বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ চালনার দায়িত্ব অযোগ্য পাইলটের হাতে দেওয়ার পাঁয়তারা খুবই উদ্বেগজনক। যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে দেশসেরা পাইলটদেরই বিমানের পাইলট হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কথা। কিন্তু ক্যাডেট পাইলট নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই যদি দুর্নীতি হয় তাহলে যোগ্য পাইলট তৈরি হবে কীভাবে? বিমানের ‘বি-৭৩৭’ এবং ‘ড্যাশ-৮’ উড়োজাহাজ চালনার জন্য ৩১টি শূন্য পদে ‘ক্যাডেট পাইলট’ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে উৎকণ্ঠাজনক হলো সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাই এই দুর্নীতির মূল হোতা বলে অভিযোগ উঠেছে।
গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এম মোসাদ্দিক আহাম্মদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির এই অভিযোগ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বজনপ্রীতির দৃষ্টান্ত হাজির করে নিজের ভাতিজা মোক্তাদির আহাম্মদকে ক্যাডেট পাইলট হিসেবে নিয়োগ দিতে গিয়ে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মোট ১৩ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন তিনি। শুরুতেই অযোগ্য প্রার্থীদের আবেদনের সুবিধার্থে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হয়। এর ফলে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভাতিজাসহ বেশ কিছু সংখ্যক প্রার্থী আবেদনের সুযোগ পান, অর্থাৎ তাদের এই পদে আবেদনেরই যোগ্যতা ছিল না। এরপর শিথিল করা হয় প্রার্থীর বয়সসীমাও। বিমানে অনুসৃত সাধারণ নিয়ম ভেঙে ৭৫ নম্বরের লিখিত ও ২৫ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষার বদলে ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার সঙ্গে আরও ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় এই নিয়োগের পরীক্ষায়। লিখিত নম্বরের সমান নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা শুধু বিমান নয় যে কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই নজিরবিহীন। আর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, তা সংশোধন এবং এই পরীক্ষা ও বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটিই করা হয়েছে বিমানের পরিচালনা পরিষদকে অন্ধকারে রেখে, নিয়মানুসারে তাদের না জানিয়ে। গত বছরের আগস্ট মাসে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভাতিজাসহ ৩২ জনকে প্রাথমিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় এই প্রক্রিয়ায়। ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হয়েছে কেবল ভাতিজা নয়, অবৈধপথে আরও কিছু প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটা ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ করেছেন বিমানের এই নির্বাহী প্রধান।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ক্যাডেট পাইলট নিয়োগ প্রক্রিয়ার এই ঘটনায় তদন্ত শুরু হয় একটি নামহীন এক উড়োচিঠির সূত্র ধরে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ওই চিঠি পাওয়ার পর একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিষয়টি তদন্ত শেষে গত ২ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে তা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো এই তদন্তে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হওয়ার মতো বেরিয়ে এসেছে যে, ‘২০০৯, ২০১০ ও ২০১৬ সালে যেসব নিয়োগ হয়েছে তার একটি সঙ্গে অন্যটির নিয়োগ প্রক্রিয়ার মিল নেই, সংস্থাটির সব নিয়োগই প্রশ্নবিদ্ধ।’ এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার পাশাপাশি তদন্ত কমিটি সংস্থাটির নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য একটি একক নীতিমালা প্রণয়ণের সুপারিশ করেছে। ঐতিহ্যবাহী এত বড় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় জনবল নিয়োগে সুনির্দিষ্ট কোনো ম্যানুয়াল বা নীতিমালা না থাকাটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
স্বাধীনতার পরপরই যাত্রা শুরু করা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বিভিন্ন সময়ে নানারকম দুর্নীতির অভিযোগে সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে লোকসানি প্রতিষ্ঠানের তকমা জুটেছে বিমানের। এসব অভিযোগ নিয়ে বিস্তর তদন্ত হয়েছে, সংস্থাটি পরিচালনার জন্য বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ এমনকি প্রধান নির্বাহী হিসেবে অভিজ্ঞ বিদেশিদের নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। সে সবের কিছু কিছু চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি। এ পরিস্থিতির মধ্যেও সম্ভাবনাময় সংস্থাটি আগের তিন অর্থবছরে লাভ করেছে। তবে, গত অর্থবছরে ২০১ কোটি টাকা লোকসান করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা লোকসান দেবে আর জনগণের করের টাকায় সেখানে ভর্তুকি দেওয়া হবে এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে অবিলম্বে বিমানের সব দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।