সাবেক দুই এমপির অবৈধ সম্পদের অভিযোগ দুদকে

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ০২:২৪ এএম

আওয়ামী লীগের সাবেক দুই সংসদ সদস্য (এমপি) চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ করে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারা হলেন নোয়াখালী-৬ আসনের (হাতিয়া) এমপি আয়েশা ফেরদৌসের স্বামী একই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাবেক দুই এমপির অবৈধ সম্পদের অভিযোগ দুদকেমোহাম্মদ আলী ও চাঁদপুর-৪ আসনের (ফরিদগঞ্জ) সাবেক এমপি ড. মো. শামসুল হক ভূঁইয়া। তারা দুজন দশম জাতীয় সংসদে এমপি ছিলেন। দুজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎসহ জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক এই অনুসন্ধান শুরু করে। শামসুল হককে আগামী ১৭ এপ্রিল দুদকে হাজির হতে নোটিস দেওয়া হয়েছে। দুয়েক দিনের মধ্যেই মোহাম্মদ আলীকেও নোটিস দেওয়া হবে বলে দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দুদক পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘জনাব মোহাম্মদ আলী, সাবেক সংসদ সদস্য নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) ও বর্তমান সংসদ সদস্য নোয়াখালী-৬ এর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি টাকা আত্মসাৎপূর্বক জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।’ চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ধানমণ্ডির গোলাম রহমান সিকদারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কেবল মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করার জন্য কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালী-৬ আসনের বর্তমান এমপি ও মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী আয়েশা ফেরদৌস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সঠিক বলে আমি মনে করি না। আপনারা যেখানে খোঁজ নেওয়ার সেখানে খোঁজ নিলে, পাবলিকের সঙ্গে কথা বললে বিষয়গুলো জানতে পারবেন। আমাদের এনিমি (শত্রু) কেউ এসব অভিযোগ দিয়েছে। এসব নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না। দুদক অনুসন্ধান করতে চাইলে করুক।’

দুদকের পাওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে,  আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রচুর অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। তার ও স্ত্রীর নামে শেয়ারবাজারে কয়েকশ কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। ধানমণ্ডিতে চার কাঠা জমিতে ৫ তলা বিলাসবহুল বাড়ি, নোয়াখালীতে ৪০ বিঘা, গাজীপুরে চার বিঘা, ঢাকার পূর্বাচলে তিন বিঘা জমি আছে তাদের। আর এর সবই হয়েছে অল্প দিনে। মূলত অবৈধপথে তারা এসব সম্পদ অর্জন করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়, আয়েশা ফেরদৌসের স্বামী মোহাম্মদ আলীর নির্দেশে পৌরসভা নির্মাণে সরকারের যত বরাদ্দ আসে, সেসব তছরুপ করতে নির্মাণকাজে কখনই দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় দেওয়া হয় না। মোহাম্মদ আলীর নির্দেশ ছাড়া পৌরসভার কোনো দরপত্রে কোনো ঠিকাদার অংশ নিতে বা কাজ করতে পারেন না। তাদের ধানমণ্ডির বাড়িটি তৈরিতে এই দম্পতি চার কোটি টাকা ব্যয় করেছেন।

মোহাম্মদ আলী ও আয়েশা ফেরদৌসের বিরুদ্ধে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও ৬২ পৃষ্ঠার অভিযোগ পেয়েছে দুদক। তাতে দেখা যায়, বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার পরও এই পরিবারটি ভূমিহীন পরিচয় দিয়েছে। বর্তমান ও সাবেক এই দুই সাংসদ দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তাদের নিজ নামে ভূমি বন্দোবস্ত নেওয়ার পাশাপাশি দুই ছেলে, মেয়ে ও পুত্রবধূর নামে ভূমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি ভূমিহীনদের মধ্যেও চরম ক্ষোভ রয়েছে।

অভিযোগে সংযুক্ত নথিতে দেখা যায়, ২০০৩ সালের দিকে নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভূমিহীন পরিবারের লোকজন হাতিয়া বাজারের ভূমি অফিসসংলগ্ন এলাকায় বসবাস করছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ওই জমি থেকে প্রথমে প্রকৃত ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে জায়গাটি দখলে নেয় মোহাম্মদ আলীর পরিবার। এরপর ভূমি অফিসের মাধ্যমে এক বছরের জন্য জমিটি লিজ নেয়। ভূমিহীন পরিচয়ে বন্দোবস্ত নেওয়া জমিতে বর্তমানে বহুতল ভবন নির্মাণ করে হোটেল ব্যবসা শুরু করছেন তারা। পরে তারা জমিটিকে কৃষি খাসজমি হিসেবে ৯৯ বছরের জন্য বন্দোবস্ত নেওয়ার জন্য আবেদন করছেন এবং এমপি নিজের প্রভাব খাটিয়ে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। মাত্র এক বছরের জন্য বন্দোবস্ত নিয়ে এই সাংসদ পরিবার জায়গাটিতে পাঁচতলা ভবন তৈরি করে মেয়ে সুমাইয়া আলী ইশিতার নামে ‘ইশিতা আবাসিক হোটেল’-এর ব্যবসা শুরু করেছেন। এ ছাড়াও মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা, চাঁদাবাজি, দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ নেতাকর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে, যার বিবরণ দুদকে জমা পড়া অভিযোগে দেওয়া হয়েছে।

চাঁদপুরের এমপিকে নোটিস : এদিকে চাঁদপুরের সাবেক এমপি ও অপর আওয়ামী লীগ নেতা ড. মো. শামসুল হক ভূঁইয়াকে দুদকে তলব করা হয়েছে। তিনি অ্যাপোলো গ্রুপের সিইও ও ঠিকাদার। অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত গতকাল বৃহস্পতিবার জারি করা নোটিসে তাকে আগামী ১৭ এপ্রিল দুদক কার্যালয়ে সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে উল্লেখ করা হয়, ‘শামসুল হক ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শত শত কোটি টাকা অবৈধভাবে লেনদেন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎসহ জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আপনার বক্তব্য শ্রবণ ও গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।’ শামসুল হক বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও ঢাকাস্থ চাঁদপুর জেলা সমিতির সভাপতি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত