৮ কোটি মানুষের সমান লবণ খাচ্ছে শিল্প

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ০১:০১ এএম

দেশের ১৬ কোটি মানুষ বছরে যে পরিমাণ লবণ খায়, তার প্রায় অর্ধেক পরিমাণ লবণ দরকার শিল্প খাতে। এমন একটি খসড়া হিসাব তৈরি করেছে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়। তাতে আগামী অর্থবছর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভোজ্য ও শিল্প লবণের যে চাহিদা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তাতে শিল্প লবণের চাহিদা ভোজ্য লবণের সমানই দেখানো হচ্ছে। 

দেশে বিভিন্ন ধরনের লবণের প্রকৃত চাহিদা কত, সে সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য নেই কারও কাছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিসিক লবণের চাহিদা ও উৎপাদনের একটি হিসাব দিলেও তা মানতে নারাজ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও তার আওতাধীন বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন। বিসিকের চাহিদা ও উৎপাদনের তথ্য অনুযায়ী দেশে ভোজ্য লবণের কোনো সংকট থাকার কথা নয়, কিন্তু প্রতি বছরই ভোজ্য লবণের সংকট দেখা দিচ্ছে। এই সুযোগে শিল্পে ব্যবহৃত লবণ ভোজ্য লবণ হিসেবে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে একদিকে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি শিল্প লবণ ভোগের ফলে মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে দেশে বিভিন্ন ধরনের লবণের প্রকৃত চাহিদা কত তা জানতে কাজ শুরু করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়। আগামী বছরগুলোতে লবণের চাহিদা কোন হারে বাড়তে পারে, তারও একটি প্রাক্কলন তৈরির কাজ করছেন দুই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। ইতিমধ্যে তারা খাবার লবণের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পে কী পরিমাণ লবণের চাহিদা হবে, তার একটি খসড়া তৈরি করেছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত খসড়া প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোজ্য লবণের চেয়ে এখন শিল্প লবণের চাহিদা বেশি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে দেশে মোট লবণের চাহিদা হবে ১৯ লাখ ৪ হাজার টন। এর মধ্যে ভোজ্য লবণের দরকার হবে ১০ লাখ ৫০ হাজার টন। আর শিল্প খাতে দরকার হবে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন লবণ। মানুষ ও শিল্প ছাড়াও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রাণিসম্পদ খাতে লাগবে বাকি ৩ লাখ ৪ হাজার টন। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে যে চাহিদা প্রাক্কলন করা হচ্ছে, তাতে ওই সময় দেশে মোট লবণের চাহিদা হবে ২১ লাখ ৭৮ হাজার টন। এর মধ্যে ভোজ্য লবণ লাগবে ১১ লাখ ৯ হাজার টন, শিল্প লবণ লাগবে ৬ লাখ ৬৬ টন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, লবণের ভবিষ্যৎ চাহিদার যে খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে, তা চূড়ান্ত করতে কাজ চলছে। শিল্প খাতে লবণের প্রকৃত চাহিদা জানাতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (বিডা) ও ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইকে অনুরোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া, শিল্পের জন্য ব্যবহৃত সোডিয়াম সালফেট আমদানির পর যাতে বাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে বিক্রি হতে না পারে, সেজন্য সোডিয়াম সালফেট আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার শর্ত আরোপ করার বিষয়েও কাজ চলছে।

মানবদেহের জন্য বিষাক্ত শিল্প লবণ (সোডিয়াম সালফেট) খোলাবাজারে খাবার লবণ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। বাজারে খাবার লবণের (সোডিয়াম ক্লোরাইড) দাম অনেক বেশি হওয়ায় একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে তা ভোজ্য লবণ হিসেবে বাজারে ছাড়ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ট্যারিফ কমিশন বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে খাবার লবণ ও শিল্প লবণের দর দেশের বাজারের খাবার লবণের চেয়ে অনেক কম। আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী খাবার লবণ আমিদানি নিষিদ্ধ থাকায় শিল্প লবণ আমদানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। চাহিদার দ্বিগুণের বেশি আমদানি হওয়া শিল্প লবণ খোলাবাজারে ভোক্তা লবণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) হিসাব অনুযায়ী, দেশে ভোজ্য লবণের চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ লাখ টন। আর শিল্প লবণের চাহিদা ৩ লাখ ৮৩ হাজার টন। কিন্তু গত অর্থবছর দেশে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৮ টন লবণ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সোডিয়াম ক্লোরাইড ৮ লাখ ৯০ হাজার ১৮০ টন, সোডিয়াম সালফেট ৫ লাখ ২৪ হাজার ৮৪ টন ও সোডিয়াম সালফেটস ২৬ হাজার ৫৩০ টন আমদানি হয়েছে। ট্যারিফ কমিশন বলছে, শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা এসব সোডিয়াম সালফেট সোডিয়াম ক্লোরাইডের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ লবণ কল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোডিয়াম সালফেট দেখতে খাবার লবণের মতোই, স্বাদও একই। কিন্তু এটি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা তা সরাসরি প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত