টেকসই প্রবৃদ্ধিতে ৪ খাতে সংস্কারের পরামর্শ

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ০২:৩৩ এএম

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের একটি হবে বলে মনে করছে প্রধান উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক। এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চারটি খাতে ধারাবাহিক সংস্কার অব্যাহত রাখারও পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংক বলছে, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে সেটি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এছাড়া খেলাপি ঋণকে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা চিহ্নিত করে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে দেশের অর্থনীতির ওপর ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটির চুম্বকাংশ উপস্থাপন করেন ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট জে সাওম ও প্রতিবেদনটি প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বিশ্বব্যাংক বলছে, চলতি অর্থবছরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি টেকসই প্রবৃদ্ধিতে ৪ খাতে সংস্কারের পরামর্শ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী পাঁচ দেশের একটি হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের চেয়ে প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকবে এমন বাকি চার দেশের মধ্যে আছে ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, ভুটান ও ভারত।

সংস্থাটির মূল্যায়নে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি চলমান। এ প্রবৃদ্ধিতে শিল্প খাত বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। এছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ক্ষত তৈরি করছে। পাশাপাশি রাজস্ব আয় দুর্বল ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কম। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির সার্বিক মূল্যায়নে চলতি অর্থবছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছিলেন, এবারে প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।

একই উপাত্ত ব্যবহার করে প্রবৃদ্ধি হিসাব করা সত্ত্বেও সরকারের হিসাবের সঙ্গে পার্থক্য হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ড. জাহিদ সাংবাদিকদের জানান, প্রবৃদ্ধিতে যেসব বিষয় ভূমিকা রাখে যেমন ব্যক্তি খাত ও সরকারি বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি, শিল্পোৎপাদন, ভোগ ইত্যাদি বিষয়ের উপাত্ত অর্থনীতির তত্ত্বের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে তারা এ পরিমাণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন দিয়েছেন।

এদিকে প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতে মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণকে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি নন-পারফরমিং ঋণ (এনপিএল) ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায় তাহলে ছয়টি ব্যাংক ন্যূনতম ব্যাংকিং নিয়ম-কানুন অনুসরণে ব্যর্থ হবে। এ হার যদি ৯ শতাংশ হয়, তাহলে ২৯টি ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়বে। আর ১৫ শতাংশ হারে এনপিএল বাড়লে ৩৫টি ব্যাংক ব্যাংকিং কার্যক্রমের ন্যূনতম শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হবে।

শীর্ষ ১০ ঋণগ্রহীতা যদি খেলাপিতে পরিণত হয় তাহলে পুরো আর্থিক খাতে কেমন প্রভাব পড়বে তারও এটি চিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে বলা হয়, যদি তিনজন শীর্ষ ঋণগ্রহীতা খেলাপি হন তাহলে ২১টি ব্যাংক মূলধন সংকটে পড়বে। শীর্ষ তিন গ্রহীতা খেলাপি হলে মূলধন সংকটে পড়বে ৩১টি ব্যাংক। আর শীর্ষ ১০ ঋণগ্রহীতা খেলাপিতে পরিণত হলে তা প্রভাবিত করবে ৩৫টি ব্যাংককে। এছাড়া সরকার খেলাপি গ্রাহকদের ৯ শতাংশ সরল সুদে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের যে সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, তাতে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আর্থিক খাতে ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাত সঠিকভাবে নিয়ম মেনে ব্যাংকিং কার্যক্রম করছে কি নাÑ তা পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত