এ নৃশংসতা মেনে নেওয়া যায় না

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৪৫ পিএম

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে যেতে হয়। এমন বর্বরতাও কি সম্ভব? মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা নুসরাতকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেছে বলে অভিযোগ করে মামলা করেছিল নুসরাতের পরিবার। গত ২৭ মার্চ ঘটনার দিনই যৌন নিপীড়নের মামলায় গ্রেপ্তার হন সিরাজ। কিন্তু বারংবার চাপ সত্ত্বেও মামলা তুলে নিতে অস্বীকার করে নুসরাত ও তার পরিবার। এরপর শনিবার আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে পরীক্ষার হল থেকে কৌশলে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে যায় তারই সহপাঠী কয়েকজন ছাত্রী। মুখে কাপড় বাঁধা ওই ছাত্রীরা মামলা তুলে নিতে চাপ দেয় নুসরাতকে। তা না মানায়, গায়ে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে পালিয়ে যায় তারা। পুলিশের সহায়তায় উদ্ধারের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে নুসরাত।  চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নুসরাতের শরীরের ৭৫ ভাগই আগুনে দগ্ধ হয়ে গেছে।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এ ঘটনায় অভিযুক্ত অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও চেক জালিয়াতিসহ ছয়টি মামলা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে বলেও জানিয়েছে নুসরাতের পরিবার এবং মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর আগে এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অপরাধে ধলিয়া ইউনিয়নের সালামতিয়া মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার হন সিরাজ। পরে বসুরহাট রঙ্গমালা মাদ্রাসা থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অপরাধে চাকরিচ্যুত হন সিরাজ। সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যোগ দেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। এখানে চাকরিরত অবস্থাতেই ফেনী শহরে ‘উম্মুল কুরা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সেখান থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিসহ স্থানীয় ক্ষমতাবানদের একাংশের যোগসাজশে অভিযুক্ত সিরাজ নানা অপকর্ম করেও বারবার পার পেয়ে যান। অবশেষে গত মাসে নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের মামলায় গ্রেপ্তার হন সিরাজ। এ ঘটনার পর সিরাজের বিচারের দাবিতে নুসরাতের পরিবার ও স্থানীয়রা এলাকায় মানববন্ধন করলেও তাকে রক্ষার চেষ্টা চালায় তার সহযোগী স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

দেশে একের পর এক ধর্ষণ ও ধর্ষিতাকে হত্যার ঘটনার মধ্যেই মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার এই ঘটনা ঘটল। তবে নুসরাত হত্যাচেষ্টায় নতুন যে বিষয়টি সামনে এলো সেটি হচ্ছে, এখানে অভিযুক্ত যৌন নিপীড়কের পক্ষে নুসরাতকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে তারই সহপাঠী কয়েকজন ছাত্রী! একটি সমাজ যখন কলুষিত হতে হতে একের পর এক মাত্রা ছাড়িয়ে রসাতলে পৌঁছায় কেবল তখনই এমনটা সম্ভব। নইলে সহপাঠীরা কী করে আরেক ছাত্রীকে এভাবে হত্যার চেষ্টা করতে পারে! এই ঘটনার বিশদ বৃত্তান্ত জানতে এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে এর সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে নানা অপকর্মের হোতা হিসেবে অভিযুক্ত এবং নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের মামলায় গ্রেপ্তার সিরাজ যাতে কোনোভাবেই আইনের ফাঁকফোকর গলে পার না পায় সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন কে বা কারা সিরাজকে বাঁচাতে কাজ করছে এবং তাদের ক্ষমতার উৎস কোথায়?  

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা। সন্তানকে সেখানে লেখাপড়া করতে পাঠিয়ে অভিভাবকদের নিশ্চিন্ত থাকার কথা। কিন্তু একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধেই যখন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে তখন বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়ন কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। আর সরকারিভাবে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত নানারকম মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নিপীড়ন-বলাৎকারের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো যৌন নিপীড়ন বন্ধে বিধিমালা বাস্তবায়ন করা যায়নি। মাদ্রাসাগুলো এমনিতেই শিথিল কাঠামোয় পরিচালিত বিধায় সেখানে এমন আইনি বিধানের প্রয়োগ আরও কঠিন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু সমাজের বাইরে নয়, তাই সামাজিক পরিসরে প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধের জন্য আমাদের আরও সোচ্চার হতে হবে। একইসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদগুলোকে যৌন নিপীড়ন বন্ধ করতে কঠোর জবাবদিহিতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।  নুসরাতকে যৌন নিপীড়ন ও হত্যাচেষ্টায় দায়ী সকল অপরাধীর যথাযথ শাস্তি এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুক। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত