মিয়ানমারে আবার রোহিঙ্গা হত্যা, অনুপ্রবেশের আশঙ্কা

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ০২:২৩ এএম

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যেই মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাশূন্য করার কাজ করছে দেশটি। এর অংশ হিসেবে রাখাইনে হেলিকপ্টার দিয়ে হামলা চালিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যাতে মিয়ানমারে ফিরে যেতে না চায়Ñ সেই কৌশলের অংশ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মিয়ানমারের এমন অভিযানের কারণে বাংলাদেশ সীমান্তে আবারও রোহিঙ্গাদের ঢল নামতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এখনই জাতিগত নিধনের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চাওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, যখনই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সামনে আসে, তখনই রাখাইনে অবশিষ্ট থাকা রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনী নির্যাতন চালায়।

সর্বশেষ গত বুধবার রাতে মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক হেলিকপ্টার থেকে চালানো হামলায় ৫ রোহিঙ্গা নিহত ও অপর ১৩ জন আহত হয়েছে। রাখাইনের একটি বাঁশঝাড়ে এই হামলার ঘটনা ঘটে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সংবাদ প্রকাশ করেছে। হামলার ঘটনাটি ঘটেছে বুথিডং শহরে এক রোহিঙ্গা মুসলিম পরিবারের বাড়িতে। তবে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র এই হামলার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কূটনীতিকরা বলছেন, ২০১৭ সালের আগস্টেও বুথিডং শহরেই সেনাবাহিনী নির্যাতন চালায়। তাদের আশঙ্কা, নতুন করে হেলিকপ্টার হামলার পর আবারও রোহিঙ্গাদের ঢল নামবে বাংলাদেশ সীমান্তে। তারা বলেছেন, মার্কিন কংগ্রেসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর অবরোধ আনতে বাংলাদেশকে উদ্যোগ নিতে হবে। আর যেন কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে ঢুকতে না পারে সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে কঠিন চাপে ফেলতে হবে মিয়ানমারকে।

কূটনীতিকরা আরও বলেছেন, মিয়ানমার যা কিছু করে চীনের শক্তি নিয়েই করে। তাই আমাদের চীনের সমর্থন নিতে হবে। আর এই সমর্থনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চীনের প্রধানমন্ত্রী শি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করতে হবে। তারা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চীনের হাতে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রত্যাবাসন ইস্যুতে মিয়ানমার সব সময়েই অসহযোগিতা করে আসছে। জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভেটোর কারণে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন বাংলাদেশকে সমর্থন দিচ্ছে না। গত দুই বছরে বাংলাদেশ থেকে চারটি প্রতিনিধিদল চীন সফর করেছে। কিন্তু চীন এ ব্যাপারে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ ভূমিকা নিয়েছে। সম্প্রতি চীনের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে সফরে এলে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এ বছরই চীন সফর করতে পারেন। তিনি বলেন, গত বুধবারের ঘটনার পর গতকাল কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় মিয়ানমারের সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা হচ্ছে। আশা করছি চীন ও রাশিয়া এবার আমাদের সমর্থন দেবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিদেশ সফরে এবং বাংলাদেশ সফরে আসা বিদেশিদের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তবে আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।’

সাবেক কূটনীতিক ওয়ালী উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চাইতে হবে। আর বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে চীনের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান আনতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদে চীন বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন দিলেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী থামবে।’ এ ছাড়া অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে টিম গঠনের পক্ষেও মত দেন তিনি।

রয়টার্সের এক সংবাদে বুথিডংয়ের আইনপ্রণেতা মাউং কিয়াউ জান জানান, আহতদের কয়েকজনকে স্থানীয় শহরে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার আগেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আহতদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি আকাশপথে গুলির কথা। যদিও সেখানে কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।’ এই হামলার বিষয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুন তুন নাইয়ি জানান, যথাসময়ে ঘটনাটি সম্পর্কে ‘সঠিক সংবাদ’ প্রকাশ করা হবে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে রাখাইনের ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত