকার বহুতল ভবনগুলো নির্মাণে কোনো অনিয়ম আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ২৪টি টিম গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছে। তাদের আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোন কোন ভবনে অনিয়ম রয়েছে বা ভবনগুলো কী অবস্থায় আছে, তার তথ্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হবে। এরপর মালিককে একটা সংক্ষিপ্ত সময় দিয়ে বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বলা হবে। এর পরও নিয়ম না মানলে ফৌজদারি ব্যবস্থাসহ যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পূর্তমন্ত্রীকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সিনিয়র মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে জানান, বৈঠকে পূর্তমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে জানান, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চলমান অভিযান ‘ধীরে চালানোর’ কথা বলছেন। আমি কী করব। এ সময় প্রধানমন্ত্রী পূর্তমন্ত্রীকে তার কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

বিল্ডিং কোড অমান্য করে নির্মিত ভবনের তালিকা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী : বিল্ডিং কোড অমান্য করে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ঢাকায় যেসব সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে সেসব ভবনের তালিকা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত রবিবার রাতে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম ও সংশ্লিষ্টদের ডেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব তালিকা চান তিনি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে যত ভবন তৈরি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী সেসব ভবনের তালিকা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা স্বল্প সময়ের মধ্যে তালিকা সংগ্রহ করছি। এ লক্ষ্যে আমরা মাঠে বিভিন্ন টিম নামিয়ে দিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূলের মতো এ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজউকের কোনো কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত থাকলে ওইসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী রাজউককে কিছুদিন মনিটরিংয়ে রাখা যায় কি না তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বোঝাপড়া করেছেন।

‘মন্ত্রী-এমপিরাও নৌকা ডুবায়’ : বৈঠকে উপস্থিত একজন মন্ত্রী জানান, উপজেলা নির্বাচন নিয়েও কথা হয়েছে। অনেক উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিজয়ী হচ্ছেন। অনেক বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন স্থানীয় এমপিরা। বিভিন্ন উপজেলায় মন্ত্রীরাও বিদ্রোহী প্রার্থীদের ইন্ধন দিচ্ছেন। বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় এনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মন্ত্রী-এমপিরাও নৌকা ডুবায়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত