পবিত্র কোরআন-এর বর্ণনায় সেজেছে পার্ক

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৩৪ এএম

ভ্রমণপিপাসু মানুষের অন্যতম সেরা গন্তব্য আরব আমিরাতের দুবাই। সুউচ্চ ভবন, মরুভূমিতে ভ্রমণ, দারুণ উত্তেজনাকর সব অ্যাডভেঞ্চার রাইড, কেনাকাটা, পাম দ্বীপ, গ্লোবাল ভিলেজ দেখতে পর্যটকদের দারুণ ঠিকানা এখন দুবাই। তবে, এসবের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে নতুন আকর্ষণ ‘আল-কোরআন পার্ক’। পবিত্র কোরআনের ঐশী বাণী আর নানা অলৌকিক ঘটনার নিদর্শন দিয়ে সাজানো হয়েছে এই পার্ক। শুধু মুসলিম নয়, বিশ্বের শান্তিকামী যে কোনো মানুষের জন্য এই পার্ক উন্মুক্ত। এই পার্ক নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন

অবস্থান

দুবাইয়ের আল খাওয়ানিজ এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে আল-কোরআন পার্ক। ইসলামি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ইতিহাস সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে স্থাপন করা হয়েছে পার্কটি। প্রায় ৬০ হেক্টর এলাকাজুড়ে এর বিস্তৃতি। মূলত পারিবারিক বিনোদন এবং শিশুদের জন্য অপার আনন্দময় করতে সাজানো হয়েছে কোরআনিক পার্ক। এটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। পার্কটিতে একটি দৃষ্টিনন্দন প্রধান প্রবেশপথ, একটি প্রশাসনিক ভবন, একটি ইসলামি বাগান, শিশুদের খেলার জায়গা ও উপকরণ, বিশ্রামের আলাদা ব্যবস্থা, হাঁটার আকর্ষণীয় পথ, উমরাহ কর্নার, একটি আউটডোর থিয়েটার, কোরআনের মহিমা প্রদর্শনের স্থান, ফোয়ারা, বাথরুম, একটি গ্লাস হাউস বা কাচের ভবন, একটি মরূদ্যান, একটি পাম বাগান, একটি লেক, একটি রানিং ট্র্যাক, একটি সাইক্লিং ট্র্যাক রয়েছে।

গ্লাস হাউস

কোরআনিক পার্কের প্রধান দুটি অংশের একটি হলো গ্লাস হাউস। এই গ্লাস হাউসের ভেতরে গাছপালা রয়েছে। কোরআন ও সুন্নায় এই সবগুলো গাছের কথাই উল্লেখ আছে। বিশেষ গুণসম্পন্ন এসব গাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- জলপাই গাছ, ডুমুর গাছ, কালো মেহেদী, উদ, অ্যালোভেরা ইত্যাদি। প্রত্যেকটি গাছের সঙ্গে এর গুণাগুণ এবং পরিচিতি সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়া আছে। এ ছাড়া কোরআনে কীভাবে এগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে তারও বর্ণনা আছে। গ্লাস হাউসের ভেতরের গাছগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ পানিপ্রবাহ ব্যবস্থা এবং আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ ছাড়া ভেন্টিলেশনের মাধ্যমে গ্লাস হাউসের তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রিত।

image

গ্লাস হাউসের ভেতর একটি অবজারভেশন ডেকও রয়েছে। যার ওপর দাঁড়িয়ে পুরো চিত্রটি একসঙ্গে দেখা যায়। গ্লাস হাউসে ঘুরে ঘুরে যদি আপনি একটু ক্লান্তিবোধ করেন তবে, গ্লাস হাউসের বাইরেই রয়েছে একটি ফুড কোর্ট, যেখানে বিভিন্ন কোমল পানীয় ছাড়াও ফ্রেশ জুস এবং পানির ব্যবস্থা আছে। সন্ধ্যার দিকে এই ফুড কোর্টে শর্মা ও বার্গারের মতো খাবারও পাওয়া যায়।

কেভ অব মিরাকল্স

এই গুহাগুলো মনুষ্য নির্মিত। বিভিন্ন নবী-রাসুলের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং কোরআনে বর্ণিত কিছু বিস্ময় নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এই গুহাগুলো। এসব বিস্ময়ের মধ্যে রয়েছে- ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ঘূর্ণায়মান পাখি। নবী মুসা (আ.)-এর জন্য সমুদ্র দুই ভাগ করে মাঝখান দিয়ে কুদরতি রাস্তা বানিয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহ। এই কুদরতি রাস্তারও নিদর্শন রয়েছে পার্কে। কাদামাটি থেকে ঈসা (আ.)-এর জীবন্ত পাখি নির্মাণের নিদর্শনও আছে এতে।

গুহা এলাকায় প্রবেশের পরই অন্যান্য দর্শনার্থীর সঙ্গে আপনাকে প্রথমেই একটি কোরআনবিষয়ক একটি ভিডিওচিত্র দেখানো হবে। তারপরই শুরু হবে বিস্ময় দেখার পালা। গুহার বিভিন্ন অংশেই ভিডিওচিত্রের ব্যবস্থা আছে। দর্শনার্থীদেরকে সহযোগিতা করার জন্য আশপাশেই গাইড রয়েছে। কেউ চাইলেই বিনামূল্যে এসব গাইডের সহযোগিতা নিতে পারবেন।

image

বিভিন্ন স্থাপনা সম্পর্কে তারা প্রাথমিক ধারণা দেবে আপনাকে। গুহার ভেতর হারিয়ে যাওয়ার কোনো ভয় নেই। কারণ, পুরো গুহাজুড়ে একটিই পথ। আর এই পথের পাশেই একের পর এক বিস্ময় চোখে পড়বে। গুহার দেয়ালগুলো পাশেই বিশ্রাম নেওয়ার সুবিধা আছে। এটি এমনভাবেই আড়াল করা যে, কেউ বিশ্রাম নিলে স্থাপনাগুলোতে কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়বে না।

ভিডিও এবং এর সঙ্গে যে অডিও, তা আরবি ভাষায়। বর্তমানে এটিতে কোনো ইংলিশ সাবটাইটেল নেই। তবে খুব শিগগির, চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকেই ইংরেজি ভার্সনে অডিও শোনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গুহায় কোরআনে উল্লিখিত অন্তত সাতটি বিস্ময়ের বর্ণনা ও ডেমোচিত্র স্থাপন করা হয়েছে।

পার্ক

গ্লাস হাউসের সবুজ গাছপালা ছাড়াও সমগ্র পার্কজুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানা প্রজাতির ফুলের গাছ এবং লতাপাতা ও গাছপালা। এ ছাড়া পার্কে বেশ কয়েকটি ফলের বাগানও আছে। এই ফলের বাগানগুলো পার্কের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পার্কের ভেতর সর্বমোট বাগানের সংখ্যা ১২টি। এসব বাগানের মধ্যে কোনটি কোথায় আছে তার জন্য সাইনবোর্ডও আছে। তবে এই সাইনবোর্ডগুলোতে এখন শুধু সোনালি রঙের আরবি অক্ষরে নির্দেশনা দেওয়া। কিন্তু যেহেতু দুবাই একটি পর্যটন এলাকা এবং এখানে বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষ ঘুরতে আসবে, তাই আরবি লেখার পাশাপাশি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি অক্ষরও ব্যবহার করা হবে।

গ্লাস হাউসজুড়ে এবং পার্কের বিভিন্ন সোলার প্যানেল ট্রিগুলোর ওপরও আরবি ক্যালিগ্রাফি চোখে পড়বে। গাছগুলো মূলত পার্কটিকে ছায়াচ্ছন্ন করে রাখার জন্য আর সোলার প্যানেলের সাহায্যে আপনার ফোনে যেন সার্বক্ষণিক চার্জ সুবিধা পাওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করে রাখা আছে। পুরো পার্ক জুড়ে আছে ওয়াইফাই সুবিধাও। পার্কে একটি লেকও আছে যেখানে নজরকাড়া ঝর্না চোখে পড়বে। ছবি তোলার জন্যও কিছু আদর্শ জায়গা আছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও এর ব্যবহারকে মাথায় রেখেই পার্কের নকশা করা হয়েছে।

image

পার্কের একটি নির্দিষ্ট কোনায় আছে কফি হাউস। সেখানে চাইলেই কফি ছাড়াও আপনি চকলেট এবং খাবার খেতে পারবেন । ক্যাফের পাশেই আছে একটি খেলার মাঠ, যেখানে শিশুরা নিজের ইচ্ছামতো খেলাধুলা করার বিভিন্ন উপকরণ বেছে নিতে পারবে। খাওয়ার সময় বাচ্চাদের খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখার জন্য এটি একটি কৌশল বলা যায়। দুই থেকে বারো বছর বয়সী শিশুরা এখানে খেলতে পারবে।

পার্কে একটি শিক্ষামূলক কর্নারও আছে, যেখানে শিশুদেরকে হজ ও উমরাহ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। পার্কের সীমানাজুড়ে আছে জগিং পথ এবং সাইক্লিং করার জন্য আলাদা ব্যবস্থা। আছে বিভিন্ন জিম সরঞ্জামাদিও। বিনামূল্যে আপনি এসব ব্যবহার করতে পারবেন।

গ্লাস হাউস এবং পুরো পার্কজুড়ে প্রায় ৫৪ প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। এই ৫৪ প্রজাতির গাছের নাম পবিত্র কোরআনে আছে। এসব গাছ এবং উৎপাদিত ফল ওষধি গুণাগুণসমৃদ্ধ। ডালিম গাছ, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর, বার্লি, গম, আদা, মিষ্টি কুমড়া, তরমুজ, তেঁতুল, আঙুর ক্ষেত, কলা, শসা এবং পুদিনাগাছও রয়েছে।

তথ্য

আল খাওয়ানিজ এলাকায় অবস্থিত এই পার্কটি বিখ্যাত মুশরিফ পার্কের পাশেই। কোরআনিক পার্কটি সকাল ৮টায় খোলা হয় এবং রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা এখানে অবস্থান করতে পারেন। দর্শনার্থীদের গাড়ি রাখার জন্য পার্কের পাশেই আছে সুবিশাল এলাকা। ছুটির দিনগুলোতে এই এলাকাটি গাড়িতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। পার্কে প্রবেশের জন্য কোনো ফি নেই।

তবে পার্কের ভেতরে গ্লাস হাউস এবং কেভ অব মিরাকলসে প্রবেশের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে। টিকিট করার জন্য নোল কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন দর্শনার্থীরা। পার্কের প্রবেশপথের পাশেই নোল কার্ড রিচার্জের জন্য স্টেশন রয়েছে।

৭৪ মিলিয়ন ডলার খরচ করে বানানো এই পার্কের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে। তিনটি পর্যায়ে কাজ সমাপ্ত করা হয়। পার্কে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদাভেদ নেই। যে কেউ এই পার্কে প্রবেশ করতে পারবে। পার্কটির সৌন্দর্যবর্ধণের কাজ এখনো চলামান।

ধারণা করা হচ্ছে, দুবাইয়ের অন্যান্য দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার মতো আল-কোরআন পার্কও পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত