চৈত্র মাসের শেষ দিনটি একই সঙ্গে মাসের এবং বছরেরও শেষ দিন। বাংলা মাসের শেষ দিনটিকে বলা হয় সংক্রান্তি। বসন্তকে বরণ করতে যেমন বসন্ত উৎসব, তেমনি চৈত্রসংক্রান্তি হলো বসন্তকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরে যাওয়ার উৎসব। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে প্রাচীনকাল থেকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নানা অনুষ্ঠান-পূজা-পার্বণ-মেলা। এই উৎসব এখন আর কোনো একক সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই। চৈত্রসংক্রান্তি বাঙালির কাছে পরিণত হয়ে উঠেছে এক বৃহত্তর লোক উৎসবে। এ নিয়ে লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ
সংক্রান্তি
ক্রান্তি মানে কিনারা আর সংক্রান্তি বলতে বুঝায় সঞ্চার বা গমন করা। অর্থাৎ এক কিনারা থেকে অন্য কিনারায় যাওয়া। তাই পুরনো বছরের কিনারা থেকে নতুন বছরে যাওয়াই চৈত্রসংক্রান্তি হিসেবে পালন করা হয়। এ দিনকে সূর্য সংক্রান্তিও বলা হয় কেননা এদিন সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন করে। বছরের শেষ আর বছরের শুরু দুটোই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। চৈত্রসংক্রান্তির পরের দিনটি পহেলা বৈশাখ। চৈত্রসংক্রান্তির দিনের সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে কালের গর্ভে চিরতরে হারিয়ে যাবে একটি বঙ্গাব্দ।
মাসের নাম চৈত্র
বাংলা সনের জন্ম ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুঘল সম্রাট আকবরের নাম। বাংলা সনের বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত রয়েছে মোট বারো মাস। এই বারো মাসের নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্রম-লে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। এই নামগুলো নেওয়া হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ থেকে। যেমনÑ বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখ। বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারে বৈশাখ মাসের নামকরণ হয়েছে। আর শেষ মাস চৈত্র যার নাম এসেছে চিত্রা নক্ষত্র থেকে। ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির শুরু হয় মধ্যরাতে আর বাংলা সনের দিনের শুরু ও শেষ হয় সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মধ্যদিয়ে। চৈত্রসংক্রান্তি পালিত হয় ১৩ এপ্রিল। এর পরের দিনটি পহেলা বৈশাখ।
লৌকিক আচার
বাংলা মাসের শেষ দিনে শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি কাজ করা হয়। সনাতন ধর্ম মতে, এই কাজগুলোকে পুণ্যের কাজ বলে মনে করা হয়। লৌকিক আচার অনুযায়ী, এ দিনে বিশেষ করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বিদায় উৎসব পালন করে। তাই একে বলা যায় হালখাতার প্রস্তুতির দিন। দোকানপাট ধুয়েমুছে বিগত বছরের সব জঞ্জাল দূর করে পহেলা বৈশাখের দিন খোলা হবে ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা। এই দিনের আগে তাই হিসাব-নিকাশের খাতা কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। এছাড়াও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসে মেলা যেমন গাজন, চড়ক পূজা, চৈত্রসংক্রান্তির মেলা। মুড়ি, মুড়কি, ছাতু, খেলনা, নিত্যব্যবহার্য তৈজসপত্র, পুতুল নাচে জমজমাট থাকে এই সব মেলা। শিশুসহ সব বয়সীদের কাছে সমান জনপ্রিয় এই চৈত্রসংক্রান্তির মেলা। প্রায় একই ধরনের আচার পালন করতে দেখা যায় আমাদের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেও।
জানা যায়, প্রাচীনকালে এই চৈত্রসংক্রান্তির মেলা খুবই জনপ্রিয় ছিল। যে এলাকায় এই মেলা বসত সেই এলাকার গৃহস্থরা তাদের মেয়ে-মেয়েজামাই, নাতি-নাতনিদের আমন্ত্রণ করে বাড়ি নিয়ে আসত। বিভিন্ন ধরনের উপঢৌকন দিয়ে জামাই ও নাতি-নাতনিদের বরণ করে নেওয়ারও চল ছিল। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের খাওয়া-দাওয়া তো ছিলই। যে ক’দিন মেলা থাকত সেই ক’দিন সেই এলাকা হয়ে উঠত জমজমাট। হাসিখুশি আনন্দে কেটে যেত দিন।
মেলা
বর্তমানে শহুরে সভ্যতার ছোঁয়া লেগেছে সবখানে। আবহমান গ্রামবাংলার সেই লৌকিকতাও হারিয়ে গেছে অনেকটাই। এখন গ্রামের পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব বা মেলা বসে। আর এই মেলা দিনে দিনে হয়ে উঠেছে এক সার্বজনীন মিলনমেলা। এখন তো আবার বিভিন্ন ধরনের কনসার্টেরও আয়োজন করা হয় এই চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে। কয়েক বছর ধরে রাজধানী ঢাকাতেও নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে চৈত্রসংক্রান্তি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করে সংক্রান্তির এই দিনটি। তাছাড়া রয়েছে আরও অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠনÑ তারাও বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকে। এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ঘুড়ি উৎসব, ঘুড়ি প্রদর্শনী, পুঁথিপাঠ, পুতুল নাচ, পালাগান, লাঠিখেলা, সঙযাত্রা, শোভাযাত্রাসহ গম্ভীরার মতো লোকসংস্কৃতির নানা আয়োজন। চৈত্রসংক্রান্তি ঘিরে সারা দেশে বারোয়ারি যে মেলার আয়োজন করা হয় তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, বরিশাল, দিনাজপুর, যশোর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও ঢাকার ধামরাইয়ের মেলা অন্যতম প্রসিদ্ধ। এর মধ্যে দিনাজপুরের বিরামপুরে যে মেলা হয় সেটা তিনশ বছরেরও বেশি পুরনো। সাত দিনব্যাপী চলে এই মেলা।
চড়ক পূজা
চড়ক হচ্ছে চক্রপথে আবর্তন। উৎসবের মধ্য দিয় পুরানো বছর বিদায় ও নতুন বছর বরণকে বলা হয় চড়ক। সনাতন পঞ্জিকামতে, সূর্য যেদিন একটি বছরের পরিক্রমণ শেষে আরেকটি বছরের দিকে যাত্রা শুরু করে, সেদিন পালিত হয় চড়ক।
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকোৎসব এই চড়ক পূজা। চৈত্রের শেষ দিনে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং বৈশাখের প্রথম দু-তিনদিনব্যাপী এই চড়ক পূজার উৎসব চলে। কোথাও কোথাও একে নীল পূজা বা হাজরা পূজাও বলা হয়ে থাকে। চড়ক পূজা কবে কীভাবে শুরু হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। তবে প্রচলিত রয়েছে, ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা এই পূজার প্রচলন করেন। তবে রাজ পরিবারের লোকজন এই পূজা চালু করলেও চড়কপূজা কখনো রাজরাজড়াদের পূজা ছিল না। এটি ছিল হিন্দু সমাজের লোকসংস্কৃতি। পূজার সন্ন্যাসীরা প্রায় সবাই হিন্দুধর্মের কথিত নিচু সম্প্রদায়ের লোক ছিল। তাই এ পূজায় এখনো কোনো ব্রাহ্মণের প্রয়োজন ছিল না।
চড়ক পূজা করা হয় চৈত্র মাসের শেষ দিনটিতে। তার আগের দিন চড়কটিকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়। এতে রাখা হয় জলভরা একটি পাত্র যাতে থাকে শিবলিঙ্গ। এই শিবলিঙ্গ প্রতিনিধিত্ব করে শিবের। চড়ক পূজার আগে সাত দিন নিরামিষ খেয়ে থাকেন ভিক্ষু বা ভক্তরা। এই সময় বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রে সং সেজে নেচে নেচে প্রসাদ চায় সাধারণ মানুষের কাছে। চড়ক পূজার উৎসবে বহু প্রকারের দৈহিক যন্ত্রণার মধ্যে ধর্মের অঙ্গ বলে বিবেচিত হয়। চড়কগাছে ভক্তর পিঠে লোহার হুড়কা লাগিয়ে চাকার সঙ্গে বেঁধে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়। এছাড়া অনেক সময় ভক্তের হাতে, পায়ে, জিহ্বায় এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে বাণ শলাকা বিদ্ধ করা হয়। কখনো কখনো জ্বলন্ত লোহার শলাকা তার গায়ে ফুঁড়ে দেওয়া হয়। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে এ নিয়ম বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে এখনো তা প্রচলিত।
গম্ভীরা উৎসব
গম্ভীরা উৎসব, গম্ভীরা পূজা বা শিবের গাজন আসলে কিন্তু চড়ক পূজারই রকমফের। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে উত্তরাঞ্চলের অনেক স্থানে অনুষ্ঠিত হয় গম্ভীরা পূজা বা শিবের গাজন। আর এই গম্ভীরা পূজা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এসব মেলায় থাকে স্থায়ীয় বিভিন্ন উপকরণ, বাঁশ, বেত, কাঠ, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ও খেলনা, বিভিন্ন রকমের ফল-ফলাদি ও মিষ্টি-মিষ্টান্ন, যাত্রা, সার্কাস, বায়োস্কোপ, পুতুল নাচসহ বিনোদনের নানা ব্যবস্থা।
