ড. কামালের সঙ্গে বিএনপির আবারও ঝামেলা লেগেছে বলে মনে হচ্ছে। গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, গত ৩১ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। সেখানে সব বক্তা দুর্নীতির দায়ে দণ্ডীত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করলেও প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন তা করেননি। বরং তিনি বলেছেন, ‘যাদের অন্যায়ভাবে বন্দি রাখা হয়েছে তাদের মুক্ত করা হোক’। শুধু তাই নয়, তার দলের সাধারণ সম্পাদক কানে কানে কিছু বলতে গেলে তিনি ক্ষেপে যান এবং বলেন, ‘কোনো কিছু বলব না। যা বলেছি এটাই বলব’। তার এ ‘ফাঁকিবাজি’ দাবি ও ‘একগুঁয়েমি’তে ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতাকর্মীরা তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ করেছেন। তারা এমনকি সভা শেষ হওয়ার পরও ড. কামালের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছেন।
ওই একই সভায় ড. কামাল বিএনপি নেতাকর্মীদের আরেকটি দাবিও নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের দাবি ছিল, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু ড. কামাল তার ভাষণে তা না বলে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা, তার নেতৃত্বেই স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছে। এ নিয়ে কোনো বিতর্ক চলবে না।’ তার এ বক্তব্যও বিএনপি নেতাকর্মীদের ক্ষুব্ধ করেছে।
তার দলের সাধারণ সম্পাদক নাকি বলেছেন, ঐক্যের স্বার্থে কিছু কিছু ‘আপস’ করতে হয়। জবাবে ড. কামাল নাকি বলেছেন, শেষ বয়সে এসে ‘ইতিহাস বিকৃত’ করতে পারব না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করতে হলে বঙ্গবন্ধুকে মানতে হবে। বোঝা যায়, ড. কামালের সঙ্গে বিএনপির রসায়ন জমছে না, আর কখনো তা জমারও কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ ড. কামালের পক্ষে যেমন বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া সম্ভব নয়, তেমনি বিএনপির পক্ষেও বঙ্গবন্ধুকে মেনে নেওয়া অসম্ভব শুধু নয়, এক প্রকার আত্মহত্যার শামিল। ড. কামালের পক্ষে বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ,
প্রথমত, তার দল গণফোরাম তৈরি হয়েছে মূলত আওয়ামী লীগ থেকে তার সঙ্গে বের হয়ে আসা নেতাকর্মী এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ছেড়ে আসা নেতাদের নিয়ে, যারা সবসময়ই বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা মেনে এসেছেন। তাছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান ও তার দল বিএনপির উত্থানকে যারা দেশ ও জাতির জন্য ইতিবাচক কিছু বলে মনে করেন না তাদের প্রায় সবাই বরাবরই ছিলেন সেই দলের লোক। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গণফোরাম যেমনই হোক, ড. কামালের একটা সামাজিক ভিত্তি আছে এবং তা তিনি ধরে রেখেছেন এ বলে যে, আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দিয়েছে, তিনি বঙ্গবন্ধুকে আঁকড়ে ধরে আছেন। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো প্রকার আপস তার রাজনৈতিক-সামাজিক ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দেবে।
অন্যদিকে, বিএনপি গড়েই উঠেছে শুধু আওয়ামী লীগ বিরোধী নয় বঙ্গবন্ধুবিরোধী নানা রেটরিক (বাগাড়ম্বর) ব্যবহার করে। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের প্রধান বেনিফিশিয়ারি বিএনপি, কথাটা এমনি এমনি বলা হয় না। এ কারণেই স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের বছরগুলোতে, মূলত বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের অনুকূল একটা পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনে এবং পরবর্তী সময়ে এ বর্বরোচিত হত্যাকা-কে জায়েজ করার লক্ষ্যে, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার সম্পর্কে যেসব গুজবের প্লাবণ সৃষ্টি করা হয়েছিল, বিএনপি তার লিগাসির পুরোটাই বহন করে চলেছে।
জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে একজন সামনের সারির সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, ঘটনাচক্রে তিনিই সামরিক বাহিনীর একমাত্র লোক যিনি কয়েকজন রাজনীতিক এবং সংস্কৃতি ও সংবাদকর্মীর পাশাপাশি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করার সুযোগ পেয়েছিলেন এসব কথা সত্য। কিন্তু এ সব কিছুকে অযৌক্তিকভাবে টেনে লম্বা করে জিয়াকে যে শুধু স্বাধীনতার ঘোষক নয়, বঙ্গবন্ধুকে ছাপিয়ে রীতিমতো মুক্তিযুদ্ধে জনগণের ত্রাতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলে তা বিএনপির টিকে থাকার জন্যই জরুরি। এ জন্যই দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক দশক ধরে বঙ্গবন্ধু যতই স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন, ততই জিয়াকেন্দ্রিক মিথগুলো ভেঙে পড়ছে এবং একইসঙ্গে আওয়ামী লীগ জনগণের মাঝে দৃঢ় ভিত্তি পাচ্ছে আর বিএনপি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
বিএনপি যে বহু চেষ্টা করে ড. কামালের সঙ্গে ঐক্য করেছে তা তার এ দুর্বলতারই প্রকাশ। আজ ২০ দলীয় যে জোটটি আছে তাদের বেশিরভাগের সঙ্গে দলটি অনেক বছর ধরে জোট-চর্চা করছে। কিন্তু এতে তাদের শক্তি বেড়েছে তা কেউ বলবে না, বরং ভোটের হিসাবে যে-লাউ সে-কদুই আছে বলে অনেকের ধারণা। তা-ই থাকার কথা। কারণ এ জোটের সবকটি দল রাজনৈতিক মেরুকরণের দিক থেকে বরাবরই বিএনপি-শিবিরভুক্ত। আওয়ামী বা উদারনৈতিক শিবির থেকে, যে-অংশে ভোট বেশি বলে সবার ধারণা, ভোট টানার ক্ষমতা এদের কারোরই নেই, যা না হলে অন্তত বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখা অসম্ভব বলেই সবাই মনে করেন। ড. কামালকে সঙ্গে পেয়ে এ ঘাটতি পূরণ হতে পারে বলে শুধু বিএনপি-সমর্থকরা নন অনেক আওয়ামী সমর্থকেরও ধারণা ছিল। কিন্তু বিএনপি ও ড. কামালের ঐক্য যে ওই কাজটি করতে পারেনি তা-ই এখন বাস্তবতা। আর এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশ্নে দুপক্ষের মধ্যকার তেল ও জলের ব্যবধান যে একটা ভূমিকা রেখেছে তা-ও অস্বীকার করা যাবে না।
এখানে উল্লেখ্য, ড. কামাল শুধু বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে বিএনপি থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছেন তা নয়। উভয়ের মাঝে একই রকম দূরত্ব জামায়াত প্রশ্নেও আছে। আপাদমস্তক সেক্যুলার ড. কামাল এরই মধ্যে একাধিকবার বিএনপির সঙ্গে এ দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির শিরোমণি জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ঐক্যফ্রন্টে বিএনপিকে আনার আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিএনপিকে তার সঙ্গ পেতে হলে জামায়াত-সঙ্গ ছাড়তে হবে, যদিও তা তিনি তখন রক্ষা করতে পারেননি। আবার ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তিনি ভারতীয় এক পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, বিএনপি নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করবে জানলে তিনি বিএনপির সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করতেন না। নির্বাচনের পরেও তিনি, বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে হবে, এমন কথা বলেছেন।
বিএনপি-সমর্থক অনেকের ধারণা যে, ড. কামালের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য তার দলকে প্রথমবারের মতো দুটো সাংসদ এনে দিলেও বিএনপিকে কিছুই দেয়নি, বরং বিএনপির আম-ছালা দুটোই যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ড. কামালের কারণেই ‘সহোদর’ জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাই বিএনপির ভেতরে এখন ঐক্যফ্রন্টবিরোধী কথাবার্তা জোরেশোরে উঠছে।
