জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব অনুভূত হচ্ছে

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৪৪ পিএম

বাংলাদেশে আবহাওয়া বর্তমানে যেভাবে যাচ্ছে তাতে এর পুরোটাই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। আমরা কথা বলছি চৈত্রের শেষ সপ্তাহে। কয়েকদিন ধরে প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে, আকাশে বজ্র বিদ্যুৎ দেখে মনে হচ্ছে বর্ষাকালের আকাশ। কালবৈশাখী হচ্ছে, গাছ-ডালপালা ভেঙে পড়ছে, পুরো বিষয়টি একদম স্বাভাবিক নয়। মাঘ মাসে কিছু বৃষ্টি হতে পারে, এটা স্বাভাবিক। সাধারণত বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণে সারা দেশে কিছু বৃষ্টিপাত এ সময় হয়। খনার বচনে আছেÑ ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্যি রাজার পুণ্যি দেশ’। কিন্তু, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ কিংবা চৈত্রে আষাঢ় মাসের মতো বৃষ্টিপাত তো ভালো নয়। পানি জমে যাচ্ছে, শিলাবৃষ্টিতে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটাকে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাথমিক আলামত ধরে নিতে পারি।

আমরা যা জলবায়ু পরিবর্তনটা বলি, পরিবর্তন যদি একই ধারায় হতো তাহলে বোধহয় ঠিক হতো। আসলে কথাটা হবে আবহাওয়া অশান্ত হচ্ছে অথবা পরিবর্তিত হচ্ছে। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা তখন বৃষ্টি কম হচ্ছে। আষাঢ়ের আগে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে এমনকি চৈত্রে যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা না তখনো  হচ্ছে। ভাদ্র-আশ্বিনে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। হয়তো বছরজুড়ে যে বৃষ্টি হয় তা স্বাভাবিকের সমান। কিন্তু ঋতুভেদে যে বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা সেটি থাকছে না। এতে সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে কৃষি উৎপাদন। আমাদের দেশে প্রধান তিনটি ধানের মৌসুম। আউশ, আমন ও বোরো। আমন ধান বোরো  মৌসুমে হবে না। একইভাবে বোরো ধান আউশের মৌসুমে হবে না। এই আউশ আমন বোরোর নির্দিষ্ট তারিখ ছিল। আমরা ‘আল্লা মেঘ দে পানি দে গান গাইতাম’। জমি নরম হলে চাষ দিয়ে বৈশাখ মাসে নিচু জমিতে আউশ ধান, কোনো কোনো জমিতে আউশ আমনের ধান একসঙ্গে কিংবা পাট লাগাতাম। যাতে আষাঢ় মাসের প্লাবনভূমিতে পানি চলে এলে গাছগুলো অন্তত দুমাস বয়সী হয়।

কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি এই বৃষ্টিপাত নির্ভর, তাপমাত্রা নির্ভর, কুয়াশা নির্ভর, সূর্যের আলো নির্ভর, বাতাসের দিক নির্ভর যে ফসলের কার্যক্রম ছিল সেটা কেমন জানি গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে! এ প্রসঙ্গে দুটি কথা বলে নিই। প্রথম কথাটি হচ্ছে, তাপমাত্রার তারতম্য। যদিও বলছি, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, এই উষ্ণতা হচ্ছে গড় উষ্ণতা। শীতের প্রকোপ কমে আসবে। পৌষ-মাঘ দুমাসের শীত, ১৫ দিনে চলে আসবে। হয়তো ৫ দিন ১০ দিন শীত থাকবে। আবার গরম পড়বে। এটা ফসলের জন্য খুবই ক্ষতিকর হবে। দেখা যাবে নিচের তাপমাত্রা ওপরে উঠছে ঠিকই তবে ওপরের তাপমাত্রা নাও বাড়তে পারে। আজ যখন এ কলামটি লিখছি অর্থাৎ চৈত্র মাস আগে এটাকে বলা হতো পিচ গলা রোদ্দুর দিন। এত গরম পড়ত! ১০০ ডিগ্রি ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এপ্রিল-মে মাসে খুবই স্বাভাবিক। এখন সেটা কেন জানি আমরা দেখছি না। এই তাপমাত্রার সঙ্গে কিন্তু ফসলের একটা সম্পর্ক আছে। 

দ্বিতীয় যে কথাটি বলতে চাচ্ছিলাম, সেটা হচ্ছে,  জলবায়ু পরিবর্তনের কথাই বলি আর বৈশ্বিক উষ্ণতার কথাই বলি এটি কেবল প্রারম্ভিক অবস্থায় আছে। অর্থাৎ এখন থেকে ৩শ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বাতাসে যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড ছিল ১৮৬০ সাল থেকে এটা বাড়তে শুরু করায় এখন এই তাপমাত্রা তথা ঋতু তথা জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। আবারও বলছি এটা প্রারম্ভিক পর্যায়। বিশ্বের বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন ১৮৬০ সাল থেকে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১ ডিগ্রি। এই ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বেড়ে আগামী একশ বছরে ৬ ডিগ্রিতে চলে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানেন আড়াই ডিগ্রি কিংবা ৩ ডিগ্রি বেড়ে গেলে পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যাপক খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে। মানুষ দেশান্তরী হবে। আর মানুষ দেশান্তরী হলেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের যে ব্যবস্থাপনা আছে সেটা ভেঙে পড়বে। আমরা ১৭-১৮ কোটি মানুষের দেশ ১০ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। এত উন্নত দেশ জার্মানি তারা ১ লাখ সিরিয়ান রিফিউজি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এত বিরাট দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রÑ জনসংখ্যা ত্রিশ কোটিরও বেশি, তারা ভয়ে আছে যে ১ লক্ষ মানুষ তাদের দেশে ঢোকার অপেক্ষায় আছে।

এই সবকিছুই দিনে দিনে দ্রুত বাড়তে থাকবে। এটাই হচ্ছে বিশ্বের চিন্তা। এই যে পরিবর্তনটা এটাকে মোকাবিলা করার জন্য আমরা অভিযোজন নামে একটা শব্দ ব্যবহার করি। উদ্ভিদবিদ্যা কিংবা প্রাণিবিদ্যায় শব্দটি ব্যবহার করা হয় প্রকৃতির পরিবর্তিত অবস্থাতে গাছপালা জীবজন্তু যেভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে

প্রকৃতিতে গাছপালা জীবজন্তু মোকাবিলা করার জন্য নিজের শরীরকে তৈরি করে। গরম দেশের জীবজন্তু আর শীতের দেশের জীবজন্তুর মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য থাকে। উত্তর মেরুতে যে শ্বেত ভালুক পাওয়া যায় তা বাংলাদেশে নিয়ে আসা হলে বাঁচবে না। কারণ শীত ছাড়া তার চলবে না। আবার বিষুবরেখা অঞ্চলের গরিলাকে মেরু অঞ্চলে নিয়ে গেলে সেও বাঁচবে না। কারণ শীত তার সহ্য হয় না। এমনকি আমরাও যদি বিষুবরেখা অঞ্চলে যাই তাহলে আমরাও গরম সহ্য করতে পারি না। অথচ আমরা অল্প একটু উত্তরে কর্টকক্রান্তি অঞ্চলের অধিবাসী। এই যে প্রকৃতি ঐ স্থানের ভূপ্রকৃতি প্রতিবেশের সঙ্গে গাছপালা বা পশুপাখির সমন্বয় করে যে টিকে থাকে এটাকেই আমরা অভিযোজন বলছি।

এখন আমাদের প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসছে, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, আবহাওয়াটা আনপ্রেডিক্টেবল হয়ে যাচ্ছে। এটাকে হয়তো-বা, পৃথিবী, প্রকৃতি, জীবজন্তু, গাছপালা, প্রাণিকুল এমনকি মানুষ খাপ খাইয়ে নিতে পারত যদি এটা ১০ হাজার কিংবা এক লাখ বছর ধরে পরিবর্তন হয়ে আসত। কিন্তু এটি মাত্র ১শ বছরে এত দ্রুত হচ্ছে যে, এটা কেউ সামলে উঠতে পারবে না। কোনো কোনো এলাকায় ক্ষরা দেখা দেবে, কোনো এলাকায় বন্যা দেখা দেবে। কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে, কোনো এলাকায় ভূমিধস, ব্যাপক নদীভাঙন হবে। অস্বাভাবিক রোগবালাই বাড়বে। বিশেষ করে ডেঙ্গুজ্বর, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড এগুলো বাড়বে।

আমরা অসময়ে ফুল ফল ধরতে দেখছি।  নভেম্বর মাসে দোলনচাপা, ডিসেম্বরে কদমফুল ফুটতে দেখছি। যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম গত একমাস ধরে আমরা বর্ষার আমেজ দেখতে পাচ্ছি। এটা ভালো নয়। এই যে পরিবর্তনগুলো বলছি এর সঙ্গে আরও তিনটি পরিবর্তন আমাকে ব্যাপকভাবে শঙ্কিত করে তুলছে। প্রথমটি হচ্ছে, অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি। ২০-৩০ বছর পরে যদি হঠাৎ করে একদিনে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় তাহলে ঢাকার যে পরিমাণ পানি ধারণ ক্ষমতা তা ভেঙে পড়বে। একইভাবে দেশের অন্য বড় শহরগুলো যে পরিমাণ বৃষ্টির পানি ধারণ করতে পারে তা ভেঙে পড়বে। শহর ডুবে যাবে।

দ্বিতীয় যে সমস্যাটাকে আমি ভয় পাই তা হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। আইলা এবং সিডরের কথা আমাদের মনে আছে। ২০০৯ সালের পর বেশ কয়েকটি বড় বড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। বেশ কিছু ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হয়ে উড়িয়া, চেন্নাই উপকূলের দিকে সরে গেছে। এটা কিন্তু একটু ঘুরে বাংলাদেশের দিকেও আসতে পারত। বাংলাদেশে ১৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলা করতে সক্ষম। এটা যখন ৩০ ফুটে চলে যাবে তখন উপকূল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আর তৃতীয় কারণটি হচ্ছে উপকূল লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে, জোয়ার-ভাটার উচ্চতা বাড়ছে। আমরা এখন বর্ষাকালে অমাবস্যা পূর্ণিমার সময় প্রতি ১৫ দিন পর পর দুই থেকে তিন দিন দেখতে পাই চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার পানি নামছে না। জোয়ারের পানি নামছে না। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। আগ্রাবাদ এলাকার মানুষ নৌকায় চলাচল করছে। এই যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, এটার জন্য সমগ্র বিশ্ব চিন্তিত। কিন্তু ঘটনাগুলো ঘটতে ঘটতে যখন আমরা উপলব্ধি করতে পারব তখন সবকিছু মারাত্মকভাবে বদলে গেছে। সেটা হয়তো-বা ২০৬০, ৭০ কিংবা ৮০ সাল হবে। এ সময় এগুলো আর আমাদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে

থাকবে না। সে জন্য ব্যবস্থাপনা এখন থেকে তৈরি করতে হবে। যে সব অবকাঠামো করার পরিকল্পনা করা হবে সেগুলো যেন জলবায়ুকে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। উপকূলীয় বাঁধগুলো উঁচু করতে হবে, পানি নিষ্কাশনে ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, লবণাক্ততার কারণে দক্ষিণাঞ্চলে খাবার পানির যে সংকট দেখা দেবে তা থেকে উত্তরণে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে খাবার পানির ব্যবস্থা করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত