প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, দেখলাম আমেরিকা একটা সিকিউরিটি অ্যালার্ট দিয়েছে, এই অ্যালার্ট কেন দিল? এটা আমাদের জানার বিষয়। কী কারণে তারা অ্যালার্ট দিল তারা সেটা কিন্তু আমাদের কাছে বলেওনি, ব্যাখ্যাও দেয়নি। যদি ভবিষ্যতে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে তবে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের জানানো।
শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদে সভার শুরুতে দেওয়া বক্তব্যে এসব বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদিও আমি ইতিমধ্যে নির্দেশ দিয়েছি গোয়েন্দাদের যে কী কারণে অ্যালার্ট দিয়েছে, তাদের কাছে কোনো তথ্য আছে কি না। যদি কোনো তথ্য থাকে, কোন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তাদের একটা দায়িত্ব আছে আমাদের অন্তত সেই বিষয়টা জানানো। বা আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জানানো। যেন আমরা তা মোকাবিলা করার ব্যবস্থা নিতে পারি। কিন্তু হঠাৎ আগুন লেগেছে সেখানে- আগুন তো সব দেশেই লাগে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই আমেরিকায়ও একটা সার কারখানা থেকে শুরু করে হাসপাতাল সবই পুড়ে শেষ। কতজন মারা গেছে সেই খবর কেউ জানেও না। এ রকম বহু ঘটনা ঘটেছে। লন্ডনে আগুন লেগে ৭০ জন মারা গেল। আরো যে কত লোক মারা গেছে সেটার হিসেবও নেই। সেখানে হিসেবও হয় না। উদ্ধার কাজও আমাদের মতো এত দিন কেউ চালায় না।
তিনি বলেন, সন্ত্রাস একটা সমস্যা। এই সন্ত্রাস শুধু আমাদের দেশে না সারা বিশ্বের সমস্যা। কিন্তু বাংলাদেশে অন্তত সফলতার সঙ্গে এই জঙ্গিবাদ দমন করতে পেরেছি। আমরা যথেষ্ট সজাগ, আমাদের ইন্টেলিজেন্স সব সময় সজাগ। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব সময় সতর্ক। এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে আমরা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি।
শেখ হাসিনা বলেন, এখন যদি তাদের কাছে কোনো তথ্য থাকে, তবে তাদের কর্তব্য আমাদের জানানো। গত কয়েক দিন থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আগুন লাগল বহুতল ভবনে, এর পরপরই আগুন লাগল মার্কেটে। প্রতিদিনই এই আগুন। যদিও প্রতি চৈত্র-বৈশাখ মাসে আগুন লাগার একটা প্রবণতা থাকে।
তিনি বলেন, তারপরও আগুন লাগার ঘটনায় আমাদের ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স খুব দ্রুততার সঙ্গে উদ্ধার কাজ চালিয়েছে। যার মধ্যে একজন ফায়ার সার্ভিস সদস্য গুরুতর আহত হন। তার চিকিৎসার জন্য ইতিমধ্যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে। তাকে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, তার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। তা ছাড়া যারা আহত হয়েছিল তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, ফায়ার সার্ভিস যখন অগ্নিনির্বাপণে যায় আমাদের কিছু লোক খামাখা উত্তেজিত হয়ে সেই ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মারে। একটা গাড়ি পর্যন্ত ভেঙে দিয়েছে। প্রায় ৯/১০ কোটি টাকার গাড়ি। সেই গাড়ির ওপর হামলা করে গাড়ি ভেঙেছে। দেরি হচ্ছে কেন, তাকে মারছে। তাকে না মেরে অন্তত এক বালতি পানি নিয়ে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করত বা কীভাবে উদ্ধার কাজ করা যায় সেই চেষ্টা করত, তবে তারা একটা ভালো কাজ করেছে বলে আমরা বিবেচনা করতাম। কিন্তু যারা উদ্ধার করতে যায় তাদের বাধা দেওয়া, তাদের ওপর হামলা করা এটা কোন ধরনের কথা?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আরেকটা হচ্ছে আগুন লেগেছে দুনিয়ার লোক সেখানে গিয়ে হাজির। ফায়ার সার্ভিস ঢুকতে পারে না। মানুষ যেতে পারে না। এটা কোন ধরনের একটা ব্যাপার। সবাই দেখতে যায়, সেলফি তুলে, ছবি তোলে, এখানে সেলফি তোলার কী হলো এটা আমি বুঝত পারি না। সেলফি না তুলে কয়েক বালতি পানি নিয়ে আসুক। বা আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থা করুক। উদ্ধারের কাজ করুক। সেলফি তোলে, কী আনন্দ! সত্যি এটা আমার কাছে খুব অবাক লাগে। বাংলাদেশের মানুষের এই মানসিকতাটা পরিবর্তন করতে হবে।
এ সময় তিনি সাধুবাদ জানান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসায়। তিনি বলেন, তারা ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, ফায়ার সার্ভিসকে রাস্তা করে দিয়েছে। মানুষ সব সময় দায়িত্বশীল আচরণ করবে এটাই আমরা চাই।
এসব সময় মিডিয়ারও ভূমিকা আছে দাবি করে তিনি বলেন, মিডিয়াতে যখন দেখায় মানুষ আরো বেশি আকর্ষণ হয় আরো বেশি ছুটে যেতে চায়। সেখানে মিডিয়ার একটা ভূমিকা রয়েছে।
ঢাকায় অসংখ্য খাল ছিল দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক ঢাকায় এত খাল ছিল, এত পুকুর ছিল, অথচ এখন নাই। পানির অভাব। একটা পর্যায়ে পানির জন্য হাহাকার। যদিও ওয়াসার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত পানি আছে। যারাই কোনো স্থাপনা করবে সেখানে যেন জলাধার টিকে থাকে। আর পুকুর দেখলে তার মধ্যে দালান করা এটাও একটা প্রবণতা।
এ সময় গুলশান লেকের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই লেক এখন যা আছে তার দ্বিগুণ চওড়া ছিল। একেক জন ক্ষমতায় এসেছে, জিয়া এসেছে অর্ধেক ভরাট করে প্লট বানিয়ে দিয়েছে। এরশাদ এসেছে প্লট বানিয়েছে। খালেদা জিয়া এসে প্লট বানিয়েছে। এভাবে বানাতে বানাতে লেকের অর্ধেক আছে। আর বনানী লেকটা তো বন্ধই।
তিনি বলেন, এভাবে জলাধারগুলো একেক করে বন্ধ করা। এটা বোঝা উচিত যে, আগুন লাগলে পানি নাই। ভূমিকম্প হলে কোথাও গিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা নাই। তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াল।
শেখ হাসিনা বলেন, দালানগুলো এমনভাবে বানানো হয় যে তার ফায়ার এক্সিট, ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন করতে গিয়ে ফায়ার এক্সিট বন্ধ। সেখান দিয়ে কারো ওঠার উপায় নাই, নামারও উপায় নাই। মার্কেটগুলোতে ফায়ার এক্সিট মাল রাখার জন্য স্টোরেজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগুন লাগলে দায়িত্ব হচ্ছে ফায়ার ব্রিগেড আগুন নেভাবে। কিন্তু আগুন যাতে না লাগে যারা দালানগুলো বানায়, যারা বসবাস করে যারা ব্যবহার করে তাদেরও দায়িত্ব আছে। সেই দায়িত্বটাই পালন করা হয় না। আর সবকিছু হলে দোষ হলো সরকারের।
যারা স্থাপনাগুলো ব্যবহার করছেন তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব, যেন সেখানে আগুন না লাগে। অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা যেন থাকে। আর সঙ্গে কী করতে হবে সেটাও যেন দেওয়া থাকে। প্রতি ইঞ্চি জায়গা লাভজনক ব্যবহারের জন্য নিজেদের সর্বনাশটা যেন কেউ ডেকে না আনে। সর্বস্বান্ত না হন।
