মোদি-মমতা দ্বৈরথের প্রথম দফা ‘নির্বিঘ্নে’

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০৩:০৮ এএম

ভোট নয়, যেন যুদ্ধ। প্রথম দফায় মাত্র দুটি সংসদীয় কেন্দ্রের নির্বাচন। তার জন্য মোতায়েন নয় নয় করে ৮৩ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশে আস্থা নেই নির্বাচন কমিশনের। আস্থা নেই বিজেপিসহ গোটা বিরোধীপক্ষেরও। ফলে তাদের দাবি মেনে নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে তৎপর কমিশন।

ভোটের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে কোচবিহারের পুলিশ সুপার অভিষেক গুপ্তাকে সরিয়ে সে জায়গায় নিয়ে আসা হয় ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর স্পেশাল এসপি অমিত কুমার সি’কে। সিল করে দেওয়া হয় ভারত-ভুটান সীমান্ত। সতর্ক নজরদারি বলবৎ হয় আসাম সীমান্তঘেঁষা এলাকায়। এমন টানটান উত্তেজনার আবহে বৃহস্পতিবার নির্বাচন সাঙ্গ হলো কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার কেন্দ্রে।

কিন্তু এত করেও কি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ও অবাধ করা গেল গণতন্ত্রের উৎসবের প্রথম দফা? দিনের শেষে এই প্রশ্ন উঠে আসছে। দুই কেন্দ্রের বহু বুথ থেকে মিলেছে বিভিন্ন অভিযোগ। কোথাও বুথ দখল, কোথাও ভোটারদের পথ আটকে মাস্তানি, কোথাও বা মারধর, বোমাবাজি। বুথের ভেতর ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা। বাইরে নিরাপত্তার প্রশ্নে আমতা আমতা করছেন পুলিশকর্মী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের দিকে। মাথাভাঙায় আক্রান্ত হয়েছেন ফরোয়ার্ড ব্লক প্রার্থী গোবিন্দ রায়।

সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনের তিক্ত স্মৃতি এবং গত কয়েক দিন ধরে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে নিরবচ্ছিন্ন হিংসার আবহে প্রথম দফায় যে ছবি উঠে এলো শীতলকুচি, দিনহাটা, মাথাভাঙা, নাটাবাড়ির বিভিন্ন বুথে, বিক্ষিপ্ত হলেও একে এক অশনি সংকেত বলে মনে করছেন এ রাজ্যের মানুষ। কেননা এখনো বাকি আগামী এক মাস ধরে ছয় দফায় রাজ্যের আরও ৪০ কেন্দ্রের নির্বাচন।

এদিন দেশের ১৮টি রাজ্য ও ২টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট ৯০টি সংসদীয় কেন্দ্রের নির্বাচন দিয়ে যে ভোটযুদ্ধ শুরু হলো তার মূল সুরটি বিজেপি বনাম বিরোধীপক্ষ হলেও এই রাজ্যে ব্যাটল লাইনটা স্পষ্ট বিজেপি বনাম তৃণমূল। আরও স্পষ্ট করে বললে, মোদি বনাম মমতা।

লড়াইটা চলছে নখে-দাঁতে। একজনের লক্ষ্য কেন্দ্রে পাঁচ বছরের বিজেপি জমানার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে একটা বড় জায়গা করে নেওয়া এবং অন্যজন চাইছেন এই রাজ্যে দিদির একচ্ছত্র আধিপত্যের ভিতটাই নাড়িয়ে দেওয়া। কেননা বছর দুই পর, ২০২১ এই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট।

ফলে এই নির্বাচনে এই রাজ্যকে পাখির চোখ করেছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কেউ কাউকে এক চুলও জমি ছাড়তে নারাজ। ছলেবলে-কৌশলে, বাহুবলে একে অন্যকে টপকে জমি দখলের মরিয়া লড়াই। লড়াই মর্যাদারও। এবারের লড়াইয়ের তীব্রতাটা আঁচ করা যায় কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রচারের ভাষায়। যা অনেক ক্ষেত্রেই শালীনতার গণ্ডি অতিক্রম করেছে। মোদি শিলিগুড়িতে সভা করতে এসে বলেছেন, ‘দিদি উন্নয়নের স্পিডব্রেকার।’ অন্যদিকে মোদি সম্পর্কে মমতার মন্তব্য, ‘চৌকিদার ঝুটা হ্যায়।’ বলেছেন, ‘আগে দিল্লি সামলা, তারপর ভাববি বাংলা।’

এরকম এক তপ্ত আবহে কেউ এতটুকু ঝুঁকি নিতে নারাজ। বারবার উঠেছে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। কখনো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে, কখনো পুলিশ বা রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে। সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে এই নিরবচ্ছিন্ন আস্থাহীনতা সন্দেহাতীতভাবে দূষণ ছড়াচ্ছে এ দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে।

ভোটে রাজ্য পুলিশে আস্থা নেই বলে নজিরবিহীন সংখ্যায় রাজ্যে মোতায়েন হয়েছে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী। কোচবিহারের এসপিই শুধু নন, তার আগে রাজ্যের শাসক দলের প্রতি আনুগত্যের অভিযোগে ভোটের আগে বদলি হতে হয়েছে খোদ কলকাতার ও বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার যথাক্রমে অনুজ শর্মা ও জ্ঞানবন্ত সিংসহ চার বলিষ্ঠ পুলিশ আধিকারিককে। ছেড়ে কথা বলা হচ্ছে না কাউকে।

কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে বদলি করার পর নির্বাচন কমিশনকে প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছিলেন মমতা, কিন্তু লাভ হয়নি। কমিশন তার ক্ষোভকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দিয়ে পাল্টা চিঠি পাঠিয়ে দেয়।

গত ৭ এপ্রিল কোচবিহারের রাসতলা ময়দানে ছিল নরেন্দ্র মোদির সভা। পরদিন ওই একই মাঠে সভা ডাকেন মমতা। মাঠ ঘিরে বিতর্ক। তার জেরে মোদির মঞ্চ থেকেই জেলার পুলিশ সুপার অভিষেক গুপ্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ করেন মুকুল রায়। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে দেওয়া হয় অভিষেককে। এসব দৃষ্টান্ত তুলে তৃণমূলের অভিযোগ বিজেপির কথায় নাচছে নির্বাচন কমিশন।

তবে এতসব কিছুর মধ্যেও ভোটের লাইনে ভিড় জমিয়েছেন মানুষ, সব বাধা, অশান্তির আশঙ্কা নিয়েই। ঘড়ির কাঁটা ১২টার ঘর ছুঁয়ে যতই এগিয়েছে ততই বেড়েছে ভোটের হার। বেলা ৩টা পর্যন্ত কোচবিহারে ভোট পড়েছে ৬৮ শতাংশ, আলিপুরদুয়ারে ৭১। সরকারি ভাষ্যে, প্রথম দফায় ভোট মিটেছে নির্বিঘ্নে।

মোদি-মমতার চলতি দ্বৈরথের নির্ণায়ক ভোটের। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। দীর্ঘ এই ভোটযুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেবেন আমজনতাই। যার ফল জানার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে ২৩ মে পর্যন্ত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত