ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার পরীক্ষাকেন্দ্রে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গতকাল সোমবার দুপুরে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর পাঠানোর ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গতকাল বিকেলে তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অজ্ঞাত চারজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেছেন। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সর্বশেষ ১০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাচেষ্টায় জড়িত বোরকা পরাদের মধ্যে দুজন পুরুষ ছিল বলে মনে করছে পুলিশ।
গত শনিবার থেকে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নুসরাতের শ্বাসনালিসহ শরীরের ৭৫ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালামকে প্রধান করে আট সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল ডা. আবুল কালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নুসরাতের অবস্থা শুরু থেকেই আশঙ্কাজনক ছিল। সকালে তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুপুর ১২টার দিকে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।’
এরপর বিকেলে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বার্ন ইউনিটের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি নুসরাতের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা জেনেছেন। তার সমস্ত কন্ডিশন লিখিতভাবে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কন্ডিশন পারমিট হলে তাকে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।’
এদিকে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে নুসরাতকে দেখতে এসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন বলেন, ‘আমি দূর থেকে দেখেছি। তার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। আমার সঙ্গে তার বাবা-মা-ভাই-বোনরাও ছিল। তার বর্তমান অবস্থা তার ভাইবোনকে জানানো হয়েছে। যদি রোগীকে বাইরে নেওয়ার মতো অবস্থা থাকে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন তাকে বাইরে নিয়ে যেতে। সেই অনুযায়ী ডা. সামন্ত লাল সেন রোগীর চিকিৎসার কাগজপত্র এরই মধ্যে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। ওনারা (সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল) যদি মনে করেন রোগীকে নেওয়া যাবে, তাহলে দ্রুত সিঙ্গাপুর নেওয়া হবে। সিঙ্গাপুর থেকে রাতেই ফিডব্যাক পেতে পারি। ফিডব্যাক পেলেই তাকে পাঠানো হবে।’ রাতে তিনি জানান, আজ সকাল ৮টায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নুসরাতের শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ বিষয়ে আলোচনা হবে।
সোনাগাজী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গতকাল বিকেলে তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অজ্ঞাত চারজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেছেন। আগুন দেওয়ার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজনের নাম জানা যায়নি। বাকিদের মধ্যে ওই মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবছারউদ্দিন ও ছাত্রীর সহপাঠী আরিফুল ইসলামকে ঘটনার দিনই আটক করা হয়। অন্যরা হলেন দারোয়ান মোস্তফা, অধ্যক্ষের ফুপাশ^শুর ও ব্যক্তিগত সহকারী নুরুল আমিন, সাইফুল ইসলাম, আলাউদ্দিন এবং জসিমউদ্দিন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা ওই মাদ্রাসার আলিম শ্রেণির ছাত্রী নুসরাতকে ব্যক্তিগত সহকারী নুরুল আমিনের মাধ্যমে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। ওইদিন মেয়েটির মা সোনাগাজী মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করার পর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পর থেকে অধ্যক্ষের অনুসারী নুরউদ্দিন, জাভেদ, শাহাদাত হোসেম শামীম ও মহিউদ্দিন শাকিলসহ বেশ কয়েকজন মামলা তুলে নিতে চাপ দিতে থাকে। এরা সবাই সোনাগাজী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
এরপর গত শনিবার সকালে নুসরাত আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে মাদ্রাসায় গেলে তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপরে মারধর করা হচ্ছে বলে এক ছাত্রী খবর দেয়। এ কথায় নুসরাত চারতলার ছাদে গেলে বোরকা ও হাতমোজা পরা চারজন তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। নুসরাত অস্বীকৃতি জানালে তারা তার গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। আগুন দেওয়ার ঘটনায় অধ্যক্ষের উল্লিখিত অনুসারীদের মধ্যে কেউ কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে এজাহারে বলা হয়েছে। মামলার এজাহারে অজ্ঞাত আসামিদের কথা বলা হলেও যারা শ্লীলতাহানির মামলাটি তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল, তাদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল হাসপাতালে নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার মেয়েকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে শিক্ষক আফসারউদ্দিন আমার বড় ছেলেকে ফোন দিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে বলে। কিন্তু আমরা রাজি হইনি। অন্য পরীক্ষার দিন আমার ছেলে নুসরাতকে পরীক্ষার হলে সিটে বসিয়ে দিয়ে এলেও ঘটনার দিন তাকে গেটের ভেতরেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যে চারজন আগুন লাগিয়েছে তাদের হাতে মোজা ও চোখে কালো চশমা ছিল। তবে কণ্ঠ পরিচিত ছিল বলে নুসরাত আমাকে বলেছে।’
নুসরাতের ভাই নোমান বলেন, ‘অধ্যক্ষ মাদ্রাসাতে একটি পেটোয়া বাহিনী তৈরি করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে নুরউদ্দিন, শামীম, জাভেদ ও মহিউদ্দিন। এরাই বোরকা পরে মেয়ে সেজে এই কাজ করেছে। এরাসহ অধ্যক্ষের পক্ষের অন্যরা গা-ঢাকা দিয়েছে। শামীম ঢাকায় অবস্থান করছে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষের পক্ষে হুমকিদাতা শামীম মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধ্যক্ষ একজন সম্মানিত ব্যক্তি বলে তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন তার বিচার চাই। আমি ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় আছি। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঢাকাতেই থাকব।’
সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো বোরকা পরিহিতদের আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুজনকে কোর্টে চালান করা হয়েছে।’
ফেনীর পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, ‘বোরকা পরা চারজনের দুজন নারী এবং দুজন পুরুষ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের শনাক্তের জন্য অভিযান চলছে।’
এদিকে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টাকারীদের শাস্তির দাবিতে গতকাল বিকেলে শহরের ট্রাংক রোডে মানববন্ধন করেছে সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটি নামে একটি সংগঠন। সংগঠনের ফেনী জেলা শাখার সংগঠনের সভাপতি রোটারিয়ার মিজানুর রহমান রাজুর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে অংশ নেন সাধারণ সম্পাদক আফজালউদ্দিন রাসেল, সহসভাপতি আবুল কাশেম, উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, সদস্য সাইফুল ইসলাম, জাহেদুল হাসান সজিব, আবদুল্লাহসহ অনেকে। মানববন্ধনে সাইফুল ইসলাম লিহন, সুজন সরকার, আরিফুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেকে একাত্ম হন।
