পুঁজিবাজারের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এর আগে সব সাধারণ নির্বাচনের পরের তিন মাসে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিলেও এবার ব্যতিক্রম। ২০১৮ সালের মন্দা কাটিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সাময়িক উল্লম্ফন দেখা দিলেও বাজার ফের মন্দায় পড়েছে। টানা ১১ সপ্তাহ দরপতনের ধারায় অধিকাংশ বিনিয়োগকারী বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন। এর পেছনে মুদ্রাবাজারের তারল্য সংকটের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কিছু বিনিয়োগকারীর আগ্রাসী বিনিয়োগে মাত্র ১৮ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ বাড়ে। এরপর ২৭ জানুয়ারি থেকে টানা ১১ সপ্তাহের দরপতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি ৬৮৯ পয়েন্ট বা ১১ দশমিক ৫৮ শতাংশ হারিয়েছে। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহের চার কার্যদিবসে সূচকটি ১৯৮ পয়েন্ট কমেছে। টানা পতনে ডিএসইর লেনদেন ১ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা থেকে কমে নেমেছে ২৭৪ কোটি টাকায়। ২০১৮ সালে পুঁজিবাজারের মন্দার সময়েও ডিএসইর গড় লেনদেন ছিল ৫৫২ কোটি টাকা। পর্যালোচনায় দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ৬৮ শতাংশের দর গত বছরের চেয়েও নিচে নেমে গেছে। চলতি বছর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩১৩টি কোম্পানির মধ্যে ২১৪টির শেয়ার দর কমেছে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে ২০১৮ সালের পর আবারও বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। টানা দরপতনে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে বিক্রির চাপ বেড়ে গিয়ে দরপতন আরও বাড়ছে।
পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতাকেই দায়ী করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংকগুলো অর্থের অভাবে ঋণ দিতে পারছে না, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে। আবার সুদের হারও বেড়ে গেছে। ফলে মানুষ পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে ব্যাংকে আমানত রাখছে। এটি পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট তৈরি করছে। আবার ব্যাংকগুলো ভালো লভ্যাংশ দিতে না পারার প্রভাবও পড়েছে।
আগ্রাসী বিনিয়োগের কারণে ২০১৭ সালে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট শুরু হয়, যা ২০১৮ সালে প্রকট আকার ধারণ করে। আমানতের তুলনায় ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় নগদ অর্থের টানাটানিতে পড়ে যায় পুরো আর্থিক খাত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ শতাংশ, যেখানে এ সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমানতের প্রবৃদ্ধি আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৬ শতাংশে। সেখানে ঋণের প্রবৃদ্ধি রয়েছে ১২ শতাংশ। আমানত কমে যাওয়ায় তারল্য সংকট মেটাতে ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। আমানতে ব্যাংকগুলো ১০ থেকে ১১ শতাংশ সুদ দিচ্ছে, যা ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সুদহার বাড়ার প্রভাবে পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের কারণে তারল্য সংকট ত্বরান্বিত হচ্ছে।
ঋণের চেয়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ায় নগদ টাকার চাহিদার তীব্র আকার ধারণ করছে। আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করতে আমদানি বাড়ায় ডলারের চাহিদাও বেড়েছে। ব্যাংকগুলো ডলার কিনতে থাকায় নগদ টাকার প্রবাহ আরও কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে ডলার কেনা ও নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সুদহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ৩ এপ্রিল আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সুদহার সর্বোচ্চ উঠেছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ডিসেম্বরে এ সুদহার ছিল সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। এর বাইরে নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকেও বিশেষ রেপোর মাধ্যমে উচ্চ সুদে (৯ শতাংশ) টাকা ধার করছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে উচ্চ সুদে বিশেষ রেপোর মাধ্যমে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা নেয় ব্যাংকগুলো। এ সময় রেপোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আরও ৭ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা ধার নিয়েছে ব্যাংকগুলো। মার্চ মাসে রেপোর মাধ্যমে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ধার করে ব্যাংকগুলো। চলতি মাসের শুরুতেই বিশেষ রেপোর মাধ্যমে ৬২০ কোটি টাকা এরমধ্যেই ধার নিয়েছে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো।
নগদ অর্থ সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো রপ্তানি বিল নগদায়নও বন্ধ করে দিয়েছে। খেলাপিদের ঋণের সুদহার কমানোসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ায় সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে করে ব্যাংকগুলোয় ঋণ থেকে আদায় কমছে বলে কর্মকর্তারা জানান। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর কাছে বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ২২৭ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১০ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে।
এদিকে সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র থেকে ৮২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ, সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের ঋণ ও সুদহার বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়েছে। বাজার পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চলতি প্রথম প্রান্তিকে বড় অংকের সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে। আবার তারল্য সঙ্কটের কারণে নতুন করে বিনিয়োগ সক্ষমতাও হারিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ডিএসইর লেনদেনে ৪ শতাংশের কম দাঁড়িয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ। এখন লেনদেনের ৯১ শতাংশ আসে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।
এমন পরিস্থিতিতে তারল্য সংকট কাটাতে পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারিগুলো বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছে। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যাংকের এক্সপোজারের বাইরে রাখার দাবি জানিয়েছে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই এর মূল কারণ। আমাদের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিটি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ সেল করছে। মুদ্রা বিনিময় হার ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাপোর্ট দিচ্ছে। এতে করে আমাদের মুদ্রা সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে। যেহেতু আমাদের ক্যাপিটাল মার্কেট সবচেয়ে লিকুইড মার্কেট, তাই তারল্য সংকটের প্রভাব সেখানেই বেশি পড়ে। দরপতনের এটিই বড় কারণ। এ ছাড়া অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাসেট কোয়ালিটির ব্যাপক অবনমন হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নগদ প্রবাহ নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছে না। এ ছাড়া আইপিও ও প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুও বাজার পতনের জন্য দায়ী। কারণ গত ১০ বছরে যেসব আইপিও এসেছে, এর একটি বড় অংশই দুর্বল মৌল ভিত্তির। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।’
