চট্টগ্রামে মাদ্রাসায় শিশু ছাত্রের ঝুলন্ত লাশ

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৯, ০২:৩২ এএম

চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ বোস্তামির ওমর ফারুক আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা থেকে এক শিশুছাত্রের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত হাবিবুর রহমান (১০) খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মধ্য বোয়ালখালী পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আনিসুর রহমানের ছেলে। গত বুধবার রাতে মাদ্রাসার ভেতরে মসজিদ থেকে ওই শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, মাদ্রাসার শিক্ষকের নির্যাতনের কারণে মৃত্যুর পর শিশুটিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগের মুখে থাকা শিক্ষক কয়েক দিন আগে ওই শিশুকে মারধরের কথা স্বীকার করলেও ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলছেন।

এ বিষয়ে বায়েজিদ বোস্তামি জোনের সহকারী কমিশনার পরিত্রাণ তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বুধবার রাতে মাদ্রাসার ভেতরে মসজিদে এক ছাত্রের মৃত্যুর খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ যায়। চারতলার জানালায় লাশটি ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল, পা মাটির সঙ্গে প্রায় লাগানো অবস্থায় ছিল। প্রাথমিক তদন্তে জেনেছি, শিশুটি কয়েক দিন আগে মাদ্রাসা থেকে পালানোর পর দুদিন আগে ফিরে আসে। তারপর নির্যাতন করা হয়েছিল কি না তা আমরা তদন্ত করছি।’

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আনিসুর বায়েজিদ বোস্তামি শেরশাহ বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম নগরীতে একটি গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত। তার বড় ছেলে মিজানুর রহমান (১৪) ওই মাদ্রাসায় পড়ত। ১৩ মাস আগে সেখানে হাবিবুরকে ভর্তি করা হয়। অভাব-অনটনের সংসারে দুই ছেলেকে মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে থাকতে পাঠিয়ে কিছুটা নির্ভার হতে চেয়েছিল এই দম্পতি। কিন্তু চার দিন আগে পালিয়ে বাসায় এসে হাবিবুর অভিযোগ করে, মাদ্রাসায় তাকে মারধর করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে আনিসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চার দিন আগে হাফেজ মাওলানা তারেকুর রহমান আমার ছেলেকে মারধর করেন। নির্যাতনের ভয়ে সে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাসায় চলে আসে। দুদিন আগে তাকে আবার ফেরত পাঠানো হয়। বুধবার মাগরিবের নামাজের পর হাফেজ তারেকুর ফোন করে আমাকে বলেন, হাবিবুরকে পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি বাসায় যায়নি। পরে রাত ৯টার দিকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি আবু দারদা আমাকে ফোন করে বলেন, হাবিবুর আত্মহত্যা করেছে। সেখানে গিয়ে দেখি গলায় কাপড় বাঁধা অবস্থায় লাশ জানালার সঙ্গে ঝোলানো।’

আনিসুর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ছেলেকে যদি না পাঠাতাম তাহলে লাশ হতো না।’ তার স্বজন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এটা কোনো আত্মহত্যা না। নিযার্তন করে এই ছেলেকে মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পা মাটির সঙ্গে প্রায় লাগানো অবস্থায় কি কেউ আত্মহত্যা করে?’

অভিযোগের বিষয়ে হাফেজ মাওলানা তারেকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাবিবুরকে বুধবার মারধর করা হয়নি। কিন্তু চার দিন আগে হালকা বেত্রাঘাত করেছিলাম। কাল মাগরিবের পর তাকে পাওয়া যায়নি, হয়তো আত্মহত্যা করেছে।’

এদিকে সরেজমিন মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, অনেক ছাত্র ভয়ে মাদ্রাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মো. সাজ্জাদ নামে হেফজ বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলে, ‘হুজুররা মারধর বেশি করেন। একটু আগে এখানে মারামারি হয়েছে। তাই ভয়ে চলে যাচ্ছি, বাবা নিতে আসছেন।’

এদিকে হাবিবুর রহমানের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গতকাল সকালে মাদ্রাসায় ভাঙচুর চালায় এলাকাবাসী। পরে বায়েজিদ থানা পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এলাকাবাসীরা জানায়, ওয়াজেদিয়া শহীদুল্লাহ পাড়ায় কাতারপ্রবাসী ওমর ফারুকের এবং বিদেশি অর্থায়নে গড়ে ওঠা ছয়তলা মাদ্রাসা ভবনসংলগ্ন মসজিদের চতুর্থ তলায় এ ঘটনা ঘটেছে। এখানে ছাত্রদের নির্যাতনের অভিযোগ আগেও উঠেছে। হাবিবুরের মৃত্যুর পর অনেক অভিভাবক গতকাল তার সন্তানকে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত