বিজিবি আর গরু চেক করবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ০২:৩৬ এএম

এখন থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কোনো সদস্য রাস্তাঘাটে গরু চেক করবে না। কারও গোয়াল ঘর বা উঠানে গিয়ে ভারতীয় গরু খুঁজবে না। এসব কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় বিজিবি সদর দপ্তরের দরবার হলে সীমান্ত এলাকায় বিদ্যমান সমস্যা ও করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে বিজিবির সংঘর্ষের সময় যে তিন গ্রামবাসী নিহত হয়, তার প্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজিবি সীমান্ত পাহারা দেবে। সেখানে ৫০০ গজের মধ্যে কেউ না গেলেই হলো। এই পরিধি প্রয়োজনে আরও একটু কমিয়ে দেওয়া হবে। তবুও বিজিবি সীমান্তে চোরাচালান রোধে কাজ করবে।

বিজিবির গুলিতে গ্রামবাসীর তিনজন নিহতের ঘটনার তদন্ত বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এই ঘটনায় বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি হয়েছিল। বিজিবি নিজেও ঘটনাটি তদন্ত করছে। এ বিষয়ে মামলা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদন আমরা হাতে পেয়েছি আর কিছু এখনো হাতে আসেনি। সব প্রতিবেদন একসঙ্গে এলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সীমান্তে হত্যা বিষয়ে তিনি বলেন, অতি উৎসাহিত কিছু লোক বর্ডার এরিয়া ক্রস করে চলে যায়। যার ফলে কিছু গুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটে। সেটি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

মাদকের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তেমনি করে বিজিবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, মাদকের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিজিবির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। হয়তো সেটা বাইরে প্রকাশ পায় না। কারণ বিজিবির নিজস্ব একটি আইন আছে, সেই আইনেই তাদের বিচার হয়ে থাকে।

সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র আসে, তা হলে কি সীমান্ত পাহারা ঠিক মতো হচ্ছে না জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, বিজিবি সোচ্চার আছে। আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সচেষ্ট রয়েছে। অচিরেই থার্মাল সেন্সর বসানো হবে। যাতে করে সীমান্ত দিয়ে কেউ অস্ত্র নিয়ে দেশে প্রবেশ করতে না পারে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দেশের কোথাও কোনো ক্রসফায়ার হচ্ছে না। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাদকের সন্ধান পেয়ে উদ্ধার করতে গেলে মাদক কারবারিরা অবৈধ অস্ত্র দিয়ে গুলি চালায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও গুলি চালায়। তখন তারা বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়।

বিজিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত বিজিবির দরবার হলে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ সীমান্তবর্তী ৩২ জেলার বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রী, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, নৌ ও পরিবহনমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, সমাজকল্যাণমন্ত্রী নূরুজ্জামান আহমেদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাবেক রেলমন্ত্রী মজিবুল হকসহ পুলিশের আইজি, র‌্যাবের ডিজি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন আট বিভাগীয় কমিশনার, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সচিবগণ, জেলা প্রশাসক, বিজিবি মহাপরিচালক, আইজিপি, র‌্যাবের মহাপরিচালক, বিজিবির সেক্টর প্রধান, রিজিওন্যাল প্রধান ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকে সীমান্তবর্তী এলাকার বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড ও তা রোধ করতে করণীয় কী কী হতে পারে, সে বিষয়ে সবার বক্তব্য শুনেছেন মন্ত্রী।

বৈঠকের পর সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিত উন্নয়নের জন্য সবার আগে মাদকের চাহিদা কমাতে হবে। এজন্য জনপ্রতিনিধিদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সীমান্তে সক্ষমতা আরও বৃদ্ধির জন্য এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ১৫ হাজার বিজিবি সদস্য নিতে বলেছেন। দুটি হেলিকপ্টারের এলসি হয়ে গেছে। আগামী বছর নাগাদ দেশে এসে পৌঁছাবে। একটি হেলিকপ্টার অত্যাধুনিক মানের। ২৬ জন সোলজার নিয়ে যেকোনো প্রান্তে ছুটতে পারবে। সীমান্ত এলাকায় তরুণদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজ করা হবে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। তার প্রমাণ জেলখানাগুলো দেখুন। জেলখানার ক্যাপাসিটি ৩৫ হাজারের একটু বেশি। সেখানে জেলে বাস করছেন এখন ৯০ হাজারেরও বেশি। তার অর্ধেক মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে জেলে এসেছে।

গরু আমদানির ব্যাপারে মন্ত্রী বলেন, ভারতীয় গরু আমদানি না হলে আমাদের লাভ। আমাদের কৃষকের লাভ বেশি। তারা খামার করে লাভবান হচ্ছে। সরকারিভাবে দেশে কোনো গরু আমদানি হয় না। যা হয় তা বেসরকারি পর্যায়ে। গরু আমদানি করতে বিট খাটাল করে দেওয়া হয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবন মান উন্নয়নের জন্য। সেটি আরও বাড়ানো যায় কি না তা চিন্তা করা হচ্ছে। তবে গরু আমদানি বেশি দিন থাকবে না। অচিরেই আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাচ্ছি। তখন গরু আমদানি টোটালি বন্ধ করে দেওয়া হবে।

নওগাঁর এমপি ও খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, সীমান্তে যেকোনো উপায়ে রাস্তা তৈরি এবং আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সোলারের মাধ্যমে হলেও। যানবাহনের ব্যবস্থাও করতে হবে। এ ছাড়া তিনি সীমান্ত এলাকার বিজিবির সদস্যদের জীবন মান উন্নয়নের জন্য ভালো পরিবেশ গড়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, দেশের প্রথম সরকার হয়েছিল মুজিবনগরে। মেহেরপুরে এখন মাদক কমেছে। এখানে পেট্রলপাম্প নেই।

লালমনিরহাটের এমপি ও সমাজ কল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪  সালে দেশে মদ নিষিদ্ধ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু নেই, কিন্তু ঠিকই দেশে মদ চলছে। এই মদপান বন্ধ করতে হবে। মাদক বাংলাদেশের তরুণদের শেষ করে দিচ্ছে।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মদ মাদক কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, উনি ভুল বলেছেন। মদ আসলে মাদক নয়। এটি তৃতীয় একটি মাদক। এটি সবাই গ্রহণ করে না। এটি বাংলাদেশেও তৈরি হয়। উনি মাদককে বোঝাতে গিয়ে হয়তো মদ শব্দ ব্যবহার করে থাকতে পারেন। আইজিপিকে সীমান্ত এলাকায় দুর্বল ওসিদের পোস্টিং না দিয়ে একটু শক্তিশালী ওসি পোস্টিং দেওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, সীমান্তে পাচারের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। আগে শাড়ি, কাপড়, ফেনসিডিল ও গরু পাচার হতো। এখন পাচার হয় ইয়াবা ও অস্ত্র। সীমান্তে পুলিশ এবং বিজিবি যৌথ টহল দিলে পরিস্থিতির হয়তো আরও উন্নতি হবে। সীমান্তে পুলিশ মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকলে আমাদের জানান। আমরা ব্যবস্থা নেব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত